নারায়ণগঞ্জে বেশিরভাগ এলাকায় ওয়াসার পানিতে ময়লা ভাসে। দুর্গন্ধ বের হয়। পান দূরে থাক, গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে নগরবাসী চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। বিকল্প হিসেবে খাবার পানির জন্য তাদের স্থানীয় মসজিদের গভীর নলক‚পের (সাব-মার্সিবল পাম্প) ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। সেখানেও দীর্ঘলাইনে থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জে ওয়াসার সরবরাহ লাইনের পাইপ বহু পুরনো। পাইপের জং থেকে পানি লাল হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে দলা দলা ময়লা আসে। শীতলক্ষ্যার দূষিত পানি সঠিকভাবে পরিশোধন না করায় দুর্গন্ধ থেকে যাচ্ছে। বারবার লিখিত অভিযোগ জানানোর পরও ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অবশ্য সিটি করপোরেশন বলছে, নারায়ণগঞ্জ ওয়াসাকে তাদের অধীনে আনতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে নগরবাসীকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক আগে থেকেই ওয়াসার পানিতে সমস্যা। এখন আরও বেড়েছে। ময়লা ও দুর্গন্ধে পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানি দিয়ে গোসলে বাচ্চাদের চর্মরোগ হচ্ছে। বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন রোগব্যাধিতে। ফলে নগরবাসী খাবার পানির চাহিদা মেটাতে ওয়াসার পরিবর্তে নগরের মসজিদগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল-বিকেলে মানুষ লাইন ধরে অপেক্ষা করেন পানি নিতে।
সরেজমিনে নগরীর চাষাড়া, কালীবাজার, আমলাপাড়া, ডন চেম্বার, কলেজ রোড, গলাচিপা, দেওভোগ, থানা পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, সকাল ৮টা বাজতেই মসজিদে মসজিদে কলস, জগ, বালতি নিয়ে হাজির হচ্ছেন মানুষ। একটি মসজিদ থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার এক থেকে দেড়শো পরিবার খাবার পানি সংগ্রহ করছেন।
আমলাপাড়া বড় মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলওয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, মানুষ অসহায়। ওয়াসার পানি ব্যবহার করতে না পেরে মসজিদে আসে। তাদের জন্য এক দেড় ঘণ্টা মোটর চালিয়ে পানি দেওয়া হয়। মসজিদসংলগ্ন বাসিন্দা মো. মুকুল বলেন, ‘ওয়াসার পানি লাল। হাত দিলে রং হয়। দুর্গন্ধে খাওয়া যায় না। এজন্য এলাকাবাসী মসজিদ থেকে পানি সংগ্রহ করেন।’
শহরের গলাচিপা ডিএন রোডের অধিকাংশ মানুষ বায়তুল মাহফুজ জামে মসজিদ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করেন। এলাকার সেলিম মিয়া জানান, ওয়াসার পানির অবস্থা খুবই খারাপ। কাপড়চোপড় ধোয়া আর গোসল ছাড়া কিছুই করা যায় না। কষ্ট হলেও প্রতিদিন মসজিদ থেকে পানি সংগ্রহ করি। কলেজ রোডের আল্লামা ইকবাল জামে মসজিদে পানি নিতে আসা মনিরা বেগম জানান, তিনি টাকার বিনিময়ে পাঁচতলা একটি বাড়ির প্রত্যেক ফ্ল্যাটে ছয় লিটার করে পানি সরবরাহ করেন। দুবেলা গড়ে দিনে ১০০ লিটার পানি পৌঁছে দেন। দেওভোগের একতা সড়কের বাসিন্দারা তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কিত। সুফিয়া বেগম জানান, ওয়াসার পানিতে লাল লাল পোকা পাওয়া যায়। মুখে দেওয়া যায় না। গোসলের পর শরীর চুলকায়। বাধ্য হয়ে মানুষ মসজিদ থেকে পানি নেয়। রাসেল মিয়া জানান, পানি ফুটিয়েও খাওয়া যাচ্ছে না। রুচিতে বাধে। এজন্য নামাজ পড়ে বোতল ভরে পানি নেই।
১৩, ১৪ ও ১৫নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর শারমিন হাবিব বিন্নি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়াসার পানি এতটাই খারাপ যে, নগরবাসী পান করতে পারছে না। তারা বিক্ষুব্ধ। বারবার লিখিত জানানো হলেও ওয়াসা ব্যবস্থা নেয় না। মানুষ বাধ্য হয়ে মসজিদগুলোতে ভিড় করছেন।’
এর আগে নগরবাসীর পানির সমস্যা সমাধানে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছিলেন, নভেম্বরের মধ্যে ওয়াসাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে নেওয়া হবে। এরপর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লাইন সংস্কার ও পরিশোধনে ব্যবস্থা নেওয়া হলে এক-দুই বছরের মধ্যেই বিশুদ্ধ পানি দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এ পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী এহতেশামুল হক দেশ রূপান্তরকে জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও আমাদের সঙ্গে একমত। আশা করছি দ্রæত এ প্রক্রিয়া শেষ হবে।
নগরবাসীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নারায়ণগঞ্জ ওয়াসা মডস জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হাসেম তার কার্যালয়ে টেবিলে রাখা বোতলজাত পানি দেখিয়ে বলেন, ‘আমিও তো ওয়াসার পানি খাচ্ছি। এতে তো কোনো ময়লা দেখছি না, গন্ধও পাচ্ছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘নগরবাসী কেন মসজিদ থেকে পানি আনেন, আমার জানা নেই। তবে লাইনের পানি কেন তারা খেতে পারছেন না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।’
