টুপটাপ শব্দে ঝরছে শিশির আর সকালে কুয়াশার চাদরে ঢাকা গ্রামীণ আবহ। সূর্যের আলোকচ্ছটায় মাকড়সার জালে জমাট বাঁধা মুক্ত দানা-স্নিগ্ধ সকালই জানান দিচ্ছে হেমন্ত কাল। এমন অপূর্ব দৃশ্য হিমালয়ের পাদদেশঘেঁষা উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ে।
সারা রাত টুপটাপ শব্দে ঝরছে শিশির বিন্দু। দূর্বাঘাসে ডগায় মুক্তোদানার মতো জ্বলজ্বল করছে জমাট বাঁধা শিশির। শিশির বিন্দু যেন প্রকৃতির জমিনে টিপ পরিয়ে দিয়েছে। ভোর থেকে সকালে কুয়াশার আবহের দখলে গ্রামাঞ্চলের পথঘাট। পাখির কলকাকলি আর সোনামাখা রোদ যেন বলে দিচ্ছে হেমন্তের বার্তা। হেমন্তের স্নিগ্ধ সকাল প্রকৃতিজুড়ে সৃষ্টি করেছে নতুন আবহ।
সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বকুল হোসেন বলেন, সকালে শিরশির বাতাস আর হালকা কুয়াশা জানান দেয় শীতের হাতছানি। আর সূর্য উঁকি মারলে ঘাসের ওপর জমানো শিশির মুক্তোদানার মতো জ¦লে ওঠে। এটা কী অপরূপ দৃশ্যÑ না দেখলে কেউ অনুভব করতে পারবে না। ছোট খোঁচাবাড়ি গ্রামের মনিরুল ইসলাম জানান, সকালে হালকা শীতের অনুভ‚তি পেলেও দুপুরে ভ্যাপসা গরম হাঁপিয়ে তোলে।
নারগুন কহরপাড়া গ্রামের শিউলী আকতার জানান, আর কদিন পর ধান কাটা শুরু হবে। নানা ধরনের পিঠা বানাব। হাসিনুর রহমান বলেন, এখন রাস্তার মোড়ের মোড়ে নানা ধরনের পিঠা পাওয়া যায়। তাই আর আগের মতো ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েসের উৎসব চোখে পড়ে না।
তবে কবি-সাহিত্যিকরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলার চিরচেনা অনেক ঋতুই তার চেহারা বদলেছে। বদলেছে ঋতু বদলের সময়-কালও। তার সঙ্গে হারিয়েছে বাংলার চিরচেনা অনেক পার্বণও। রচিতও হচ্ছে না রূপবৈচিত্র্যের হেমন্ত নিয়ে নতুন উপন্যাস, গল্প আর কবিতা।
কবি আশরাফ উল আলম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে হেমন্ত তার রূপবৈচিত্র্য দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তবে এখনো গুটিকয়েক কবিয়াল গান, ধামের গান, পালা গানের আসরের আয়োজন হয়। আগের মতো হয় না নবান্ন উৎসবও।
সাহিত্যিক প্রফেসর মনতোষ কুমার দে বলেন, জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত নিয়ে অনেক কবিতা, গল্প রচনা করেছেন। কিন্তু আগের তুলনায় এখন আর হেমন্ত নিয়ে নতুন কিছু উঠে আসছে না। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের অনুপস্থিতি পাওয়া যায়।
হেমন্তের হাত ধরেই আসে শীত। তাই শীতের আগমনী ধ্বনি কিছুটা শঙ্কায় ফেলেছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষকে। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও পথের মানুষরা বিপাকে পড়েন গরম কাপড়ের অভাবে। কষ্ট হয় তাদের। তাই তাদের আকুতি থাকে একটুকরো গরম কাপড়।
গড়েয়া গোপালপুরের মহীন্দ্র রায় বলেন, শীত এলে একটুকরো গরম কাপড়ের জন্য চেয়ে পার হয়। খড়কুটো জ্বলিয়ে তাপ দিতে হয় হিম শরীর। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নুর কুতুবুল আলম বলেন, শীতের আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের কোনো কমতি নেই।
এবার হেমন্তে অভাব আর হাহাকার নেই ঠাকুরগাঁওয়ে। ফসলে মাঠভরা ফলনও ভালো। তাই নবান্ন উৎসবের অপেক্ষায় দিন গুনছে উত্তরের গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা। এ অঞ্চলে নবান্ন উৎসবকে ঘিরে ফিরে পায় বাঙালিআনা। একে অপরের সেতুবন্ধন। তাই সব ঋতুতে আনন্দে উৎসবে মেতে উঠুক আমাদের শহর আর গ্রামাঞ্ব এমন প্রত্যাশা সবার।
