রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সব আয়োজন সম্পন্ন। রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় চাইলেই তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে। এজন্য কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে গত দুদিন প্রত্যাবাসনে আগ্রহী ২৩৫টি রোহিঙ্গা পরিবারের প্রধানদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, আজ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রত্যাবাসন কাজ চলবে। তবে কারা মিয়ানমার ফিরতে সম্মত হয়েছে সেটি জানে না কেউই। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে শুধুই আলোচনা এ নিয়ে। রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা নেতা গোছের লোকজনের কাছেও তালিকা নেই। ফলে প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
টেকনাফ ও উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে বেশকিছু রোহিঙ্গা পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মারধরও করা হয়েছে। তারা যেন মিয়ানমার ফিরে যায়। এরকম ২০-২১টি পরিবারকে গত দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে, এদেরকেই প্রত্যাবাসনে আগ্রহী বলে দেখানো হবে। ক্যাম্পে থাকলে তাদের মেরে ফেলা হবে এমনও হুমকি দিয়েছে একটি পক্ষ। রোহিঙ্গাদের মধ্যে একাধিক নেতা গোছের
সদস্য মনে করেন, মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতেই নামমাত্র প্রত্যাবাসন করার কৌশল নিয়েছে। গত দুদিন ধরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে তারা কেউই রাখাইনে ফিরতে নিজেদের নিরাপদ মনে করছে না। তারা বলছে, এখানে বিষ খেয়ে মরে গেলেও ফিরে যাবে না। তাদের দাবি, ২০০-৪০০ রোহিঙ্গাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রত্যাবাসন করা হবে। তখন মিয়ানমার থেকে বলা হবে, প্রত্যাবাসন শুরু হয়েছে। তবে বাংলাদেশে থাকা এসব রোহিঙ্গা নিজেদের ভূমি রাখাইনে ফিরতে চায় নাগরিক হিসেবে সব মর্যাদা নিয়ে। ক্যাম্পে গাদাগাদি করে থাকতে তাদেরও কষ্ট হয়।
টেকনাফ আওয়ামী লীগের এক নেতা গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মঙ্গলবার ১০-১২ রোহিঙ্গা পরিবারকে সরিয়ে উখিয়ার ঘুমধুমে রাখা হয়ে প্রত্যাবাসন ক্যাম্পের কাছে। তাদের জোর করা হচ্ছে রাখাইনে ফিরে যেতে সম্মত হওয়ার জন্য। এই কয়েকজনকে দিয়েই প্রত্যাবাসন শুরু হবে এমনই ধারণা সবার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে আমাদের সরকারের নীতি হলো প্রত্যাবাসনে সবসময়ই ইতিবাচক মনোভাব দেখানো। মিয়ানমার সবসময়ই প্রত্যাবাসন নিয়ে কৌশল করে। এটাও আমরা বুঝছি, তারা জাতিসংঘের অধিবেশনের আগেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করে নিজেদের বদনাম ঘোচাতে চায়। আর বাংলাদেশের জন্যও এটা বড় একটা চ্যালেঞ্জ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা সবসময়ই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত। এই সরকারের জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মহল আমাদের পক্ষে আছে। আমরা চাই মিয়ানমার সুষ্ঠুভাবে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেবে। তবে আমি চাই প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী কাজটা হোক।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমার আবারও একটা ধোঁকার পথ বেছে নিয়েছে। ২০০ রোহিঙ্গা নিয়ে তারা বিশ^বাসীর কাছে বলবে, আমরা প্রত্যাবাসন শুরু করেছি। কাজেই সরকারকে এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কৌশলটাও খারাপ না। তবে মিয়ানমার বড় ধরনের ফন্দি করেছে। ২০০-৩০০ রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিয়ে তারা প্রচার প্রপাগান্ডা চালাতে থাকবে। এই ২০০-৩০০ রোহিঙ্গাকে মূলত তারাই চাপ দিয়ে কিংবা লোভ দেখিয়ে দেশটিতে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছে। তারপরও কাজটা শুরু হোক। বাংলাদেশের উচিত পর্যবেক্ষণ করে মতামত দেওয়া এবং পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম জানিয়েছেন, ‘আজ বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার প্রত্যাবাসনের তালিকায় নাম থাকা ২১৪টি পরিবারের গৃহকর্তাদের মতামত নেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে।’ তিনি বলেন, তারা অনেকে আমাদের আশ^স্ত করেছে। তাই পাঁচটি বাস ও তিনটি ট্রাক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা এই পর্যন্ত যেসব রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলেছি, তারা প্রত্যেকে স্বেচ্ছায় নিজ উদ্যোগে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছে। এতে কাউকে জোর করে আনা হয়নি। এসব পরিবারের সংখ্যা, তাদের শর্তসমূহসহ বিভিন্ন তথ্য নিয়ে ডেটাবেইজ প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং রাতের মধ্যেই আমরা তালিকাটি প্রস্তুত করব। এসব তালিকা থেকে সকালে যারা স্বেচ্ছায় গাড়িতে উঠবে মূলত তাদেরই প্রত্যাবাসন করা হবে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার জন্য বাংলাদেশে মিয়ানমারের দূতাবাসের এক কর্মকর্তা ও চীনা দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তা বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছেন। তারা পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করবেন। সারাদিন তারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন বলে জানিয়েছেন।’
আবুল কালাম বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অধিবাসী হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। আমরা মূলত এই তথ্যটি রোহিঙ্গাদের জানিয়েছি। এছাড়াও মিয়ানমার সরকারের দেওয়া ছাড়পত্র অনুযায়ী ১ হাজার ৩৭টি পরিবারের মোট ৩ হাজার ৫৪০ জনকে ফেরত নেওয়ার প্রথম তালিকাটি দেওয়া হয়েছে। আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। পর্যায়ক্রমে অন্যদের এই প্রক্রিয়ায় আনা হবে। কারণ এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি হিসেবে টেকনাফের কেরনতলী থেকে উখিয়া হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম এলাকা পর্যন্ত নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এজন্য পুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাত লাখেরও বেশি মানুষ। এদের সঙ্গে রয়েছে ১৯৮২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নানা অজুহাতে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া অন্তত সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখের বেশি যারা কক্সবাজারে অবস্থান করছে।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছর ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত বছর ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তবে আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যর্থ হয় ওই উদ্যোগ।
সর্বশেষ চলতি বছর জুলাইয়ে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে নতুন করে উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধি দল। ১৫ সদস্যের দলটি দুদিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠক করে। এসব বৈঠকে রোহিঙ্গাদের তরফে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ও চলাফেরায় স্বাধীনতার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
