বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল-বিএআরসির গবেষণায় দেশের বিভিন্ন বাজার থেকে প্যাকেটজাত ও খোলা চিনির নমুনা পরীক্ষায় সোডিয়াম সাইক্লামেট বা ঘনচিনির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিএআরসি প্যাকেটজাত চিনির ১২টি ও খোলা চিনির চারটি নমুনা সংগ্রহ করে তা সিঙ্গাপুরের প্যাসিফিক ল্যাব থেকে পরীক্ষা করায়। ওই পরীক্ষায় সবগুলো নমুনাতেই সোডিয়াম সাইক্লামেটের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সাধারণভাবে ঘনচিনি হিসেবে পরিচিত সোডিয়াম সাইক্লামেট এমন এক রাসায়নিক যা চিনির চেয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ গুণ বেশি মিষ্টি এবং তুলনামূলকভাবে দামও অনেক কম। দেখতে সাদা পাউডারের মতো সোডিয়াম সাইক্লামেটের স্বাদ প্রায় চিনির মতোই। মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ সোডিয়াম সাইক্লামেট দীর্ঘদিন ধরে খেলে প্রাণঘাতী ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সোডিয়াম সাইক্লামেটের ব্যবহার ও আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়।
এখন এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকা ঘনচিনি বা সোডিয়াম সাইক্লামেট বাজারজাত করা চিনিতে এলো কী করে। বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘সাদা চিনিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে, এই গবেষণায় সম্পৃক্ত বিএআরসির পরিচালক ড. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আখের রস থেকে তৈরি চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বাদামি বা লালচে চিনিতে এ ধরনের কোনো সমস্যা নেই। তবে বেসরকারি খাতের বেশিরভাগ ব্র্যান্ডের সাদা চিনি পরীক্ষা করে ‘ঘনচিনির’ অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিএআরসির এই পরিচালক আরও জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতের রিফাইনারি কোম্পানিগুলো দেশে শোধনকালে সোডিয়াম সাইক্লামেট ব্যবহার করছে, নাকি যেখান থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করা হচ্ছে সেখানেই এটি মেশানো হচ্ছে সে বিষয়টি জানেন না তারা।
বিএআরসির এই গবেষণার ফল প্রত্যাখ্যান করে বেসরকারি খাতের চিনিকল বা রিফাইনারি ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, দেশে যে পাঁচটি রিফাইনারি আছে, তাদের কারও এ ধরনের ঘন চিনি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই, তারা কেউই এ ধরনের কাজ করেন না। ব্যবসায়ীরা একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি সংস্থা বিএআরসি কেন দেশের কোনো গবেষণাগারে পরীক্ষা না করে সিঙ্গাপুর থেকে এই পরীক্ষা করল। অবশ্য এ বিষয়ে বিএআরসির বক্তব্য হলো, দেশের একেক ল্যাবের পরীক্ষার ফলাফল একেক রকম হওয়ায়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন সিঙ্গাপুরের প্যাসেফিক ল্যাবে ওই পরীক্ষা করিয়েছেন তারা। এদিকে, রাষ্ট্রীয় সংস্থা নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিএআরসির গবেষণার ফল জানার পর তারা বাজার থেকে চিনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছেন, পরীক্ষার ফল হাতে না পাওয়ার আগে এ বিষয়ে তাদের কিছু বলার নেই।
বিপুল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় থাকা চিনিতে সোডিয়াম সাইক্লামেটের অস্তিত্বের খবর খুবই উদ্বেগজনক। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, ১৯৮২ সালের প্রথম জাতীয় ওষুধ নীতিতেই সোডিয়াম সাইক্লামেট আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা ফাঁকফোকর গলে দেশে ভয়ংকর এই রাসায়নিকের আমদানি হয়েছে। দেখতে একই রকম হওয়ায় সাইট্রিক অ্যাসিড, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম সাইট্রেটের নামে ঘনচিনি বা সোডিয়াম সাইক্লামেট দেশে আমদানি করা হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেবল চিনিতে নয়, নানারকম পানীয়, জুস ও শিশুখাদ্যেও সোডিয়াম সাইক্লামেটের উপস্থিতির যে অভিযোগ রয়েছে তাও পরীক্ষা করা উচিত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিষিদ্ধ করলেও তাদেরই একটা শাখা চিফ কন্ট্রোলার অব ইমপোর্টস অ্যান্ড এক্সপোর্টস-‘সিসিআইই’ এই রাসায়নিক আমদানি করে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে সোডিয়াম সাইক্লামেট আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ।
এ পরিস্থিতিতে, বিশেষভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজনÑ দেশে আখ চাষ এবং আখের রস থেকে বাদামি চিনির উৎপাদান বাড়ানো ও বাজারজাত করার বিষয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর চিনির চাহিদা ১৮ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে সরকারি চিনি কলগুলো বছরে ৬৫-৭০ হাজার টন চিনি উৎপাদন করে থাকে। দেশের চাহিদার বাকি ৯০ ভাগেরও বেশি চিনি সরবরাহ করছে বেসরকারি রিফাইনারিগুলো, যারা আমদানি করা কাঁচামাল থেকে সাদা চিনি উৎপাদন করে থাকে। মনে রাখা দরকার এই রিফাইনারিগুলোর শর্ত ছিল তারা তাদের উৎপাদিত চিনির ৫০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। কিন্তু দেশে চিনির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে তারা শর্ত ভঙ্গ করে উৎপাদিত সমুদয় চিনিই দেশে বাজারজাত করছে। অন্যদিকে দেশের ১৫টি সরকারি চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার টন হলেও এখন বছরে চিনি উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ৭০ লাখ টনের মতো, যা উৎপাদনক্ষমতার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্যের বিবেচনায় যেমন চিনিতে সোডিয়াম সাইক্লামেটের বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে, তেমনি দেশে বাদামি চিনির উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে।