রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গৃহকর্মী জান্নাতি (১২) হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গৃহকর্ত্রী রুকসানা পারভীন। গতকাল শুক্রবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি শিশুটিকে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানার ওসি গণেশ গোপাল বিশ্বাস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরে আদালতের নির্দেশে আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি আরও বলেন, গৃহকর্ত্রী রুকসানা জবানবন্দিতে একাই শিশুটিকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। রুকসানা পারভীনকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘শিশুটি ঠিকমতো কাজ করত না, কথা শুনত না। সব সময় পালিয়ে পালিয়ে থাকত। ঘটনার দিন ২৩ অক্টোবরও সে পালিয়েছিল। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর দুপুর আড়াইটার দিকে ছাদে গিয়ে দেখি, সে লুকিয়ে আছে। তাকে দেখেই মাথা গরম হয়ে যায়। ধরে এনে প্রথমে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় দিই। ছোটাছুটির চেষ্টা করলে চুলের মুঠি ধরে তার মাথা ফ্লোরে কয়েকবার আঘাত করি। তারপর বাথরুমে আটকে রেখে বাসার বাইরে চলে যাই। রাতে এসে দেখি তার নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
ওসি গণেশ বলেন, শিগগিরই এ মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে। আশা করছি বিচারিক প্রক্রিয়ায় তার সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হবে।
মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল আলীম জানান, মামলার অপর আসামি রুকসানা পারভীনের স্বামী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহম্মেদ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত মঙ্গলবার রাতে জান্নাতিকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, সে আগেই মারা গেছে। জান্নাতি স্যার সৈয়দ রোডের একটি ছয়তলা ভবনের একতলায় কাজ করত। ওই ফ্ল্যাটটি পিরোজপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাঈদ আহম্মেদের। বাড়িতে থাকতেন তার স্ত্রী রোকসানা পারভীন, সপ্তম শ্রেণি পড়–য়া ছেলে ও বোন। ঘটনার সময় সাঈদ আহম্মেদ বাসায় ছিলেন।
এর আগে ২৪ অক্টোবর জান্নাতির বাবা মো. জানু মোল্লা মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। এজাহারে গৃহকর্ত্রী রুকসানা পারভীন, তার স্বামী সাঈদ আহম্মেদসহ অজ্ঞাত একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ঘটনার পরপরই মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ রুকসানা পারভীনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য রাজি হলে গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারকের খাস কামরায় নিয়ে যান।
শিশুটির বাবা জানু মোল্লা এজাহারে উল্লেখ করেন, তার মেয়ে জান্নাতি প্রায় চার বছর ধরে রুকসানা ও সাঈদ দম্পতির বাসয় থাকত। সাঈদ আহম্মেদের চাকরিস্থল ছিল বগুড়া। সেখানে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে জান্নাতির পরিবারের পরিচয় হয়। সেই সূত্র ধরে জান্নাতিকে এই দম্পতির বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ মোহাম্মদপুরের ৬/৫ স্যার সৈয়দ রোডের দ্বিতীয় তলার এ/ ১ নম্বর ফ্ল্যাটে কাজ করছিল জান্নাতি। মেয়ের অসুস্থতার খবর দিয়ে রুকসানা তাকে ফোন করেন। পরে গত বুধবার রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে গিয়ে তিনি মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন। আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান শরীরের বিভিন্ন জায়গায়। এরপর তিনি মামলা করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, তাদের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী থানার তেলিহাটা ফকিরপাড়া গ্রামে। প্রায় চার বছর ধরে জামালপুরের বকশীগঞ্জের সরকারপাড়া আইরমারী গ্রামের রুকসানা পারভীনের বাসায় তার মেয়ে জান্নাতি কাজ করে আসছিল।
গত ২৩ অক্টোবর সকাল অনুমান ৬টার দিকে রুকসানা পারভীন মোবাইল ফোনে জানায়, আমার মেয়ে জান্নাতি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাকে দেখার জন্য ঢাকায় আসতে বললে আমি দ্রুত রওনা দেই। বগুড়া থেকে রওনা হয়ে দুপুর ১২টার দিকে আমি সিরাজগঞ্জ পৌঁছালে রুকসানা পারভীন আবার মোবাইলে জানান, আমার মেয়ে মারা গেছে।
তখন আমি আবার বাড়িতে ফিরে যাই। আমার শ্যালক মনিরুল ইসলাম, ফুপাতো শ্যালক আরিফুল ইসলাম, চাচা শ্বশুর সবুজ মোল্লাসহ পিকআপযোগে রাত অনুমান তিনটার দিকে (২৪ অক্টোবর/বৃহস্পতিবার) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে গিয়ে জান্নাতির মৃতদেহ শনাক্ত করি।
আমার মেয়ের কপালের মাঝখানে, মাথায়, নাকের ওপর, গলার ডানপাশে, দুই হাতের বাহুতে, উভয় ঊরুতে, তলপেটে আঘাতের চিহ্ন ও ক্ষত দেখতে পাই। তিনি আরও জানান, রুকসানা পারভীন ও তার স্বামী মো. সাঈদ আহম্মেদ আমার মেয়েকে তাদের বাসায় মাঝেমধ্যেই মারধর করত।
এরই ধারাবাহিকতায় ২২ অক্টোবর বিকেল অনুমান ৩টার দিকে আসামিরা আমার মেয়ে জান্নাতিকে মারপিট করে হত্যা করে এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য রাত অনুমান ১১টার দিকে আমার মেয়ের মৃতদেহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যায়। তথায় কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার মেয়েকে মৃত ঘোষণা করেন।
