কল্যাণ তহবিলে বিপুল অর্থ সহায়তা পান না শ্রমিকরা

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:১৫ এএম

প্রায় চারশ কোটি টাকা জমা পড়েছে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে। নিয়মিত এ তহবিল বাড়ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অনুদানে। অথচ আবেদন জানিয়ে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও সহায়তা পাচ্ছেন না দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, কর্মহীন ও অসুস্থতার কারণে আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত অসংখ্য শ্রমিক ও তাদের স্বজনরা। এমনকি চিকিৎসার জন্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করে এরই মধ্যে অনেকে মারাও গেছেন। তবুও মেলেনি তহবিলের অনুদান। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে ১০ শ্রমিক ও তাদের স্বজনরা বলেন, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, শারীরিক অসুস্থতা, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাসহ নানা কারণে দেড় থেকে দুবছর আগে অনুদান চেয়ে আবেদন করেন তারা। এরপর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আজ পর্যন্ত যোগাযোগ করা হয়নি। ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠিত সাব-কমিটির আহ্বায়ক ও এ খাত সংশ্লিষ্টরাও তহবিলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৬ সালে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন তৈরি করা হয়। আইন অনুযায়ী, কোম্পানির মুনাফার দশমিক ৫ শতাংশ তহবিলে জমা দেওয়ার কথা। ২০১৭ সাল থেকে আইনটির কার্যকারিতা শুরু হয়। শ্রমিকের মৃত্যু, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষাÑ এই তিন ক্যাটাগরিতে ২৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে আইনে।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ হাজার প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হলেও মাত্র ১৪০টি কোম্পানি তহবিলে টাকা জমা দিয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে তহবিলে জমা হয়েছে ৩৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর করা হয়েছে ৩২৮ কোটি এবং মূল হিসাবে আছে ৫৫ কোটি টাকা।

ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ডা. এ এম এম আনিসুল আউয়াল জানিয়েছেন, ২০১২ সাল থেকে এ তহবিলের সহায়তা পেয়েছেন ৯ হাজার ৯ শ্রমিক, যার পরিমাণ ৩১ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিবছর ১০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক সহায়তার জন্য আবেদন করেন। এসব আবেদনের চার ভাগের তিন ভাগই বাতিল হয়ে যায়। অথচ দেশের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি শ্রমিকের বিপরীতে যে পরিমাণ আবেদন জমা পড়ছে তা একেবারেই সামান্য।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তহবিল থেকে সহায়তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে মারা গেছেন অনেক শ্রমিক। এমনই একজন ফরিদপুরের আলমগীর হোসেন (৪৫)। গত বছরের মার্চে ঢাকার সাভারের কালু লেদারে কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় বাঁ-হাতের তিন আঙুল হারান তিনি। মালিকের কাছ থেকে চিকিৎসার খরচও পাননি। নিজ খরচে চিকিৎসা করে কিছুটা সুস্থ হলেও শারীরিক অক্ষমতার কথা বলে পরে তাকে আর চাকরিতে নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। বহু চেষ্টা করেও অন্য কোথাও চাকরি জোটাতে পারেননি তিনি। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ও সংসারের অনটন মেটাতে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে সহায়তা চেয়ে আবেদন করেন আলমগীর। এরপর কাটা হাতে ইনফেকশন হয়ে গত জুলাই মাসে মারা যান তিনি। অথচ আজ পর্যন্ত ফাউন্ডেশন থেকে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগই করা হয়নি।

এ বিষয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আলমগীর হোসেনের স্ত্রী শামসুন্নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষটা চিকিৎসা আর খাওনের অভাবে মইরে গেল। কাজের জন্য কতজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে। কেউ কাম দেয়নি। আশায় আছি, সরকারে কিছু ট্যাকা দিব, তাই লইয়া মাইয়াটারে লইয়া বাঁইচা থাকুম। কিন্তু তার তো কোনো খবর নাই।’

কর্মক্ষেত্রে গুরুতর আহত মিতালি ট্যানারির শ্রমিক মোহাম্মদ সুমন, ফোর ব্রাদার্স গার্মেন্টসের কর্মী নিরুতাজ বেগম, সাইনেস্ট গার্মেন্টসের মোটরশ্রমিক মিরাজ হোসেন দেড় থেকে দুবছর আগে শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে আবেদন করলেও এখনো তাদের সঙ্গে যোগাযোগই করা হয়নি। দুর্ঘটনায় অঙ্গহানির শিকার এসব শ্রমিকের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন সেইফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা গত কয়েক বছরে ৫০ শ্রমিকের জন্য সহায়তার আবেদন করেছি। এর মধ্যে টাকা পেয়েছে মাত্র দুজন। বাকিদের ব্যাপারে বহুবার যোগাযোগ করা হলেও ফাউন্ডেশন কোনো সদুত্তর দেয়নি।’ জানতে চাইলে ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিসুল আউয়াল বলেন, ‘দুই তিন বছর আগের আবেদন এখন দেখার সুযোগ নেই। কাগজপত্র উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। প্রতিদিন আবেদন আসতে থাকে। এসব আবেদনের ৩০ শতাংশ ভুয়া। এখানে জনবল সংকট আছে, সব কাজ আমাকেই করতে হয়।’ 

শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, প্রতি তিন মাস অন্তর পরিচালনা পর্ষদের সভা হওয়ার কথা। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত হয় কাদের সহায়তা দেওয়া হবে। তবে জনবল সংকটসহ নানা কারণে তিন মাস পর পর সভা করতেই পারছে না পর্ষদ। তারা আরও বলেন, সহায়তা পাওয়ার আবেদনপত্র এতই কঠিন যে, অল্প শিক্ষিত-অশিক্ষিত শ্রমিক তা বুঝতেই পারেন না। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে অনেক ব্যক্তির স্বাক্ষর জোগাড় করতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে আবেদন বাতিল করে দেয় ফাউন্ডেশন।

শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সভাপতি শাহ মো. আবু জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফান্ডের ভেতরে অনেক অনিয়ম আছে। দালাল চক্র এখানে অনেক শক্তিশালী। সিল স্বাক্ষর নকল করে যার তার নামে টাকা তুলে নেয়। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মিথ্যা লোক সাজিয়ে এনে টাকা তুলে নেয়। এতে প্রকৃত শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছে। বোর্ড মিটিংয়ে আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যারা টাকা পাচ্ছে তারা আসলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক কি নাÑ তা তদন্তের জন্য। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অনেকে দ্বিমত করেছেন। ফলে যে উদ্দেশ্যে তহবিল করা হয়েছিল তা সফল হয়নি।’

শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের নানা অভিযোগ নিয়ে কাজ করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১ নম্বর সাব-কমিটি। সাংসদ ইসরাফিল আলমকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই সাব-কমিটি এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠকও করেছে। মন্ত্রণালয়, ফাউন্ডেশন ও শ্রমিকদের কথা শুনেছেন তারা। ইসরাফিল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই তহবিলের টাকার হকদার দেশের প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু তহবিল সম্পর্কে দেশের ৯০ ভাগ শ্রমিক এখনো কিছুই জানে না। তাই আমাদের প্রস্তাব ছিল দেশের প্রত্যেক উপজেলা-ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, ইউএনওদের কাছে আবেদন ফরম পাঠানো হোক। ওখানে প্রতিদিন কোনো না কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় পড়ে। জনপ্রতিনিধিরা যদি সার্টিফাই করে হেড অফিসে পাঠাত, তা হলে এটা সহজ হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছি, সহায়তার টাকা ঢাকায় না দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে অনুষ্ঠান করে দিতে। এতে শ্রমিকরা তহবিল সম্পর্কে জানতে পারত। কিন্তু এসবের কোনোটাই হয়নি। এত কষ্টে আমরা একটা তহবিল করলাম, টাকাও আছে অনেক কিন্তু এর বিতরণে স্বচ্ছতা নেই। কে টাকা পেল, কোথায় গেলÑ এগুলো নিয়ে অনেক সন্দেহ আছে। এতে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী তহবিলের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত