মিন্নিকে কেন জামিন দেওয়া হবে না : হাইকোর্ট

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৯, ০৩:৪৪ এএম

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া তারই স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে কেন জামিন দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার মিন্নির জামিন প্রশ্নে করা আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ সরকারের প্রতি এ রুল জারি করে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাত দিনের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।  যাবতীয় নথিসহ এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (আইও) তলব করেছে হাইকোর্ট। আগামী ২৮ আগস্ট এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন তাকে আদালতে হাজির হতে হবে। একই সঙ্গে মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনকে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মিন্নি রিমান্ড শেষে আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার আগের দিনই পুলিশ সুপার মারুফ সংবাদ সম্মেলন করে রিফাতের স্ত্রীর ‘দোষ স্বীকারের’ তথ্য দেন। এ বিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে আদালত লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে। আগামী ২৮ আগস্ট তা হাইকোর্টে দাখিল করতে হবে।   

আদালতে এদিন মিন্নির জামিনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই (জহিরুল ইসলাম) খান পান্না এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি।

এদিকে আদালতে নেওয়ার আগেই রিফাত হত্যায় মিন্নির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছেন, মামলার তদন্ত পর্যায়ে এমন বক্তব্য দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত। এছাড়া বিভিন্ন সময় আসামিকে হাজির করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংবাদ সম্মেলন করারও সমালোচনা করে হাইকোর্ট।

আদালত বলে, ‘আমরা একটি রায়ে এভাবে আসামিদের হাজির করে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য না দিতে বলেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি আসামিকে জ্যাকেট পরিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাজির করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত পর্যায়ে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন কতটুকু যৌক্তিক?’

আদালত বলে, ‘বরগুনার এসপি বলেছেন, তিনি (মিন্নি) স্বীকার করেছেন। কিন্তু বিচারিক জবানবন্দির আগে সংবাদ সম্মেলন করে এসব বলা কি যুক্তিসঙ্গত? তদন্তের পর্যায়ে এ ধরনের সংবাদ ব্রিফিংয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ওঠে।’

আদালত আরও বলে, ‘এটি প্রায়ই দেখা যায় যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমন বক্তব্য দিয়ে থাকে। এতে করে জনগণের ধারণা একটু অন্যরকম হয়। যদি কোনো আসামি স্বীকার করেও থাকে, তাহলেও তদন্তের স্বার্থে এভাবে বলা উচিত নয়।’

আদালত বলে, ‘তাকে (মিন্নি) ১৭ জুলাই পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হলো। রাতে তাকে আসামি করা হলো। তাকে তো গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়নি। একজনকে যদি এভাবে পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তার মানসিক অবস্থা কেমন হয়। এগুলো কিন্তু তদন্তকাজে প্রভাবিত হয়।’

বরগুনা পুলিশ লাইন্সে মিন্নিকে নেওয়া, গ্রেপ্তার দেখানো, রিমান্ডে নেওয়া এবং তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিষয়ে ওই জেলার পুলিশ সুপার কখন সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন সে বিষয়ে গত সোমবার শুনানির সময় বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছিল হাইকোর্ট। মঙ্গলবার জেড আই খান পান্না এ সংক্রান্ত তথ্য আদালতে জমা দেন।

জামিন পেতে গত ১৮ আগস্ট হাইকোর্টের এই বেঞ্চে আইনজীবীদের মাধ্যমে আবেদন করেন মিন্নি। এর আগে গত ৮ আগস্ট বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি অবকাশকালীন বেঞ্চ মিন্নির জামিন প্রশ্নে কোনো আদেশ না দিয়ে রুল দিতে চাইলে আবেদনটি ফিরিয়ে নেন তার আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

নিম্ন আদালতে দু’দফা জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার পর গত ৫ আগস্ট প্রথম দফায় হাইকোর্টে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের আবেদন করেন মিন্নি। গত ২১ জুলাই বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্নির জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়। এরপর ৩০ জুলাই বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতও তার জামিনের আবেদনে সাড়া দেয়নি।

গত ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে বহু পথচারীর উপস্থিতিতে স্ত্রী মিন্নির সামনে খুন হন রিফাত শরীফ। তখন স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির প্রচেষ্টার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে সারা দেশে তোলপাড় হয়। রিফাত খুন হওয়ার পরদিন ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন তার বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। পরে এ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এরপর দুলাল শরীফ রিফাত হত্যায় মিন্নির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জুলাই সকালে মিন্নিকে বরগুনার পুলিশ লাইন্সে নিয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে রাতে রিফাত হত্যাকা-ে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে মিন্নিকে গ্রেপ্তারের কথা জানান বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন।

রিমান্ডে নেওয়ার পর ১৯ জুলাই পুলিশ জানায়, রিফাত হত্যার সংশ্লিষ্টতায় মিন্নি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন দাবি করেন জবরদস্তি ও তড়িঘড়ি করে মিন্নির কাছ থেকে জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত