ভারতের কিছু কিছু অঞ্চলের একাধিক স্বামী গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে নারীদের। পুরুষ অনুপাতে নারীর সংখ্যা কম হওয়ায় দেশটিতে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের বাঘপট জেলার একটি ঘটনা বেশ আলোচনা তুলেছে।
টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৭ বছরের মাজিদার সঙ্গে বিয়ে হয় উত্তর ভারতীয় এই রাজ্যের এক লরি চালকের। বিয়ের এক মাস না পেরোতেই দুই দেবর স্ত্রী হিসেবে মাজিদার সঙ্গ চায়। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তিনি ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন।
পত্রিকাটিকে মাজিদা জানান, স্বামী ও দেবররা তার কাছে আসার জন্য নিজেরাই দিন ভাগাভাগি করে নেয়।
মেয়ে শিশুর ভ্রূণ হত্যার কারণে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানা যায়।
বাঘপট জেলাকে লৈঙ্গিক ভারসাম্যহীন সংকটের মূল কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। ২০১৪ সালে এই এলাকায় নারী-পুরুষের অনুপাত জরুরি অবস্থায় পৌঁছেছে বলে সতর্ক করে দেয় জাতিসংঘ।
২০১১ সালে সরকারি পরিচালিত আদমশুমারিতে দেখা যায় এই জেলায় ১ হাজার পুরুষের বিপরীতে মাত্র ৮৫৬ জন নারী রয়েছেন।
নারী ভ্রূণ হত্যা রোধে কাজ করছেন এনজিও বাৎসল্য। এই সংস্থার ড. নিলম সিং জানান, এই ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। যা ২০২১ সালের আদমশুমারিতে আরও স্পষ্ট হবে।
নারী অধিকার প্রচারক দেবেন্দ্র দাম জানান, এই অঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কোনো বাড়িতে গেলে কোনো মেয়ে শিশু দেখা যায় না।
সাধারণত দরিদ্র পরিবার থেকে বউ নিয়ে আসে অনেক পরিবার। সেখানে এক ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হলেও অন্যদের স্ত্রী হয়ে থাকতে হয় নববধূকে। এমনকি চাচাতো দেবরের স্ত্রী হতেও বাধ্য করা হয়।
বাধ্যতামূলক ও উঁচু অঙ্কের যৌতুকের কারণে সাধারণত মেয়ে সন্তান নিতে অনাগ্রহী হন বাবা-মা। সন্তানকে ভ্রূণ অবস্থায় মেরে ফেলা হয়। একে লিঙ্গভিত্তিক গণহত্যাও বলা হয়ে থাকে। যার মাধ্যমে নারীর বেঁচে থাকার মৌলিক ও প্রাথমিক অধিকারকে অস্বীকার করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নিয়ে অনেক হই চই হলেও ভারতে দিন দিন নারী শিশুহত্যা বাড়ছে। গবেষণা বলছে, এই হার সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ভারতে।
সর্বশেষ ২০ বছরে এক কোটি গর্ভপাতের ঘটনা ঘটেছে, যা শুধু মাত্র নারী হওয়ার কারণে বাবা-মা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ বছরে ৫ লাখ নারী ভ্রূণ হত্যা করা হয় দেশটিতে। এমনটা উঠে এসেছে সরকারি গণনায়।
১৯৯০ সাল থেকে এক কোটি ৫৮ লাখ কন্যা শিশুকে জরায়ুতেই হত্যা করা হয়েছে বলে জানায় একটি গবেষণা। লিঙ্গ ভিত্তিক গর্ভপাত দেশটিতে বেআইনি হলেও তা মানা হচ্ছে না।
সম্প্রতি উত্তরাখন্ড রাজ্যের একটি খবর থেকে ভ্রূণ হত্যার ভয়াবহ চিত্র জানা যায়। প্রকাশ হওয়া তথ্যে বলা হয়, জুলাইয়ে উত্তরকাশির ১৩২টি গ্রামে কোনো মেয়ে শিশুর জন্ম হয়নি।
ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ড জানায়, একটি দেশে স্বাভাবিকভাবে পুরুষ ও নারীর অনুপাত হয়ে থাকে ১০২ থেকে ১০৬ এর বিপরীতে ১০০। অন্যদিকে ভারতে তা ১২০ এর বিপরীতে ১০০।
এ দিকে সম্প্রতি ‘কন্যা ভ্রূণ হত্যা’র জন্য কুখ্যাত হরিয়ানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাট্টার এক বক্তব্য বিতর্ক তৈরি করে। তার ওই বক্তব্যে নারী সংকটের প্রসঙ্গটি উঠে আসে। তিনি জানান, সংকটের কারণে বিহার নয়, এখন থেকে তাদের ছেলেদের জন্য কাশ্মীর থেকে মেয়ে নিয়ে আসা হবে।
২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রচারণার মাধ্যমে নারী ভ্রূণ হত্যায় নিরুৎসাহিত করেন। কিন্তু বিষয়টি বাস্তবে তেমন ফল দেয়নি।
