সম্রাট-শামীম-খালেদকে সহযোগিতার অভিযোগ

৯ সেক্টরে চিহ্নিত সিন্ডিকেটের পাঁচ শতাধিক সদস্য

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২০ এএম

এবার ফেঁসে যেতে পারেন রেলপথ মন্ত্রণালয় ও ক্রীড়া পরিষদসহ ৯ সেক্টরের ঊর্ধ্বতনসহ অন্তত পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীমের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে তারা নানাভাবে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের প্রোফাইল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদকালে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও জি কে শামীম পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট সদস্যদের ব্যাপারে তথ্য দিয়েছেন। তাছাড়া গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাটও তাদের সম্পর্কে বলেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে

বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর বেশ কয়েকজন মাফিয়াকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের মধ্যে সম্রাট, খালেদ ও জি কে শামীম অন্যতম। তারা চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন। আর তাদের সহায়তা করেছেন বিভিন্ন সেক্টরের লোকজন। তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন খেয়ে তারা কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সম্রাট-শামীম-খালেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সদস্যদের একটি তালিকা করা হয়েছে। এতে প্রাথমিকভাবে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির নাম এসেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, তালিকায় যাদের নাম এসেছে তাদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তে প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত এক দশক ধরে সম্রাট, খালেদ ও শামীম চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো কারবার ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধ চালিয়ে আসছিলেন। আর তাদের সহায়তা করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগসহ সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের নেতা ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিরা। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারাও তাদের সহায়তা করেছেন। বিনিময়ে তারা পেয়েছেন মোটা অঙ্কের কমিশন। টেন্ডার বাণিজ্য করে নানা কায়দায় বিপুল পরিমাণ টাকা কামিয়েছেন সম্রাট, খালেদ ও শামীম।

খালেদ ও শামীমকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টেন্ডার জমা দিলেই সব সেক্টরের লোকজনকেই তাদের কমিশন দিতে হতো। অন্যথায় তাদের কাজ দেওয়া হতো না। যাদের বেশি কমিশন দেওয়া হতো তার মধ্যে রেলপথ ও গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ক্রীড়া পরিষদের কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা রয়েছেন। পাশাপাশি সম্রাটকেও কমিশন দিতে হতো তাদের। তাছাড়া টেন্ডার জমা দিলে সম্রাটও কমিশন দিতেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে শামীম গণপূর্ত অধিদপ্তরে একক আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। শামীম একসময় বিএনপির রাজনীতি করতেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভোল্ট পাল্টে রাতারাতি বনে যান যুবলীগ নেতা। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মন্ত্রী ছাড়াও পুলিশ ও প্রশাসনের বড়কর্তাদের সঙ্গে ছিল তার দহরম-মহরম। প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে ছিল তার সবচেয়ে ‘মধুরতম’ সম্পর্ক। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের পাশাপাশি বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে নিয়মিত টাকা দেওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দেওয়া শামীম। প্রতিটি টেন্ডার জমা দেওয়ার পর তাদের ১৫-২০ শতাংশ কমিশন দিতে হতো সংশ্লিষ্টদের। জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানিয়েছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে মাসে তাকে অন্তত ৫০ কোটি টাকা বিলিয়ে দিতে হতো। অধিদপ্তরের ৩০ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ২০ ঠিকাদারের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল। তাছাড়া সম্পর্ক ছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গেও।

তারা আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক এক মহাপরিচালকের আমলে গড়ে ওঠা সম্রাট ও খালেদের ‘জামাই সিন্ডিকেট’ এখনো সক্রিয়। তাদের মাধ্যমে তারা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি চালিয়ে আসছিলেন। রেলের বাসাবাড়ি, জায়গাজমি, টেন্ডার থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা হস্তক্ষেপ করতেন। রেলের মেগা প্রকল্পগুলোর কাজগুলো বাগিয়ে নিতেন খালেদ। বিনিময়ে কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের কমিশন দিতেন। সম্রাট ও খালেদ গ্রেপ্তারের পর এখন রেলওয়ের বিভিন্ন স্টেশন, অফিস, ওয়ার্কশপগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন তাদের সহযোগীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক র‌্যাবের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি দপ্তরগুলোতে কাজ পাওয়ার আগে সম্রাটকে কমিশন দিতেন জি কে শামীম। চাহিদা অনুযায়ী কমিশন না দিলে টেন্ডার দাখিল করতে পারতেন না তিনি। বছরখানেক আগে শামীম পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি ভবনের কাজ পেয়েছিলেন। তখন সম্রাট ২ কোটি টাকা কমিশন দাবি করছিলেন। কিন্তু রাজি না হওয়ায় ওই কাজটি নিতে পারেননি শামীম। বিষয়টি তিনি আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতাকে জানিয়ে সম্রাটকে শাসিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত