ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অবাধে চলাচল করছে সিএনজিচালিত শত শত থ্রি-হুইলার অটোরিকশা ও মাহেন্দ্র। ধীরগতির এসব যানবাহনের কারণে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই পুলিশের চোখের সামনে এসব ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল করলেও এর বিরুদ্ধে দৃশ্যত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী মিলে কয়েকটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অবৈধ এসব যান থেকে দিনপ্রতি ৩২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে। এই চাঁদার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জিপি’। পরিবহন শ্রমিকরাই করেছেন এমন নামকরণ। নগরীর চারটি পয়েন্টে এ চাঁদা আদায় করা হয়। আর চাঁদার এই ভাগ পুলিশ প্রশাসনসহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে ভাগাভাগি হচ্ছে বলে নগরীতে জনশ্রুতি রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৫ সালের আগস্টে দেশের ২২টি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বা ধীরগতির যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। কিন্তু এই নির্দেশনা অমান্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে গোপন সমঝোতা করে ‘জিপি’ নামক বখরার মাধ্যমে স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকরা ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে নির্বিঘেœ চলতে দিচ্ছে ব্যাটারি-সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহেন্দ্রসহ তিন চাকার বিভিন্ন যান। অবশ্য এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কোনো গণমাধ্যমকর্মী ফোন করলে তখন সরব হয়ে ওঠে পুলিশ। এরপর দুএকদিন বন্ধ থাকে অবৈধ এসব যান চলাচল। কিন্তু কয়েক দিন পার না হতেই দেখা যায় সেই আগের চিত্র।
গত কয়েক দিন ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের বাইপাস মোড়, সূচনা পয়েন্ট, চরপাড়া মোড়, মাসকান্দা ও চুরখাইসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। এ সময় দেখা যায়, কোনোরকম অভিযান না থাকায় মহাসড়ক দাপিয়ে চলছে তিন চাকার সব অবৈধ যান। নগরীর চরপাড়া মোড়ের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের ঠিক সামনেই গড়ে উঠেছে তিন চাকার ব্যাটারি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহেন্দ্র স্ট্যান্ড। বিপজ্জনক এসব যান চরপাড়া মোড় থেকে জেলার ত্রিশাল উপজেলা, সদর উপজেলার চুরখাই, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছুটে চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় পুলিশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহেন্দ্রর চালকদের কাছ থেকে সরাসরি ‘বখরা’ নিলেও বর্তমানে সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। পুলিশ এখন কোনোরকম মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করছে। এমনকি কোনো চালকও অভিযোগ করছেন না যে পুলিশ তাদের কাছ থেকে কোনো প্রকার টাকা আদায় করছে। চালকরা বলছেন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের নাম করে পরিবহন শ্রমিকরাই তাদের কাছ থেকে ‘জিপি’ হিসেবে চাঁদা তুলছে। তবে কখনো শ্রমিক কল্যাণে এ টাকা ব্যয় হয় না।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহেন্দ্রর একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরীর চরপাড়া মোড়ে প্রতিটি সিএনজি ও মাহেন্দ্র চালকের কাছ থেকে ১৪০ টাকা করে চাঁদা তোলেন শাওন নামে এক ব্যক্তি। তিনি ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার ছত্রছায়ায় এ টাকা তোলেন বলে চালকদের অভিযোগ। ঢাকা বাইপাস এলাকায় ৫০ টাকা করে ‘জিপি’ তোলে রাজীব, ফজলু ও রুবেল নামে তিনজনের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট। জনশ্রুতি রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের একটি সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতার পকেটে যায় এই টাকা। এ ছাড়া মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলার বৈলর ও ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যথাক্রমে ৩০ ও ১৪০ টাকা করে ‘জিপি’ তুলছেন।
নগরীর ঢাকা বাইপাস এলাকায় যাত্রীর জন্য হাঁক দিচ্ছিলেন মাহেন্দ্র চালক নাছির মিয়া (৪০)। তিনি চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চার পয়েন্টে পরিবহন শ্রমিকদের লোকজনকে প্রতিদিন ৩২০ টাকা করে জিপি না দিলে গাড়ি চলাচল বন্ধ। তাই রুটিরুজির জন্যই আমাদেরকে এ পরিমাণ অর্থ চাঁদা দিতে হয়।’
সদর উপজেলার দিগারকান্দার বাসিন্দা অটোরিকশা চালক মো. আলম (৩৮) বলেন, ‘পরিবহন শ্রমিকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, টাকা ছাড়া কোনো থ্রি-হুইলার এ মহাসড়কে চলবে না। তারাই এ টাকা থেকে পুলিশকে ম্যানেজ করে।’ চালকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রতিদিন চারশর বেশি সিএনজি ও মাহেন্দ্র চলাচল করে। এজন্য এসব যানবাহনের প্রতিটির জন্য দিতে হয় ৩২০ টাকার জিপি। এ হিসাবে প্রতিদিন চাঁদা তোলা হচ্ছে ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা। যার পরিমাণ যথাক্রমে মাসে ৩৮ লাখ ৪০ হাজার এবং বছরে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা।
চাঁদার বিনিময়ে নিষিদ্ধ যান চলাচলের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির ট্রাক বিভাগের সম্পাদক রবিউল হোসেন শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, “গত চার বছরেও মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বন্ধের নির্দেশনাটির ‘কেতাবে আছে গোয়ালে নেই’ অবস্থা। এসব যানবাহনের কারণে মহাসড়কে লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আমাদের জোর দাবি হচ্ছে, জিপির নাম করে বেপরোয়া চাঁদাবাজি বন্ধ করা।”
অন্যদিকে ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির মহাসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পাওয়ার পার্টির একশ্রেণির নেতাকর্মীরা তাদের লোক দিয়ে স্পটে স্পটে চাঁদা তুলছে। আসলে এদের বৈধ কোনো সংগঠন নেই। কিন্তু এ টাকার ভাগ সব জায়গায় যাচ্ছে। প্রশাসনের উচিত এদেরকে শনাক্ত করে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
চাঁদাবাজদের সঙ্গে পুলিশের গোপন আঁতাতের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নগর পুলিশের পরিদর্শক (ট্রাফিক) কাজী আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন বন্ধে পুলিশ নিয়মিতই তৎপরতা চালাচ্ছে। বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রতিনিয়তই সিএনজি ও মাহেন্দ্র আটক করা হচ্ছে। আর জিপির বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো চালক বা মালিক আমাদের কাছে অভিযোগ করলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
