বুয়েটে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে সবাই

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১২:২৫ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বুয়েট ছাত্রলীগ নেতারা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার পর গত সোমবার থেকেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ দাবি জানিয়ে আসছেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে সব ধরনের সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। ইতিমধ্যেই তাদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়া বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন বুয়েট এলামনাই ছাত্র ও শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মচারী রাজনীতিও বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছে।

সর্বশেষ গতকাল বুধবার গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধে তার কোনো আপত্তি নেই বলে মত দেন। তিনি বলেন, বুয়েট যদি মনে করে, ছাত্ররাজনীতি ব্যান্ড করে দিতে পারে; এটা তাদের ব্যাপার। তবে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি বন্ধের বিপক্ষে মত দেন প্রধানমন্ত্রী।

এর ফলে বুয়েট ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনভিত্তিক ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী রাজনীতি বন্ধের আলোচনা এখন তুঙ্গে। তবে শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কি না, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্মত হলে তা সিন্ডিকেটে তুলবে। সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নেবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করবে কি না। আমাদের বুয়েটে সব নীতিগত সিদ্ধান্ত সিন্ডিকেটে হয়। তা ছাড়া অর্ডিনেন্সে কিছু ধারা আছে। সেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের কথা স্পষ্ট করা নেই। সংগঠনের কথা আছে। কীভাবে সংগঠন করা যাবে ও যাবে না, তা বলা আছে। সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাম্পাসে অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে অনেক সময় প্রশাসন অপরাধ বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে না। এমন নয় যে রাজনৈতিক দলগুলো কাউকে মারধর করতে বলেন, নির্যাতন করতে বলেন। কিন্তু সরাসরি রাজনীতির কারণে ক্যাম্পাসে পরিস্থিতি দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। নোংরা পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। এ কারণেই আমরাও বলছি, এমন রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।

ক্যাম্পাসে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্তের জন্য গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সাধারণ সভা করে শিক্ষক সমিতি। সভা থেকে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় ৩শ জনের মতো শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতির জন্য তারা নিজেরাও দায়ী বলে মন্তব্য করেন।

এ সময় সভাপতি বলেন, তিনশ শিক্ষকের সমন্বয়ে মিটিং হয়েছে। সে মিটিংয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আমরা লিখিত আকারে সুপারিশ করব। এছাড়া বুয়েটের স্বার্থে কোনো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পরোক্ষ রাজনীতিতে জড়িত হবে না বলেও বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় ভিসির পদত্যাগসহ আট দফা তুলে ধরেন তিনি। পাঁচ নম্বর দফায় ‘বুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরোক্ষ রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে’ বলে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় সমাবেশ ও পরে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করে বুয়েট এলামনাই। এ সময় সাবেক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলসমূহের অঙ্গসংগঠনভিত্তিক ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। এ দাবিসহ সাত দফা দাবি পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী।

এ সময় জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, আমরা একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। শুধু বুয়েট নয়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও একই। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। সন্ত্রাসবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের লড়তে হবে।

বুয়েটের এই সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, আগে ক্যাম্পাসে এমন অবস্থা ছিল না। আমাদের সময় র‌্যাগিং মানে আমরা গান করতাম। সহনশীলতা ছিল। এখন সেটা নেই। ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে।

এর আগে সকালে বুয়েট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে তিনজন এসব দাবি সাংবাদিকদের সামনে পড়ে শোনান। এর মধ্যে ছয় নম্বর দাবিতে বলা হয়, বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েট হলে হলে ত্রাসের রাজনীতি কায়েম করে রাখা হয়েছে। জুনিয়র মোস্ট ব্যাচকে সবসময় ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক জোর করে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেকোনো সময় যেকোনো হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের জোর প্রদর্শনপূর্বক হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের এমন কর্মকাণ্ডে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ। তাই আগামী সাত দিনের মধ্যে (১৫ অক্টোবর) বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।

তাদের একজন প্রতিনিধি বলেন, বেঁধে দেওয়া সময়ে দাবি পূরণ না করা হলে ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলেন বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান। সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনস্থলে গিয়ে অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে আমার মনে হয় না যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকার দরকার আছে। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।’

অবশ্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা না বলায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি উপাচার্যকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা বলতে পারি। এখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।’

প্রসঙ্গত, ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে রবিবার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতারা বেধড়ক পেটান তাকে। পরে তাকে সিঁড়িতে ফেলে রাখেন। সেখানেই মারা যান আবরার।

এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে তার বাবা চকবাজার থানায় সোমবার রাতে একটি হত্যা মামলা করেন। বুয়েট কর্র্তৃপক্ষ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় বুয়েট শাখার সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ১০ জনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।6

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত