দুই ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার মামলা এখন ‘অপমৃত্যু’

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১১:১০ পিএম

যশোর সরকারি এমএম কলেজের ছাত্রাবাসে ‘শিবির’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে দুই ছাত্র হত্যায় জড়িতরা চার বছরেও আটক হয়নি। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলার কোনো হদিস মিলছে না। তবে পুলিশের করা মামলায় চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেখানে নিহতদের ‘ছাত্রশিবির সমর্থক’ উল্লেখ করা হলেও হত্যাকারীদের কোনো পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।

মামলার আসামি ছাত্রলীগের ১২ নেতাকর্মী ঘুরে বেড়াচ্ছে দাপটের সঙ্গে। এভাবেই অপমৃত্যু ঘটেছে একটি চাঞ্চল্যকর জোড়া হত্যা মামলার।

হত্যাকাণ্ডের শিকার হাবিবুল্লাহ হুসাইন ও কামরুল হাসান ছিলেন যশোর সরকারি এমএম কলেজের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দুজনই এসএসসি ও এইচএসসিতে এ-প্লাস ও এ-গ্রেড পেয়ে অনার্সে ভর্তি হন। থাকতেন কলেজের পাশে একটি মেসে।

নিহত হাবিবুল্লাহ হুসাইনের বাবা লিয়াকত আলী গতকাল বৃহস্পতিবার দুঃখ প্রকাশ করে স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রথম দিকে বিচার আশা করেছিলাম। এখন আশা ছেড়ে দিয়েছি।’ পুলিশের মামলায় চ‚ড়ান্ত প্রতিবেদনের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ওই মামলার ব্যাপারে পুলিশ কিংবা কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, কথা বলেনি।’

নিহতদের স্বজন ও সহপাঠীরা জানান, হাবিবুল্লাহ ও কামরুল একই শ্রেণির ছাত্র ও পরস্পরের বন্ধু। শিবির সন্দেহে তাদের ধরে এনে এমএম কলেজে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত আসাদ হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিয়ে প্রকাশ্য দিনের বেলায় তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। পরে মৃতপ্রায় অবস্থায় তুলে দেওয়া হয় পুলিশের হাতে। পুলিশ তাদের যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে সন্ধ্যায় হাবিবুল্লাহ মারা যান। কামরুল মারা যান একই দিন ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে।

ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর। পুলিশ এ ঘটনায় মামলা নেয়নি। হত্যাকাণ্ডের ১৯ দিন পর আদালতে মামলা করেন কামরুলের বড় ভাই ইব্রাহিম হোসেন। এ মামলায় ১৩ জনের নাম-পরিচয় উল্লেখ করে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে অন্যতম আসামিরা হচ্ছেন তৎকালীন যশোর শহর ছাত্রলীগের আহŸায়ক মেহেদী হাসান রনি, যুগ্ম আহŸায়ক ছানছাবিল আহমেদ জিসান, এমএম কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান, কর্মী নূর ইসলাম, জামাল হোসেন, ইয়াসিন মোহাম্মদ কাজল ও সজিবুর রহমান।

আদালত তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মামলাটি কোতোয়ালি থানায় প্রেরণ করে। বর্তমানে সেটি কোন পর্যায়ে আছে তা জানাতে পারেননি থানার ওসি। তবে ওই সময় এসআই সাহাবুল আলম বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। সেখানে নিহতদের শিবির সমর্থক উল্লেখ করা হলেও হামলাকারীদের কোনো পরিচয় দেওয়া হয়নি। তাদের ২০-২৫ জন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী উল্লেখ করা হয়েছে। এ মামলাটিও বেশিদূর এগোয়নি। ২০১৭ সালের ৬ জুন ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ঘটনার পর চার বছর হতে যাচ্ছে। কিন্তু আটক হয়নি কোনো আসামি। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, দুজনকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ আসামিই সরকারি এমএম কলেজের ছাত্র। তারা সেখানে ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে এবং প্রকাশ্যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অংশ নিয়েছে। ঘটনার সময় মামলার ২ নম্বর আসামি ছানছাবিল আহম্মেদ জিসান ছিল যশোর শহর ছাত্রলীগের যুগ্ম আহŸায়ক। এ ঘটনার পর তিনি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। অবশ্য ২০১৮ সালে যশোর শহরে চাঁদা না পেয়ে অন্য একটি হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত হয়ে দলের পদ হারান। 

অন্যরাও পেয়েছে বড় বড় পদ। হত্যা মামলার আসামিরা এভাবে দাপটের সঙ্গে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ালেও চার বছরেও তারা পুলিশের চোখে পড়েনি! এ সময় নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ পেয়ে আসামিরা আইনি প্রক্রিয়া থামিয়ে দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। হুমকি দেওয়া বাদীকে মামলা তুলে না নিলে একই পরিণতির শিকার হতে হবে। বাদী ইব্রাহিম হোসেন মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে ব্যবসা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু আর থাকতে পারেননি। জীবনের নিরাপত্তার অভাবে পরিবার-পরিজন রেখে আবার মালয়েশিয়া চলে গেছেন।

এ প্রসঙ্গে মামলার অন্যতম আইনজীবী রোকনুজ্জামান বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য, বিচার প্রক্রিয়া সুদূরপরাহত। চার বছরে একজন আসামিও আটক হয়নি। বিচারহীনতার এ সংস্কৃতির কারণেই খুনিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আবরার ফাহাদ হত্যার মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনার সময় আমি এ থানায় ছিলাম না। তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, এসআই সাহাবুল আলমের করা মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত