সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্থলে পরাশক্তি হিসেবে আসন গেড়ে নিয়েছে রাশিয়া। এর মাধ্যমে ইউরোপের আরও ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে উঠলেন ভ্লাদিমির পুতিন। অথচ ২০১৪ সালে ফিরলে দেখা যায় ইউক্রেনের অস্থিতিশীলতা ও ক্রিমিয়া দখলের কারণে দেশটি এক ধরনের ব্রাত্য হয়ে যায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
কেউ কেউ বলছেন, সিরিয়াকে হাতে তুলে দিয়ে ও ইউক্রেনের প্রতি আগ্রহ হ্রাস করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আবার বিশ্ব মঞ্চে তুলে আনলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক সংস্থা চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া অ্যান্ড ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের প্রধান জেমস নিক্সির মতে, সিরিয়া থেকে ট্রাম্পের সরে যাওয়ায় ‘বিশ্ব মঞ্চে রাশিয়াকে বড় শক্তি হিসেবে দেখাচ্ছে’। রাশিয়াকে নিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হওয়ায় তারা পুতিনের গলায় লাগাম পরাতেও পারছে না। এ ছাড়া ৫৪টি আফ্রিকান দেশের সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি তার উচ্চাভিলাষকে তুলে ধরে।
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় তুরস্কের সঙ্গে যৌথ টহলের চুক্তি করে রাশিয়া। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন পুতিন। বর্তমানে তুর্কি সশস্ত্রবাহিনী ও বাসার আল-আসাদের সরকারের মধ্যে সেতু হচ্ছেন পুতিন, ফলত আঞ্চলিক নিরাপত্তার একজন জামিনদার বনে গেছেন তিনি।
রিসেপ তায়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্ব নতুন একটি মিত্রতার সম্পর্ক দিয়েছে পুতিনকে। রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড ও ইউরোপীয় অঞ্চলের মধ্যে একটি কার্যকরী বাফার হিসেবে কাজ করছে। এশিয়া ও ইউরোপের পা রেখে দাঁড়ানো একমাত্র দেশ তুরস্ক, দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ইউরোপের মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্কের সঙ্গে পুতিনের সম্পর্ক গভীর।
সিএনএনে বুধবার নিক পাটন লেখেন, রাশিয়ার সাবেক সোভিয়েত সাম্রাজ্যকে বাধা দেওয়ার জন্য ন্যাটো গঠন হয়েছিল। আর এখন রাশিয়ার সেনা-পুলিশ ন্যাটোর দক্ষিণ সীমান্তের শত কিলোমিটারের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তা ঘটেছে ন্যাটোর এক সদস্যের আমন্ত্রণেই। যা ‘ভ্লাদিমির পুতিন শুধু স্বপ্নেই দেখতেন’।
চলতি সপ্তাহেই প্রথমবারের মতো রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলন করেছেন পুতিন। এর মাধ্যমে খুবই দ্রুত নিজের অর্থনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে এই অঞ্চলকে নিয়ে আসছেন। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিতে এই মহাদেশে এক সময় রাশিয়ার প্রভাব স্তিমিত হয়। জেমস নিক্সি জানান, মাদাগাস্কারের হিরা নিষ্কাশন ও অস্ত্র বিক্রি, নাইজেরিয়া ও লিবিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি দিয়ে এই অঞ্চলের বড় শক্তি হিসেবে হাজির হচ্ছে রাশিয়া।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা দেশে সাহসী কিছু ঘটনা ঘটিয়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আগস্টে বার্লিনে দিনের আলোয় সাবেক চেচেন বিদ্রোহীকে হত্যা ও গত বছর সাবেক গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপলকে ইংল্যান্ডে নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগ করে হত্যাচেষ্টা। ক্রেমলিন এই সব হামলার নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও নিজেদের চিহ্ন মুছে দেয়নি পুরোপুরি। বলা বাহুল্য এটা ইচ্ছাকৃতই।
২০১৪ সালের ক্রিমিয়া দখলের জের ধরে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে যায় রাশিয়া। ওই সময় ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উসকে দেয় দেশটি। পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায় যখন বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস ফ্লাইট এমএইচ সেভেন্টিন ভূপতিত করে, যাকে বলা হয় নাইন-ইলেভেনের পর আরেকটি বড় বিপর্যয়। ওই বছর জি-এইট থেকে বহিষ্কার করা হলে বিশ্ব মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউনিয়নের নেতৃত্বে ধারাবাহিকভাবে অবরোধ আরোপ করা হয়। রাশিয়ার অর্থনীতি এর কারণে ভুগলেও অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলানো থেকে সংযত হয়নি কখনো।
এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নিজেদের বৃহৎ শক্তি হিসেবে রাশিয়ার চেষ্টাকে ট্রাম্প সঠিক মনে করছেন। নিক্সির মতে, সিরিয়ায় কী ঘটবে সেটা নিয়ে মনোযোগ নেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের। এটা তার দেশের স্বার্থের সঙ্গে কতটা জড়িত সে দিকেই শুধু মনোযোগ। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ জ্বালানি চুক্তি, অস্ত্র সহায়তার মতো বিষয়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক উচ্চাভিলাষকে এগিয়ে নেবে। আর এই কারণে উত্তর-পূর্ব সিরিয়া থেকে সেনা প্রত্যাহারকে রাশিয়ার এক সাংবাদিক পুতিনের জন্য ‘অপ্রত্যাশিত লটারি জেতা’ বলে বর্ণনা করেন। আরেক সাংবাদিক কৌতুকের ছলে লেখেন, ‘ট্রাম্প কি সত্যিই রাশিয়ান এজেন্ট?’ আর বলেন, ট্রাম্প রাশিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি তৈরিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সিরিয়ায় অ্যান্টি-আইএসআইএস কোয়ালিশনের এক পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তার মতে, ‘পুতিন নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।’
ইউক্রেন সম্পর্কিত ২০১৪ সালের জটিলতা এখন অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পকে দেশটির সঙ্গে অন্য ধরনের ভূমিকায় দেখা গেছে। যা রাশিয়াকেই সাহায্য করছে। চলতি বছরের জি-সেভেন সম্মেলনে সংস্থাটিতে রাশিয়ার ফেরত আসা নিয়ে জোর তৎপরতা চালান ট্রাম্প। এই প্রসঙ্গে এক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বলেন, ‘ট্রাম্পকে পুতিনের হাতের পুতুল মনে হচ্ছে।’
এদিকে অনেক দিন ধরে রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে মনে করলেও ২৮ সদস্যের ইইউ দেশটিকে লাগাম পরাতে ব্যর্থ। তারা কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে পারছেন না। এমন চেষ্টা চালিয়েও সম্প্রতি ব্যর্থ হয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। এই প্রসঙ্গে চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ নিক্সি জানান, দুই কারণে ইউরোপীয় নেতারা রাশিয়াকে থামাতে পারছে না। প্রথমত, কোনো যৌথ সিদ্ধান্তে তারা একমত হতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত, সবাই একই ধরনের হুমকি মনে করছে না।
তবে এটা ঠিক যে চলমান অবরোধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি এখনো সমস্যায় রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে গ্রীষ্মে বিক্ষোভের মুখে পড়ে মস্কো। এত সব জটিলতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক অতীতের চেয়ে নিজেদের শক্তিশালী প্রেসিডেন্টের হাত ধরে রাশিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে আরও বেশি প্রভাব ফেলছে।
বিজনেস ইনসাইডারে প্রকাশিত আলেকজান্দ্রা মা’র নিবন্ধ অবলম্বনে
