ভোর ভোর ঘুম ভেঙেছে কী ভাঙেনি, পাশে রাখা মোবাইলটা শব্দ করে বেজে উঠল। ঈষৎ বিরক্তি নিয়ে হ্যালো বলতেই আমার বহুদিনের বন্ধু, এখন পশ্চিমবঙ্গের এক বিশিষ্ট শিল্পপতি ঝাঁজিয়ে উঠল। ঘুম জড়ানো অবস্থায় প্রথমে বুঝতে পারিনি কেন এই রাগ! যার জন্য সাতসকালে এ রকম চেঁচামেচি। ধাতস্থ হয়ে বুঝলাম যে রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এনআরসি (জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন) নিয়ে আমার এক পোস্ট পড়ে ও এত ক্ষেপে গেছে। আমি সেখানে লিখেছিলাম, বিজেপি এখন এনআরসি সারা রাজ্যে চালু করা নিয়ে এত হইচই করছে, আগামী দিনে এই এনআরসিই নিশ্চিত তাদের বিপদে ফেলবে। আমার বন্ধু এই মতের সঙ্গে একেবারে একমত নয়। ওর মত, দেশের স্বার্থে বিজেপি এই ‘মহান’ কাজটি করছে। এর মধ্যে কোনো অন্যায় নেই। ওর যুক্তি, দেশে যদি লাখ লাখ লোক বেআইনিভাবে ঢুকে থাকে, তাদের অবশ্যই চিহ্নিত করে বের করে দিতে হবে। না হলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। দেশ এক পা-ও সামনে এগোতে পারবে না।
অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে বন্ধু ভালো করেছে। কারণ এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা বের হওয়ার পর থেকে দেশ-বিদেশে, পক্ষে-বিপক্ষে এনআরসি নিয়ে যত চর্চা হচ্ছে, তার প্রায় একশো শতাংশই রাজনৈতিক আলোচনা। অর্থনীতি যেকোনো কারণেই হোক, সেভাবে চর্চায় আসছে না। অথচ রাষ্ট্রের, সরকারের পক্ষে যারা ওকালতি করছেন, তারা এই এনআরসি করতে গিয়ে আসামের অর্থনীতির ছবিটা কতটা বিবর্ণ হয়ে পড়ছে, তা নিয়ে সেভাবে কারুর মাথাব্যথা আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিয়ে কোনো দেশ উন্নতি করেছে এমন নজির পৃথিবীর কোনো দেশে আছে বলে তো শুনিনি।
অর্থনীতিতে আসব। তার আগে এখন আসামের পরিস্থিতি ঠিক কী রকম একটু দেখে নিই। গৌহাটি বাদ দিয়েও এনআরসির প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর থেকে মোটামুটি আসামের বিভিন্ন গ্রাম-শহর ঘুরে বেড়িয়েছি। কত জেলা, মহকুমা, সদর, গ্রামীণ এলাকা। ধুবড়ি, গৌরীপুর, হাইলাকান্দি, শিলচর ও করিমগঞ্জ। এক-একটা জায়গায় কত কত গ্রাম বারুইগ্রাম, কায়স্থগ্রাম, আন্জিবরগুল, সেটেলমেন্ট, এরানিওল, সুতারকান্দি, মধুরবন্দ, মাসীমপুর, তোপখানা, শিলিকুড়ি, উধারবন্ধ আরও কত আপাত সামান্য জনপদ। এই ‘সামান্য’ জনপদই আগামীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থেকে যাবে। সমাজতাত্ত্বিক যেকোনো গবেষণায় উপাদান খুঁজতে এসব মহল্লায় আপনাকে আসতেই হবে।
সারা আসাম এখন অস্বাভাবিক শান্ত। ওপর থেকে দেখে বোঝা যাবে না কী রকম উদ্বেগ নিয়ে সে দিন কাটাচ্ছে। অতিমাত্রায় শান্ত, থমথমে আসামের জনজীবন। আগের মতো সবাই রাস্তায় নেমেছেন। বাচ্চা ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে মায়ের হাত ধরে। অফিস-আদালতে ব্যস্ততা তুঙ্গে। সিনেমা হল খোলা। কে বলবে মাত্র দুদিন আগেই রাজ্যের প্রায় কুড়ি লাখ লোক তাদের নাগরিক অধিকার খুইয়ে রাতারাতি সরকারি আধিকারিকের কলমের এক খোঁচায় বিদেশি বলে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। এই উনিশ লাখের মধ্যে কে নেই! প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিবার, বীরত্বের জন্য দেশের খেতাব পাওয়া জওয়ান, প্রাক্তন এমএলএ। আর অবশ্যই সমাজের এক্কেবারে নিচে থাকা গরিবস্য গরিব মানুষের বড় অংশ। ওপর ওপর না দেখে আপনি যদি মাইলের পর মাইল ঘুরতে থাকেন, তখন আপনি বুঝতে পারবেন আপাত স্বাভাবিক আসামের চূড়ান্ত অস্বাভাবিক সঠিক ছবিটা। টের পাবেন গরিবের হাহাকার, যন্ত্রণা। উদ্বেগে নীল হয়ে যাওয়া ব্যথা ও অনিশ্চয়তা। এক বছর ধরে এই এনআরসি নামের বিভীষিকার কারণে ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন অজস্র লোক।
এ রকম অনেক বিপর্যস্ত পরিবারের কাছে যেতে যেতে কখন যেন নিজেরাই ভয়ে অবশ হয়ে যাই। গিয়েছি তো তথ্যচিত্র তুলতে। এখন এই অচেনা আসামে কেমন অসহায় লাগছে। আমি ও আমার ক্যামেরাম্যান, ইউনিটের অন্যরা কেউ কারুর সঙ্গে কথা বলা দূরে থাক, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মুখের দিকে তাকাতে পারি না। প্রযুক্তির যুগে নেট খুললেই কত তথ্য, ডেটা, সংখ্যাতত্ত্ব, চ্যানেলে চ্যানেলে রাজনৈতিক চাপান-উতোর। বিষাদে নুইয়ে পড়া আসামকে জানতে আপনাকে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ যাওয়া হতদরিদ্র মানুষের কাছে যেতে হবে। এনআরসির পরিপ্রেক্ষিত ও কার্যকারণ নিয়ে অনেক চর্চা চলছে। তাও প্রয়োজনে পরে কখনো বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।
এখন শুধু এনআরসি প্রক্রিয়ার যে পরিণতি, তার রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়ে একটু বলে নিই। ইতিমধ্যেই আমার দেশের মূল স্রোতের দল বা সংগঠন, বিশেষ করে শাসক শিবিরের নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, এই ‘মাত্র’ উনিশ লাখ লোকের বাদ পড়ায় তারা আদৌ সন্তুষ্ট নন। তারা ঠিক করেছেন সুপ্রিম কোর্ট অবধি যাবে ‘ন্যায়বিচার’ পেতে। অর্থাৎ তাদের দাবি যথাযথ চিহ্নিত করে অনেক বেশি লোকের নাম বাদ দিতে হবে। অবশ্যই সবই দেশের ‘স্বার্থে’। এই রাজনৈতিক বিশ্বাস তারা যত্ন্রের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ‘মধ্য ও উচ্চবর্গে’র হিন্দু মনে চালিয়ে দিতে পেরেছেন। আমার শিল্পপতি বন্ধুর মনোভাব কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। আর একটা কাজ এই এনআরসির দৌলতে শাসক দল করতে পেরেছে মানুষে মানুষে, সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্প্রদায়ের, ধর্মের সঙ্গে ধর্মের বিবাদ লাগিয়ে দিয়েছে। এই ভাগ করো আর শাসন করো ভেদনীতি তারা শিখেছেন ব্রিটিশের কাছ থেকে। আসামে অদ্ভুত এক হতাশা আর অবিশ্বাসের আবহাওয়া জন্ম নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চাইলেও একজোট হয়ে রাস্তায় নামা খুব কঠিন।
উনিশ-কুড়ি লাখ তো সংখ্যা মাত্র। সংখ্যা দিয়ে কি আর যন্ত্রণা মাপা যায়! লিখতে লিখতে কত মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বৃষ্টির মধ্যে এক সকালে ধুবড়ির এক গরিব পাড়ায় আমার বন্ধু সাংবাদিক ইলিয়াস নিয়ে গিয়েছিল। সরু গলি। অল্প বৃষ্টিতেই জল দাঁড়িয়ে গেছে। টিনের ছাউনি দেওয়া মাটির সারি সারি বাড়ি। কয়েকশ গরিবের বাস। ইলিয়াস বেশ জনপ্রিয় এখানে। সুখে-দুঃখে পাশে থাকে মানুষগুলোর; তা বোঝা যায়। ও আমাকে নিয়ে এসেছে জাহানারা বিবির বাসায়। দরজা বন্ধ। প্রৌঢ়া ওই মহিলা এনআরসিতে নাম ওঠেনি বলে মাত্র তিন দিন আগে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছে। অনেক ডাকাডাকির পর উষ্কখুষ্ক চেহারা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন জাহানারা বিবির ছেলে। কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। মুখে ও চোখে গভীর যন্ত্রণার ছাপ। বেশ কয়েকজন পড়শি ততক্ষণে আমাদের দেখে ভিড় করেছেন। সবাই বলছেন, জাহানারা খুব শান্ত মহিলা ছিলেন। লোকের বাড়িতে বাসন মাজতেন। সাত চড়ে রা ছিল না। নাগরিক তালিকায় নাম ওঠেনি বলে আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। অনেক বুঝিয়ে ছিলাম অত চিন্তা কোরো না। ও শুধু বিড়বিড় করত আপন মনে। বলতÑ ‘এত ঠিকঠাক কাগজ দিলাম, তাও বাদ দিয়ে দিল!’ তাও তিনি আত্মহত্যা করবেন কেউ ভাবেনি।
অর্থনীতির হিসাবনিকাশ একটু দেখে নিন। ইতিমধ্যেই যাদের নাম এনআরসি থেকে বাদ গেছে, ছোটাছুটি করে দিস্তা দিস্তা কাগজ নিয়ে এনআরসি সেবা কেন্দ্রে নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করার বৃথা চেষ্টা করতে করতেই ৭ হাজার ৮৩৬ কোটি রুপি খরচ হয়ে গেছে তাদের। প্রথম দফায় বাদ গিয়েছিল ৪০ লাখ। পরে আরও এক লাখ। সবমিলিয়ে ৪১ লাখ। মাথাপিছু উনিশ হাজারের কাছাকাছি খরচ হয়েছে, তাই পুরোটা যোগ করলে দাঁড়ায় ৭৮,৩৬০,৩৭১ রুপি। ফলে গরিব আরও গরিব হয়ে গেছে, তা বলাবাহুল্য। আসামের মাথাপিছু আয় মোটের ওপর ৬৭ দশমিক ৬২০ রুপি। তা নেমে এসেছে এক ধাক্কায়Ñ ৪৮ দশমিক ৫৫৫ রুপিতে। অন্তত অর্থনীতির এই হিসাব বেরিয়েছে যে তিনটি এলাকা থেকে, সেই গোয়ালপাড়া, বক্সা ও কামরুপের সমীক্ষা রিপোর্ট তাই বলছে। অর্থনীতির গবেষকদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আসামের অর্থনীতি আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত ছোট ছোট অনেক দেশের মতো হতে বাধ্য। এনআরসি সোমালিয়া আর আসামকে এক সারিতে এনে দিয়েছে।
লেখক
ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
