বিমান ও বেবিচকের ১৫০ কর্মকর্তা কর্মচারী সোনা পাচারে

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:৩৯ এএম

নানা উদ্যোগ নিয়েও সোনা পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না। পাচারকারীরা রাজধানী ঢাকাকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে ভারতসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তা পাচার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সোনা পাচারে জড়িত; জড়িত কেবিন ক্রুরাও। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার একাধিক শীর্ষ পাচারকারীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ইতোমধ্যে ওইসব পাচারকারীর তালিকা তৈরি করেছে বিভিন্ন সংস্থা। পুলিশ ও কাস্টমস কর্মকর্তারা নিশ্চিত, একেকজন পাচারকারী বছরে ২০ থেকে ২২ বার বিশে^র বিভিন্ন দেশ সফর করে সোনার চালান নিয়ে আসছে।

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চোরাকারবারি বলেন আর সোনা পাচারকারী বলেন কাউকে আমরা ছাড় দিচ্ছি না। কঠোরভাবে তাদের দমন করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কাস্টমসসহ বিভিন্ন সংস্থা সোনা পাচারকারীদের ধরছে এবং তথ্য উদঘাটন করা হচ্ছে। দেশের সব বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি কয়েক ধাপ বাড়ানো হয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোনা চোরাকারবারিদের ধরতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের তালিকা করা হয়েছে। আটক শীর্ষ কারবারিদের জবানবন্দিতে অনেক কিছুই

 

 

পাওয়া গেছে, যা চমকে ওঠার মতো। তিনি আরও বলেন, অর্থের বিনিময়ে ভাড়ায় খাটাচ্ছে তালিকাভুক্ত কারবারিরা। বেশকিছু মাফিয়া দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, সোনা পাচারে বিমান ও বেবিচকের অন্তত ১৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরাও তাদের সঙ্গে যুক্ত। তারা সবাই নজরদারিতে রয়েছেন। তথ্য-প্রমাণ মিললেই তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। তারা জানান, পাচারকারীরা ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেই ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। তাছাড়া চটগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়েও তারা সোনার চালান পাচার করছে। এসব বিমানবন্দরে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। আবার তাদের সঙ্গে ‘দহরম-মহরম’ সম্পর্ক আছে জুয়েলারি ব্যবসায় সম্পৃক্তদের। ‘প্রভাবশালী রাজনীতিকদের’ সঙ্গেও সখ্য রয়েছে চোরাকারবারিদের।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল, শাহআমানত ও ওসমানী বিমানবন্দরে নানা অপরাধ কর্মকা- চলে আসছে। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের কৌশল নিয়েও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ওইসব বিমানবন্দরে অপরাধ কর্মকা-ের মধ্যে অন্যতম সোনা পাচার। সম্প্রতি শাহজালালে সোনা পাচার বেড়েছে। প্রায়ই প্রতিদিনই ধরা পড়ছে চালান। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এ নিয়ে বিশেষভাবে তদন্ত করেছে। তারা নিশ্চিত, বিদেশি এজেন্টদের পাশাপাশি দেশি এজেন্টরা বেশি লাভের আশায় ‘বেপরোয়াভাবে’ সোনা চোরাচালানে জড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা বাংলাদেশিদের সঙ্গে আঁতাত করে পাচার করছে সোনা। কোন কোন দেশের মাফিয়ারা বাংলাদেশে সক্রিয় তাদের তালিকা করা হয়েছে।

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেবিন ক্রুদের নজরদারিতে আনার চেষ্টা চলছে। ইউএস বাংলার কেবিন ক্রু রোকেয়া শেখ মৌসুমী দীর্ঘদিন ধরেই সোনা পাচার করেন। রিমান্ডে তার কাছ থেকে বেশ তথ্য পাওয়া গেছে। তথ্যগুলো আমরা যাচাই করছি। তিনি বলেন, সৌদি এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রু ফারজানা আফরোজ ও সায়মা আক্তারও একই কারবার চালাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, বিদেশ থেকে আসার পর কেবিন ক্রুদের লাগেজ বা শরীর তল্লাশি করা হতো না এটা সত্য। তবে এখন সবকিছু করা হচ্ছে।

র‌্যাব ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভারত, সিঙ্গাপুর, হংকং, মালয়েশিয়া ও দুবাইয়ের একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বাংলাদেশে। তাদের সঙ্গে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগাযোগ আছে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার একাধিক শীর্ষ পাচারকারীর জবানবন্দিতে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ওইসব পাচারকারীর অন্যতম মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ‘তিন প্রভাবশালী নেতার’ যোগাযোগ রয়েছে।

জবানবন্দিতে মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, ১২ বছর ধরে সোনা পাচার করছেন। এ কারবার করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করতে হয়েছে। গুলশান ও বায়তুল মোকাররম এলাকার অন্তত ১৭ ব্যবসায়ী তাকে সহায়তা করেছেন। তারা তার নিয়মিত ক্রেতা। হংকং, ভারত ও দুবাইয়ের ‘প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা’ তাকে ‘সোনা আলী’ হিসেবেই চেনেন। ভারতীয় নাগরিক রাজিব শুভ্র,পাপ্পু সাজ্জেল ও লাবু তার অন্যতম ‘পার্টনার’। মোহাম্মদ আলী ভারতে সোনার চালান পাচার করেছেন নিয়মিত। তাছাড়া বিমান কর্মকর্তা কামরুল হাসান বিপুর সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক। আটক আরেক সোনা কারবারি ও ভারতীয় নাগরিক জামিল আহমেদ জবানবন্দিতে বলেছেন, সোনা পাচারের আগে তিনি মোবাইল ব্যবসা করতেন। মোহাম্মদ আলীর মাধ্যমে তিনি সোনা পাচারে জড়ান। দুবাই থেকে তিনি সোনার চালান এনে বাংলাদেশের এজেন্টদের কাছে বিক্রি করতেন। জানা গেছে, জামিন নিয়ে জামিল আহমেদ দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন। আরেক পাচারকারী হোসেন আসকরও দীর্ঘদিন ধরে সোনা পাচার করছেন। তার আছে অন্তত এক ডজন সহযোগী। মাঝে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে গেছেন তিনি। বিমান কর্মকর্তা আবু জাফর ও কামরুল হাসান বিপু ২০০৩ সাল থেকেই এ কারবারে জড়িত বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তথ্য পেয়েছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সায়েদাবাদের মোহাম্মদ ওয়ায়েদুজ্জামান, মুন্সীগঞ্জের ফারুক আহম্মেদ, চীনা নাগরিক ফান রাংগুই, আমিনুল হক ভূঁইয়া, ভারতীয় নাগরিক গৌরাঙ্গ রোসান, জসিমউদ্দিন, মিলন শিকদার, বিমান কর্মচারী মাসুদ আহমেদ, আনিসউদ্দিন, রনি হোসেন, ইমরান রহমান, বিল্লাল হোসেন, দিনাজপুরের সোহেল রানা, নরসিংদীর মনির আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের ওয়ায়েদউল্লাহ, মিরপুরের সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের মঞ্জুর হোসেন, পল্লবীর সামসুল হুদা, মুন্সীগঞ্জের ইসলাম শেখ, রাজবাড়ীর মোহাম্মদ হানিফ, মুন্সীগঞ্জের মোহাম্মদ রুবেল, ভারতের রূপসাহা, গোপাল বিজন, বিজন হালদার, লক্ষ্মণ সেন, গোবিন্দ বাবু, লালু জয়দেব, গওহর প্রসাদ, সঞ্জিব, রামপ্রসাদ, মিন্টু, সুমন চ্যাটার্জি, রিয়াজ, তপন সাহা, ডালিম, মোনায়েম, ফারুক, বসাক চ্যাটার্জি ও স্বপন সাহা ‘সিন্ডিকেট’ সোনা পাচারে জড়িত। তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।11

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত