দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আর বাড়বে না বলে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সে ব্যাপারে এখনই বলার মতো সময় আসেনি বলে মত দিয়েছেন দেশের রোগতত্ত্ববিদরা। গত কয়েক দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার নিম্নগতির পর্যবেক্ষণ করে অধিদপ্তর এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও সরকারি হিসাবেই গত এক সপ্তাহে সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ৮ শতাংশ বেড়েছে। গত রবিবারের তুলনায় গতকাল সোমবার ঢাকায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৩ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া ইতোমধ্যেই সরকারি হিসাবেই ডেঙ্গুতে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এমনকি গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে বেসরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি শেষ হওয়া বর্ষা মৌসুমের জরিপে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যে ২৩টি ও দক্ষিণের ৩৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে, সেসব স্থানে এডিস মশা নিধন ও এডিসের লার্ভা ধ্বংসে কতটুকু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে ব্যাপারেও কোনো তথ্য নেই অধিদপ্তরের কাছে।
রাজধানীতে মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে গত ১৮-২৭ জুলাই বর্ষা মৌসুমের জরিপ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বর্ষার আগে করা জরিপে এই তালিকায় সাতটি ওয়ার্ড থাকলেও এবারে উত্তরে তা তিনগুণ যার মধ্যে ১৮, ১৯, ২১, ২৩ ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থা ভয়াবহ। অন্যদিকে বর্ষার আগের জরিপে দক্ষিণের ১৫টি ওয়ার্ড ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও এবারের এই তালিকায় রয়েছে ৩৭টি ওয়ার্ড। ১১টি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব শূন্য।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, নতুন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে অর্থাৎ রোগীর হারে নিম্নগতি। আশা করছি এটা আর বাড়বে না। এটা সম্ভব হয়েছে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা। অবশ্য এই কর্মকর্তার এমন আশাবাদ নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমার মতো তেমন কোনো পরিবর্তন আবহাওয়ায় আসেনি। গত দু-তিন দিনে ডেঙ্গু রোগী কমার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটা ঠিক কতটুকু কার্যকর তার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মশার কামড়ানো থেকে শুরু করে ডেঙ্গুর জীবাণুর সংক্রমণ ও তা থেকে জ¦র হতে কমপক্ষে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে। সুতরাং দুয়েক দিনের তথ্যে নির্ভর করা যাবে না।
এই রোগতত্ত্ববিদ বলেন, আইইডিসিআরের পর্যবেক্ষণ হলো, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব খুব বেশি কমছে না। তবে বাড়ছে না এটা পজিটিভ। ঢাকার বাইরে থেকে এখনো সব রোগী আসেনি। ফলে এখনো ঢাকার বাইরে রোগী বেশি। সবাই ঢাকায় আসার পর বোঝা যাবে পরিস্থিতি কী।
ডা. সেব্রিনা বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ খুব সহজ না। ঢাকায় এডিসের বংশ বিস্তারের অনেক উৎস এই লার্ভা। আমাদের নিজস্ব জরিপেই ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ মিলেছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ধারাবাহিকভাবে এডিস মশা নিধনে কাজ করতে হবে। আবহাওয়ার কারণেই সেপ্টেম্বরে এমনিতেই ডেঙ্গু কমে যাওয়ার কথা। তবে এবার রোগী শনাক্তের হার বেশি। প্রাদুর্ভাবটাও আগেভাগেই শুরু হয়েছে। আবহাওয়া বিরূপ না হলে, অর্থাৎ থেমে থেমে বৃষ্টি ও বৃষ্টির পর তাপমাত্রা খুব বেশি না হলে ডেঙ্গু এমনিতেই কমে আসবে।
আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পরামর্শক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকায় কিছুটা কমেছে। ঢাকার বাইরে বেড়েছে। সার্বিক বিচারে এখনো ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্বাভাবিক না। এতদিনে এমনিতেই ডেঙ্গু কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু এডিস মশা ও এডিসের প্রজনন স্থান এত বেড়েছে যে, নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন কিছু কাজ হচ্ছে। তবে এটা ধারাবাহিকভাবে করতে হবে। নতুবা এই দুর্যোগ থাকবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে যাবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু বাড়া ও কমাটা খুব বেশি না। খুবই ছোট। তবে যেটুকুই হোক কমছে, এটাই আশার কথা। ঈদের সময় ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের যতটা আশঙ্কা করেছিলাম, তা হয়নি। আমরা হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রেখেছিলাম। তাছাড়া ব্যক্তিগত সচেতনতাও বেড়েছে। মানুষ এখন নিজেরাই ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখছে। ইদানীং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও উদ্যোগী হয়েছে।
মহাপরিচালক জানান, দুই সিটি করপোরেশনের লোকজনের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুদিন আগে বৈঠক করেছে। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় এডিস নিধনের কথা বলেছি। উত্তর সিটি করপোরেশন চিরুনি অভিযান শুরু করবে। তিনি নিজে গতকাল ভিডিও কনফারেন্স করে দেশের সব সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। হাসপাতাল ও এর আশপাশে প্রতিদিনই পরিষ্কার করতে বলেছেন।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এডিস নিধন একদিনের কাজ না। উৎস একবার ধ্বংস করলে হয় না। সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সারা বছর কাজ হয়। সপ্তাহে দু-তিন দিন পরপরই এডিস নিধন ও লার্ভা ধ্বংসে কাজ করতে হয়। এডিস মশা কিছুটা কমেছে। তবে বর্তমানে যে প্রাদুর্ভাব সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ঢাকার বাইরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন নতুন ৮৫৮ রোগী। গত রবিবার এ সংখ্যা ছিল ৯৭২ জন। একইভাবে ঢাকায় ভর্তি হওয়া নতুন রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭৫৭ ও ৭৩৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে গত রবিবারের তুলনায় গতকাল সোমবার নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ৫ শতাংশ কম। এর মধ্যে ঢাকায় এক দিনের ব্যবধানে বেড়েছে ৩ শতাংশ ও ঢাকার বাইরে কমেছে ৫ শতাংশ। এছাড়া গত নয় দিনে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ৮ শতাংশ।
