গত ৩০ আগস্ট তেহরানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আহমেদ খাতেমি তার জ¦ালাময়ী ভাষণে বলেছেন, দেশটির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের শপথভঙ্গকারী সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা করবে না। তিনি বলেন, ‘চাপের মুখে সমঝোতা নামান্তরে আত্মসমর্পণই। ইরানি জাতি এরকম মর্যাদাহানির কাজকে কখনই সমর্থন করবে না।’ খাতেমির এ ভাষণে দেশটির প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে, যিনি বলেছেন যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র তার একতরফা অবরোধ প্রত্যাহার না করবে, ততক্ষণ কোনো আলোচনা হবে না। একই দৃষ্টিভঙ্গি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিরও। খাতেমি ও খামেনি, দুজনই কট্টরপন্থি নেতা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো যতক্ষণ না পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত Joint Comprehensive Plan of Action বা JCPOA-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করবে ততক্ষণ সমঝোতা ব্যর্থ হতে থাকবে। এ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইরানের মধ্যে এবং জাতিসংঘ দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট রুহানির অবশ্য এ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে খুব বেশি দ্বিমত নেই। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অবরোধের ব্যাপারে আলোচনার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রাখতে চান। অবশ্য খাতেমি ও খামেনির মতো রুহানিও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং মহাশক্তিধর দেশটির একতরফা চাপের বিরুদ্ধে ইরানকে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করতে হবে। এখানেই ইরানিরা একাট্টা, যা তাদের সামরিক আক্রমণের সম্ভাবনা সংবলিত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নত হতে দিচ্ছে না।
JCPOA করতে সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা ইরানের বিরুদ্ধে হাইব্রিড যুদ্ধের অবসান চায়। যেহেতু ইউরোপের এখন কোনো বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহকারী নেই, তাই তারা ইরানকে এ আসনে বসাতে চায়। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং লিবিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর যুদ্ধের ফলে ইউরোপ তার প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারীকে হারায়। এখন ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে যে, রাশিয়া অথবা লিবিয়া ইউরোপকে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করবে। এ ক্ষেত্রে ইরান ইউরোপে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাস সরবরাহ করতে পারে। এটাই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ২০১৫ সালের চুক্তি করতে তাড়িত করেছিল।
এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি তার মিত্র ইসরায়েল এবং সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে অথবা এককভাবে ইরাকের মতো অন্যায়ভাবে ইরানকে আক্রমণ করে বসে তবে তা ইউরোপের সরকারগুলোকে সমস্যায় ফেলবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈদেশিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক ফেডরিকা মোঘেরিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, যুদ্ধ কোনো সমাধান নয়। ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই মনে করেন, ইরান কখনই যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে না এবং নমনীয়তা প্রদর্শন করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের JCPOA থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর ইরান যে কৌশল নিয়েছে, তা ইউরোপিয়ানদের প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। ইরান বলল, যদি যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায় তাহলে ইরান ধীরে ধীরে এ চুক্তি থেকে সরে যাবে। তারা ঔঈচঙঅ-এর ২৬ ও ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে যেকোনো পক্ষের চুক্তির খেলাপকে অবহিত করার সুযোগকে ব্যবহার করছে। এটাই ইরানের বৈধ পদক্ষেপের নমুনা। এর ওপর ভিত্তি করে দেশটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধ করছে (যদিও তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার মানের চেয়ে অনেক কম)। তারা বলছে, ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারে তাহলে তারা চুক্তির ধারাগুলো লঙ্ঘন করতে শুরু করবে।
অন্যদিকে, যখন মার্কিন ড্রোন ইরানের ভূখ-ে প্রবেশ করে এবং জিব্রাল্টার প্রণালিতে যুক্তরাজ্য যখন ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার আটক করল তখন দেশটি তার সামর্থ্য প্রদর্শন করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনটিকে ভূপাতিত করেছে এবং যুক্তরাজ্যের ট্যাংকারকে আটক করেছিল। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কেউ যদি তাদের দেশকে আক্রমণ করতে চায় তাহলে তারা নিষ্ক্রিয় থাকবে না। ইরান সক্রিয়ভাবে ইউরোপকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে, যেন তারা ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধমান অবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়। গত আগস্টের শেষদিকে জি-৭ বৈঠকের পর তিনটি ইউরোপীয় শক্তি ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য অর্থাৎ ই-৩ ইরান বিষয়ে বৈঠক করে। ওই বৈঠকের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ফেডরিকা মোঘেরিনি জানান, এ তিনটি দেশ JCPOA চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চীন, রাশিয়া এবং ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। ইউরোপ চায় না ইরান চুক্তির কাঠামো থেকে বেরিয়ে যাক। ইরান অবশ্য চুক্তির ৩৭ ধারা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পরিপ্রেক্ষিতে বেরিয়ে যাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু ইউরোপ চাচ্ছে চুক্তিটি বজায় থাকুক, যতই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিক না কেন।
ইউরোপিয়ানরা আরও দেখছে, এশিয়ার দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ কিংবা অব্যাহত অবরোধে আগ্রহী নয়। এটা শুধু চীনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, যারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াও একই মনোভাব পোষণ করে। তারা যুদ্ধ বা অবরোধ চায় না। তাদের ইরানি জ্বালানির প্রতি আগ্রহ আছে। এখন অবশ্য এশিয়ার এ দেশগুলো যদি ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ¦ালানি চুক্তিতে যায়, তাহলে ইউরোপ দেশটির তেল থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে বঞ্চিত হতে পারে। তাই ফেডরিকা বলেছেন, ইউরোপের ওঘঝঞঊঢ (INSTEX (Instrument in Support of Trade Exchanges) খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে তৈরি হবে। জি-৭ সম্মেলনের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অবরোধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফকে ফ্রান্সে আমন্ত্রণ এবং গত আগস্টে প্রেসিডেন্ট রুহানির সঙ্গে তার টেলিফোন কথোপকথন ইঙ্গিত দেয় যে ইউরোপ দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়। তারা এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অবরোধকে পছন্দ করতে চাইছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বলেছে, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু ইরানিরা বলছে আলোচনা তখনই হবে যখন অবরোধ উঠে যাবে। ইরানের এ ধরনের কাঠিন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চমকে দিয়েছে। তারা ভেবেছিল ইরান চাপে পড়ে আবারও চুক্তির ব্যাপারে সমঝোতায় বসবে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, ইরান শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি মেনে চলবে না (পারমাণবিক বিস্তার রোধ চুক্তি)। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের মনোভাব আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ফলে দেশটি এ বিষয়ে এক ধরনের বিচ্ছিন্ন অবস্থায় চলে গিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র না মানবে যে ইরানের প্রয়োজনীয় ইউরোনিয়ামের স্তর সমৃদ্ধ করার অধিকার রয়েছে, ততক্ষণ এ উত্তেজনার সমাপ্তি নেই।
লেখক : সাংবাদিক
