সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় রাজধানীর খালগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতাকে। খালগুলো দীর্ঘ সময় পরিষ্কার না করার ফলে আর্বজনা জমে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়া ক্যাচপিট এলাকায় থেকে পানি সেচে ফেলার জন্য যে ২৩টি পাম্প রয়েছে সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে না দীর্ঘদিন। ওয়াসাও বসে আছে হাত গুটিয়ে। ফলে জলাবদ্ধতারও নিরসন হচ্ছে না নগরীর। ওয়াসার দাবি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ করতে পারছে না সংস্থাটি। তবে নিজস্ব অর্থ দিয়ে কিছু খাল পরিষ্কার করা হয়েছে। আবারও নতুন করে ৬০ কোটি অর্থ বরাদ্দ দিতে মন্ত্রণালয়ে পত্র দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংস্থাটি।
বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পানি সরবরাহ) মো. জহিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওয়াসা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আইন দিয়ে তাদের পানি নিষ্কাশনের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে মন্ত্রণালয় তো সব সময় টাকা দিয়ে পারবে না। তাদেরই নিজস্ব অর্থে এটা ম্যানেজ করতে হবে। এখানে বারবার টাকা দেওয়ার মতো কোনো সুযোগ মন্ত্রণালয়ের হাতে নেই।
সূত্র জানায়, অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসা এখন পর্যন্ত ড্রেন পরিষ্কার বা পুনঃখননের জন্য কাজে হাত দিচ্ছে না। অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় ওয়াসার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ১৩৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীও অলস সময় পার করছেন। প্রতি বছর মে মাস থেকে বর্ষা শুরু হলেও ওয়াসার নালা ও খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের (রক্ষণাবেক্ষণ) কাজ শুরু হয় জানুয়ারি থেকে। রক্ষণাবেক্ষণে যে ব্যয় হয়, তার একটি অংশ আসে ওয়াসার নিজস্ব বাজেট থেকে; বাকি অংশ দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু গত দুই বছর ওয়সার পক্ষ থেকে অর্থ চেয়ে পত্র দেওয়া হলেও সাড়া দেয়নি মন্ত্রণালয়। এবারো নতুন করে ৬০ কোটি অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসা জানায়, সংস্থাটির আওতায় ৩৬০ কিলোমিটার পানি নিষ্কাশন নালা, ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট ও মোট ৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ২৬টি খাল রয়েছে। এগুলো
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য দুটি সার্কেল ও একটি বিভাগ রয়েছে। এরমধ্যে ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেলে ৮৭ জন, ড্রেনেজ গবেষণা ও উন্নয়ন সার্কেলে ৩৪ জন এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন (ড্রেনেজ) বিভাগে ১২ জন কর্মরত আছেন। কিন্তু অর্থ না পেলে তাদের তেমন কোনো কাজ থাকে না।
ওয়াসা বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ওয়াসার ড্রেনেজ সার্কেল থেকে পুরনো লাইনগুলো পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ, ওয়াসার চারটি পাম্প স্টেশন ও ১৯টি অস্থায়ী ডিওয়াটারিং পাম্প পরিচালন ব্যয়, পানি নিষ্কাশন নালা, বক্স কালভার্ট ও খাল পুনঃখনন করা, খালের ভাসমান ময়লা পরিষ্কার করা, ক্যাচপিট এবং গ্রেটিংস স্থাপন, কল্যাণপুর স্টম ওয়াটার পাম্পিং স্টেশন পরিচালনাসহ বর্ষা মৌসুমে জরুরি মেরামত কাজের জন্য সব মিলেয়ে ৬০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হচ্ছে। এছাড়া ওয়াসার ৩৬০ কিলোমিটার ড্রেনের ওপর প্রায় ১৩ হাজার ম্যানহোল আছে। প্রতি বছর এসব ম্যানহোলের কাভার ও সøাব মেরামত করতেই কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। তবে এ ব্যয় সংস্থাটির নিজস্ব তহবিল থেকেই হয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক প্রকৌশলী বলেন, আমরা সব ধরনের যুক্তি তুলে মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আসছি। আশা করি বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে অর্থ বরাদ্দ দেবে মন্ত্রণালয়।
তিনি জানান, এর আগেও ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েও না পাওয়ায় খাল খনন, বক্স কালভার্ট ও পাইপলাইন যথাযথভাবে পরিষ্কার করা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। যতটুকু ওয়াসার পক্ষে সম্ভব হয়ে তা করা হয়েছে। ওয়াসার তো বড় ধরনের কোনো নিজস্ব তহবিল নেই। মন্ত্রণালয় অর্থ না দিলে বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিলে ওয়াসার তেমন কিছু করার থাকবে না।
এ প্রকৌশলী বলেন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, খাল ও ড্রেন রক্ষণাবেক্ষণসহ সব ধরনের কাজ করার জন্য সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরা হয়। অথচ গত কয়েক বছরে ওয়াসাকে পাশ কাটিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে দিয়ে শত শত কোটি টাকার ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন ওয়াসার দক্ষ জনবল কাজ না করে বসে ছিল অন্যদিকে অন্য সংস্থার কাজের জন্য পানি নিষ্কাশনে কিছু টেকনিক্যাল জটিলতা তৈরি হয়েছে। এখন জলাবদ্ধতা দেখা দিলে সমস্ত বদনাম ওয়াসার কাঁধে আসে।
