জিয়া-এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বলা বৈধ নয় : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০২:১৪ এএম

হাইকোর্ট জিয়া ও এরশাদের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। এ কারণে এই দুজনের কাউকেই বৈধ রাষ্ট্রপতি বলা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও

সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার একাদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। বঙ্গবন্ধুর শুরু করা সাভার স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনারের কাজ সম্পন্ন করাসহ এরশাদের বেশ কিছু কাজের প্রশংসাও করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘এরশাদের মধ্যে অমায়িক আচরণ ছিল।’ মানুষের প্রতি তার দরদ ছিল।

সংসদ সভাপতি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পরে সংসদ সদস্যরা এর ওপর আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনা শেষে এরশাদের স্মরণে সংসদ মুলতবি করা হয়। এরশাদ ছাড়া আরও দুজন সাবেক সাংসদ ও একজন এমএলএর মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। অন্য যাদের নামে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে তারা হলেন সাবেক গণপরিষদ ও সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি, সাবেক এমএলএ ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, সাবেক এমএলএ অধ্যক্ষ খালেদা হাবিব ও সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারা বেগম।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পঁচাত্তরে জাতির পিতার হত্যার পর জিয়া ক্ষমতা দখল করেন। তাকে অনুসরণ করে এরশাদ প্রথমে মার্শাল ল জারি করেন। এরপর নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। এক মিলিটারি ডিক্টেটর থেকে আরেক মিলিটারি ডিক্টেটর আসুক, সেটা কখনোই আমাদের কাম্য ছিল না। এর বিরুদ্ধে আমরাই প্রতিবাদ করেছি। আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।’

এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণে খালেদা জিয়া সুযোগ করে দিয়েছিলেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ কারণেই তিনি খালেদা জিয়াকে শুধু দুটি বাড়িই নয়, নগদ ১০ লাখ টাকাসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন। যে কারণে জিয়া হত্যার ব্যাপারে যে মামলা হয়েছিল, সেই মামলা বিএনপি চালায়নি। তবে বহু বছর পরে ১৯৯১ সালে বা তারপর খালেদা জিয়া জেনারেল এরশাদকে তার স্বামী হত্যার জন্য দায়ী করেছেন।

গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে এরশাদের অধীন ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে অংশ নিই। ওই নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে এ ধরনের বিতর্কিত হতে হতো না। একটি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হতো। এরশাদ নিজেই সেই সংসদ ভেঙে দিয়ে আবারও বিতর্কিত হয়ে যান। এরপর ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে কোনো দল অংশ নেয়নি। তখন আন্দোলনের মুখে তিনি ১৯৯০ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। রওশন এরশাদের নেতৃত্বে ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দলটিকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

সংসদে বিএনপির অংশ নেওয়ায় সাধুবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের অংশগ্রহণে বিরোধী দল সংখ্যায় বেড়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাটা অব্যাহত আছে। তারা (বিএনপির এমপি) সংসদে বসেন, আবার বলেন, নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি। ভোট না দিলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির সরকারকে আমরা যেভাবে উৎখাত করেছিলাম, তারাও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেভাবে সরকারকে উৎখাত করতে পারত। কিন্তু জনসমর্থন নেই বলে তারা তা পারছে না।

১৯৯১ সালে বিএনপির শাসনামলে এরশাদের জেল হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, এরশাদ সাহেব যখন পদত্যাগ করেছিলেন, তখন তাকে গ্রেপ্তার করে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। রওশন এরশাদকেও বন্দি করে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছিল। কারাগারের ভেতরও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে হেয় করা হয়েছে। আমরা তো সে ধরনের অভদ্র আচরণ করছি না। আমরা যথেষ্ট উদারতা দেখাচ্ছি। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হলেও খালেদা জিয়াকে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

শোক প্রস্তাব আলোচনায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এরশাদ একজন সজ্জন মানুষ ছিলেন। নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের উন্নয়নে তিনি সব সময় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় জিয়াউর রহমানের মতো বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। তথাকথিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কর্নেল ফারুককে রাষ্ট্রপতি করেছিলেন। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এটা বলতে চাই না। আমরা ভুলে যেতে চাই। কিন্তু বললাম, রেকর্ডে থাকল।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, দোষে-গুণে মানুষ। যে সব বিষয়ে আজ সমালোচনা না করি। সমালোচনা না করাই ভালো। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, তার সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক মত ও পথের ভিন্নতা ছিল। আমরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। কিন্তু তিনি একজন বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তিনি সামরিক শাসন জারি করেছিলেন, আমাদের অনেককে গ্রেপ্তার করেছেন। তিনি একবার আমাকে বলেছিলেন, রাজনৈতিক কারণে আপনাকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। আমি বললাম, আমি ভুলে গেছি।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, দেশ ও জাতির জন্য তার অনেক অবদান রয়েছে। তিনি যে কাজ শুরু করেছিলেন তার পরিচর্যা অনেকেই করেছেন। কিন্তু মূল বীজ বপনটা এরশাদ করেছিলেন। তাকে বাদ দিয়ে এ দেশের রাজনীতির সমীকরণ হয়নি।

সংসদে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, ভারতের সাবেক অর্থ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি, আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ সদস্য আ ন ম শফিকুল হক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সুফি সাধক শেখ আব্দুল হানিফ, কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নুরুল ইসলাম, একুশে পদক ও ভারতের পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত সমাজসেবী গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব ঝর্ণা ধারা চৌধুরী, ভাষাসংগ্রামী খালেকুল আল আজাদ এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম অধিনায়ক আনোয়ারুল কবির শামীমের মৃত্যুতেও সংসদ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ওহিয়ো ও টেক্সাসে বন্ধুকধারীর হামলায়, সুদানে বন্যায় ও দুর্ঘটনায় এবং দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে সংসদ থেকে গভীর শোক প্রকাশ, সবার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়।

আলোচনায় আরও অংশ নেন শাজাহান খান, রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, আহসান আদিলুর রহমান আদিল, সালমা ইসলাম, নাজমা আক্তার, বিরোধী দলের চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা, বিএনপির হারুন অর রশীদ, তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী।

মৃত্যুবরণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে মোনাজাতও করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন সরকারি দলের হাফেজ রুহুল আমিন মাদানি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত