ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে আলোচিত নাগরিক তালিকা (এনআরসি) প্রকাশ পাচ্ছে আজ। এর মধ্য দিয়ে রাজ্যটির প্রায় ৪১ বেশি মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় আছেন।
বিবিসি বাংলা জানায়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত এবং তাদের বহিষ্কারের লক্ষ্যে ভারতের বিজেপি সরকার এই তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়।
তবে বাংলাদেশ সরকারের দাবি করে, আসামে তাদের কোন নাগরিক নেই।
কীভাবে এনআরসি ইস্যু শুরু
বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিষয়টি বেশ পুরোনো ইস্যু।
দেশবিভাগের ৪ বছর পর ১৯৫১ সালে আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস বা এনআরসির প্রথম তালিকাটি প্রকাশিত হয়। সে সময় বর্তমান বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ হওয়ায় এখান থেকে লাখ লাখ মানুষ লোক সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বিপুল সংখ্যক বাঙালি মুসলমানদের আগমন হিন্দু-প্রধান আসামের জনসংখ্যার ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে এই আশঙ্কায় সেখানকার অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলো আন্দোলন শুরু করে এবং নাগরিকত্বের প্রথম তালিকাটি তৈরি হয়।
এই সমস্যা আবার দেখা দেয় ১৯৭০-এর দশকে যখন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় লাখ লাখ মানুষ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। এদের কিছু অংশ পরবর্তীতে আসামে থেকে যায়।
অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আসু) ১৯৭৯ সালে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এই আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয় যাতে দুই হাজার জনেরও বেশি অভিবাসী প্রাণ হারান। যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলমান।
শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালে আসু এবং কয়েকটি আঞ্চলিক দল এই ইস্যুতে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটা চুক্তিতে আসে।
চুক্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ আগে থেকে আসামের বাসিন্দা কেউ এমনটা প্রমাণ করতে না পারলে তাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে এবং তাকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু চুক্তিটি কখনই বাস্তবায়ন করা হয়নি।
এত বছর পর কেন এই এনআরসি ইস্যুটি উঠল
অভিজিৎ শর্মা নামে এক ব্যক্তি ২০০৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কাছে এক পিটিশন দায়ের করেন এবং এনআরসি তালিকা হালনাগাদ করার আবেদন করেন।
২০১৪ সালে আদালত ওই তালিকা ২০১৬ সালের ৩১শে জানুয়ারির মধ্যে হালনাগাদ করার জন্য কেন্দ্র সরকারকে আদেশ দেয়।
এক বছরের মধ্যেই ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তিন কোটি ২০ লাখ মানুষের দলিলপত্র যাচাই করে প্রথম খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। যাচাই বাছাইয়ের পর ওই খসড়ার দ্বিতীয় তালিকাটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ৩০শে জুলাই।
কারা আছেন এনআরসিতে
যারা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চের আগে তারা আসামে এসে হাজির হয়েছেন, তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এনআরসিতে।
নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য রাজ্যের সব অধিবাসীকে তাদের জমির দলিল, ভোটার আইডি এবং পাসপোর্টসহ নানা ধরনের প্রমাণপত্র দাখিল করতে হয়।
যারা ১৯৭১ সালের পর জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের প্রমাণ করতে হয়েছে যে তাদের বাবা-মা কিংবা তাদের বাবা-মা ওই তারিখের আগে থেকেই রাজ্যটির বাসিন্দা।
খসড়া তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যের মোট তিন কোটি ২৯ লাখ বাসিন্দা তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে সমর্থ হন। কিন্তু ৪০ লাখ মানুষ এই তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।
নাগরিকত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম কেটে দেয়া হতে পারে।
এরপর নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হয় এবং ৩৬ লাখ ২০ হাজার মানুষ তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য দলিলপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
চলতি বছর ২৬শে জুন আসাম সরকার ঘোষণা করে যে, এক লাখ বাসিন্দাকে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের আবার নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে।
এনআরসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে যে, তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু লোকের কাছে তারা চিঠি পাঠিয়েছে এবং কাছের অফিস বাদ দিয়ে বহু দূরের অফিসগুলোতে গিয়ে তাদের কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এই তালিকা নিয়ে প্রতিক্রিয়া
এনআরসির জন্য ভারত জুড়ে হিন্দু সমাজের কাছে প্রশংসা পাচ্ছে আসামের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। তাদের ভাষ্য, অন্য রাজ্যগুলো সেটা করার ‘সাহস’ পায়নি, আসাম সেটাই করে দেখিয়েছে।
কিন্তু এই তালিকার কঠোর নিন্দা জানিয়ে বিরোধীদলগুলোর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদির সরকার বহু পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে ও লাখ লাখ মানুষকে রাতারাতি রাষ্ট্রবিহীন নাগরিকে পরিণত করেছে।
বিরোধীদল কংগ্রেস পার্টির নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, এই তালিকা মানুষের মধ্যে ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই তালিকার কঠোর সমালোচক। তিনি আশঙ্কা করছেন, এই প্রশ্নে ‘রক্তগঙ্গা’ বয়ে যাবে এবং এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটা পরিহাস।
কিন্তু স্থানীয় ভারতীয় কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, তারা ‘মুসলমানদের লক্ষবস্তুতে’ পরিণত করছেন না।
তবে এনআরসি কোঅর্ডিনেটর প্রধান প্রতীক হাজেলা স্বীকার করেছেন যে, যারা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তারা 'ভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষ'।
স্থানীয়ভাবে আসামের আদি বাসিন্দা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অসমীয়ারা এই প্রক্রিয়াকে জোরালোভাবে সমর্থন করছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বড় অংশ হিন্দু এবং মুসলমান।
স্থানীয় হিন্দুরা বিপুলভাবে এনআরসির সমর্থক হলেও স্থানীয় মুসলমানরা এ নিয়ে কিছুটা নীরব। এ নিয়ে মুখ খুললে তাদেরও বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে, এমনটা ভয় তাদের।
আর তাদের এই আশঙ্কার মূলে রয়েছে আসামের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার প্রধানের বক্তব্য, যেখানে তিনি খোলাখুলিভাবে বলেছেন যে, তিনি মুসলমান অভিবাসীদের চেয়ে হিন্দু অভিবাসীদের প্রাধান্য দেবেন।
এনআরসি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি
নাগরিকত্ব প্রমাণের এই প্রক্রিয়ায় চমকে যাওয়ার মতো ফলাফল দেখা গিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্টের পরিবার, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, বর্তমান রাজনৈতিক নেতা এমনকি কিছু সরকারি কর্মকর্তাও ওই তালিকায় তাদের নাম খুঁজে পাননি।
সামান্য বানান ভুলের জন্য আবেদনকারীদের দলিলপত্র খারিজ করে দেয়া হয়েছে। দেখা গেছে, কোন পরিবারের এক সদস্যের নাম তালিকায় রয়েছে। কিন্তু বাদ পড়েছেন অন্য সদস্য।
অঞ্চলটি নিয়মিতভাবে বন্যার শিকার হওয়ায় একারণে বহু পরিবারের সরকারি কাগজপত্র নষ্ট হয়েছে। দলিলপত্র সংরক্ষণের দুর্বলতা, শিক্ষাবঞ্চিত হওয়ায় এবং অর্থ না থাকায় মামলা করতে পারেনি বহু পরিবার।
পরিবার ও আন্দোলনকারীরা বলছে, এই অনিশ্চয়তার চাপ নিতে না পেরে অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন।
আসামের প্রতিষ্ঠান সিটিজেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস-এর নেতা জামির আলী বলছেন, ‘মানসিক আঘাত ও চাপ’ সইতে না পেরে আসামে ৫১ ব্যক্তির আত্মহত্যার তথ্য তাদের হাতে রয়েছে।
বেশিরভাগ আত্মহত্যা ঘটনা ঘটেছে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের পর, যেসময়ে নাগরিক তালিকার প্রথম খসড়াটি প্রকাশিত হয়েছিল।
নাগরিকত্ব হারানো মানুষের কী হবে
তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষকে কী ভারত থেকে বহিষ্কার করা হবে, এমন প্রশ্ন উঠেছে। তবে সেটি এখনও পরিষ্কার না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও যে বহিষ্কার ঘটবে তার সম্ভাবনাও কম।
এনআরসি তালিকা থেকে যারা বাদ পড়বেন তাদের নাগরিকত্বও সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাবে না। এর বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য তারা ১২০ দিন সময় পাবেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সরকারের একাধিক মন্ত্রী এবং বিজেপির নেতৃবৃন্দরা বহুবার বলেছেন যে, আসামের অবৈধ মুসলমান অভিবাসীদের রাজ্য থেকে বহিষ্কার করা হবে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব মানুষকে যে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে না, তা প্রায় নিশ্চিত। এ ছাড়া অবৈধ অভিবাসী হস্তান্তরের প্রশ্নে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোন চুক্তি নেই।
বিবিসির মতে, এর পরিবর্তে ভারত মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো ‘নতুন একদল রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক তৈরি করে ফেলতে পারে’ এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।
ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ক এক বিশেষজ্ঞ শেষাদ্রি চারি বলছেন, বাংলাদেশ বরাবরই এই ইস্যুটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বিবেচনা করে এবং বলে যে এটা দু'দেশের দ্বিপাক্ষিক কোন বিষয় নয়।’
তিনি বলেন, ‘এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এই সিদ্ধান্তেরই প্রমাণ পাওয়া যায় যে ভারত পাঠাতে চাইলেও একজন অবৈধ অভিবাসীকেও বাংলাদেশ গ্রহণ করবেন না।’
সহিংসতার আশঙ্কা কতটুকু
এই তালিকায় বাদ পড়তে যাওয়া মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আসাম সরকার তালিকার বাইরে থাকা লোকেদের ধর্মীয় পরিচয়ের তথ্য প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে এদের বেশিরভাগই বাংলা-ভাষী মুসলমান।
এনআরসিকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির একটা আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দিচ্ছে, ৩১ অগাস্টের পর যদি কিছু ঘটে সেটা মোকাবেলার কোন প্রস্তুতি সরকারের নেই।
পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য রাজ্য সরকার বন্দি শিবির তৈরি করছে, কথিত অবৈধ অভিবাসীদের জন্য শত শত ট্রাইবুনাল গঠন করছে এবং যারা বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হবেন তাদের একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি করছে।
তবে আসাম-ভিত্তিক সাংবাদিক রাজীব ভট্টাচার্য্য লিখেছেন, এনআরসি-পরবর্তী আসামের জন্য ‘দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গির’ প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, “সরকার বিদেশিদের ব্যাপারে কোন পরিকল্পনা নেয়নি, কারণ তারা জানে এদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।”
রাজ্যটির বিবিসির সংবাদদাতা জানান, “সব আপিল এবং চ্যালেঞ্জ দূর হওয়ার পর এই তালিকাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা শুরু হতে পারে।”
তিনি বলেন, “আর সেটা শুরু হবে যখন এরা তাদের জমি, ভোটের অধিকার এবং মুক্তির প্রশ্নে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবে।”
