এসইজেডে কর অব্যাহতিতে শিল্প খাতে অসম প্রতিযোগিতা

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৯, ০২:৫৬ এএম

একই দরে, একই উৎস থেকে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি করে দেশি কোম্পানিগুলো। কিন্তু আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) সঙ্গে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ও আগাম কর (এটি) দেওয়ার কারণে বড় অঙ্কের খরচ বাড়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) বাইরের কোম্পানিগুলোর। এসইজেডের ভেতরে গড়ে ওঠা কোম্পানিগুলো পাচ্ছে সব ধরনের কর অব্যাহতি। আমদানি অপরিশোধিত তেল শোধন খরচ সবার জন্য সমান হলেও কর অব্যাহতি সুবিধা না থাকায় এসইজেডের বাইরের কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচ বাড়ছে প্রায় ৬ শতাংশের মতো। অথচ উভয় কোম্পানির উৎপাদিত তেল বিক্রি হচ্ছে দেশের ভেতরের বাজারে, একই দরে। এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে জানিয়ে এসইজেডের বাইরে

থাকা বেশকিছু প্রতিষ্ঠান তা দূর করতে এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি পাঠিয়ে অনুরোধ করেছে।

ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেই নয়, উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিপণনকারী অন্য শিল্প খাতেও একই ধরনের বৈষম্য সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের বেশিরভাগ সিমেন্ট, ইস্পাত শিল্প, এলপি গ্যাসের প্ল্যান্টগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। স্থানভেদে কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ প্রায় একই সমান হওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দরে বিপণন করছে তারা। এরই মধ্যে এসইজেডে বেশ কিছু শিল্প গ্রুপ স্টিল মিল, এলপিজি প্ল্যান্ট, সিমেন্ট কারখানা গড়ে তুলছে। এসইজেডের বাইরের কারখানার চেয়ে কম খরচে তারা পণ্য উৎপাদন করে বিক্রির সুযোগ পাবে। এতে এসব খাতেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে সরকার। এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে ১০ বছরের কর অব্যাহতি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম তিন বছর শতভাগ, চতুর্থ বছর ৮০ শতাংশ ও পরের বছর থেকে প্রতি বছর অব্যাহতি সুবিধা ১০ শতাংশ হারে কমানোর কথা বলা হয়েছে। আয়কর ছাড়াও এসইজেডে বিনিয়োগকারীরা যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, গাড়ি আমদানিতেও শতভাগ আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতি পাচ্ছেন। এসইজেডের ভেতরে ও বাইরের কারখানাগুলোর কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ আগাম কর (এটি) দিতে হয়। তবে এসইজেডের বাইরের কারখানাগুলোকে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ এআইটি দিতে হয়। ভোজ্যতেলের বৈষম্য কমাতে এই ৫ শতাংশ এআইটি প্রত্যাহার করতে এনবিআরে সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের  (বেজা) বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৮-এর খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাঁচামাল আমদানির পর উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি করে এমন বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসইজেডে বিনিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বিএসআরএম স্টিল মিলস লিমিটেড, পিএইচপি স্টিল ওয়ার্কস, ম্যাকডোনাল্ড স্টিল প্রোডাক্টস, গ্যাস ওয়ান লিমিটেড (এলপিজি প্ল্যান্ট), সানজি স্টেইনলেস স্টিল লিমিটেড বিনিয়োগ করেছে। নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যেরবাজার এলাকায় আমান অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে আমান সিমেন্ট কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত পণ্য কম খরচে বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। এতে দেশের অন্যান্য স্থানে আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত সিমেন্ট ও স্টিল মিলগুলোও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

এসইজেডের প্রস্তাবিত স্টিল মিলগুলো উৎপাদন শুরু করলে রড ও স্টিলের বাজারেও অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে জানিয়ে বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ফতুল্লা স্টিল রি-রোলিং মিলসের মালিক মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর অব্যাহতি সুবিধা থাকায় এসইজেডের কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের খরচ সারা দেশে থাকা অন্য কোম্পানিগুলোর চেয়ে অনেক কম হবে। তখন এসইজেডের ভেতরের কারখানার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। আমাদের এই উদ্বেগের কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নীতি-নির্ধারকদের কাছে তুলে ধরব।’

তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার এসইজেডের বিনিয়োগকারীদের কর অব্যাহতি সুবিধা দিয়েছে। যেহেতু এসইজেডের ভেতরে ও বাইরের সব কোম্পানিই দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করে, তাই তাদের কেউ বিশেষ সুবিধা পেলে অন্যদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এসইজেডের বাইরের কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে আবেদন করব আমরা।’

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সেনাকল্যাণ সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে ওঠা সেনাকল্যাণ এডিবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ এসইজেডের ভেতরে ও বাইরের ভোজ্যতেল কোম্পানির অসম প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করে তা সমাধানে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছে। সংস্থাটির ডিজিএম (প্ল্যানিং, অপারেশন ও প্রকিউরমেন্ট) অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আবদুল বারী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিচালিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম হতে অর্জিত আয়ের ওপর আয়কর থেকে বিভিন্ন হারে ১০ বছরের জন্য কর মওকুফ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাতে দেশে প্রতিষ্ঠিত ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে যেসব কোম্পানি এসইজেডের মধ্যে অবস্থিত, তারা আয়কর সুবিধা পাচ্ছে। এসইজেডের বাইরের কোম্পানিগুলো এই কর রেয়াত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে এসইজেডের ভেতরের ও বাইরের কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে এসইজেডের বাইরের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চিঠিতে দেশি বাজারের ভারসাম্য ও ভোজ্যতেল শিল্পপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় এসইজেডের বাইরে থাকা ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলোকে এসইজেডে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব ভোজ্যতেল কোম্পানিকে একই হারে আয়কর রেয়াত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

গ্লোব এডিবল অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশীদ এনবিআরের চেয়ারম্যান, বাণিজ্য ও শিল্প সচিবের কাছে আবেদন করেছেন, যার একটি কপি দেশ রূপান্তরের হাতে রয়েছে। তাতে হারুনুর রশীদ লিখেছেনÑ দেশের মোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত। স্বাধীনতার পর গত ৪৫ বছরে এসব প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে সারা দেশে গড়ে উঠেছে। গত দুই-তিন বছরে গুটিকয়েক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসইজেডের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই গুটিকয়েক শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে দেশের সিংহভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলেই রাতারাতি বন্ধ করে দিয়ে এসইজেডে স্থানান্তর করে আয়কর সুবিধা নেওয়া সম্ভব নয়। এই অসম প্রতিযোগিতার কারণে এসইজেডের বাইরে থাকা বিপুল পরিমাণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় দেশের ব্যাংকধসের পাশাপাশি কোটি কোটি লোকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে।

কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করে হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আগে যেসব প্রতিষ্ঠান ১০ বছর কর অবকাশ সুবিধা ভোগ করে ফেলেছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের (বেজা) অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেসব প্রতিষ্ঠান এখন আবারও ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা ভোগ করছে। আমরা লক্ষ করছি যে, কিছু কিছু ব্যবসায়ী তাদের পুরনো শিল্পকারখানা সচল না রেখে নতুন নামে শিল্প স্থাপন করে বেজার সুবিধা নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী দেশজুড়ে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাবে। বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোরও টিকে থাকা কষ্টকর হবে। এসইজেডের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্ণ হয়ে পড়বে। এসইজেডবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় দেশি বাজারে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম গতকাল বুধবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কোনো শিল্প খাতে সমস্যার সৃষ্টি হলে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান জ্যোতির্ময় দত্ত বৈষম্য কমানোর সুপারিশ নিয়ে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে ট্যারিফ কমিশন শুধু ভোজ্যতেলের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সুপারিশ করেছে। ট্যারিফ কমিশন চেয়ারম্যান এসইজেডের বাইরের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলোকেও আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এআইটি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। এনবিআর চেয়ারম্যান তাতে সম্মতি জানিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে এমআই সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হকের মতামত জানতে চাইলে তিনি সিমেন্ট কারখানার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও প্রিমিয়ার সিমেন্টের পরিচালক আলমগীর কবিরের বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন। আলমগীর কবিরের মোবাইল ফোনে দুবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি পরে ফোন করে কথা বলবেন বলে জানান। তবে আর ফোন করেননি।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘ভোজ্যতেলের বাজারে সৃষ্ট হওয়া অসম প্রতিযোগিতা দূর করতে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক ডেকে পরে স্থগিত করেছি। কারণ বৈঠকে দুইপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। পরে উভয়পক্ষের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছি। এটি দূর করতে এনবিআরে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। উৎপাদিত পণ্য দেশি বাজারে বিক্রি করে এমন অন্য খাতগুলোতেও এ সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিটি ও মেঘনা গ্রুপ নিজস্ব মালিকানায় এসইজেড গড়ে তুলেছে। সেখানে সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস, সিটি এডিবল অয়েল, রূপসী সুগার মিল, রূপসী ফ্লাওয়ার মিল, রূপসী ফিড মিল ও সিটি সিড ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ রয়েছে। এর মধ্যে সিটি অটো রাইস অ্যান্ড ডাল মিলস ও সিটি এডিবল অয়েল কারখানা করেছে সিটি গ্রুপ। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এসইজেডের বাইরের কোম্পানিগুলোর চেয়ে কম দামে পণ্য বাজারজাত করছে। মেঘনা গ্রুপও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় ২৪৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত মেঘনা ইকোনমিক জোনে মেঘনা এডিবল অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড ও সোনারগাঁ ফ্লাওয়ার অ্যান্ড ডাল মিলস লিমিটেড চালু করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসইজেডের বাইরের ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে থাকা আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ এআইটি ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে শুনেছি। ফলে আর কোনো বৈষম্য থাকবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত