ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত ১৬ আসামির একজন হলেন তার সহপাঠী কামরুন নাহার মণি। কারাগারেই তার কোলে ভূমিষ্ঠ হয় কন্যাসন্তান মুবাশশিরা খানম। নিজের সদ্যোজাত সন্তান কোলে নিয়েই ফেনীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফাঁসির রায় শোনে কামরুন নাহার মণি। নুসরাতের সহপাঠী ও বান্ধবী ছিলেন মণি।
এদিকে, কামরুননাহার মণির স্বামী রাসেদ খান রাজু অভিযোগ করেছেন, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় অন্য এক মণি ছিলেন। যিনি নুসরাতের বিরুদ্ধে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। পিবিআই সেই মণিকে গ্রেপ্তার করেও টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাজু।
গত ২৪ অক্টোবর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায় ঘোষণার আগে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানকে কোলে নিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ান মা কামরুন নাহার মণি। ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ সব আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন। কাঠগড়ায় মায়ের কোলে তখন কান্না করছিল নবজাতক কন্যা শিশুটি আর মা তাকে আঁকড়ে ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলেন। রায়ের পর মায়ের সঙ্গে কারাগারে অবস্থানরত সদ্যোজাত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কাঠগড়ায় ওঠার আগে মণি তার সন্তানকে কোলে করে নিয়ে যান আদালত প্রাঙ্গণে। সে সময় শিশুটির শরীরে একটি তোয়ালে প্যাঁচানো অবস্থায় দেখা যায়। গত ২০ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে রাত সাড়ে ১২টায় মণির কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে। সাধারণ শিশুর মতো জন্ম হলেও রাখী পায়নি পিতা, দাদা-দাদি, নানা-নানির আদর। পাননি পৃথিবীর মুক্ত আলো বাতাস। জেলেই মায়ের সঙ্গে দিনাতিপাত করছেন শিশু কন্যা রাখী।
ফেনী জেলা কারাগারের জেলার দিদারুল আলম জানান, সাধারণ কয়েদির সঙ্গে থাকলেও প্রয়োজনে জেল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে চিকিৎসা সেবাসহ সার্বিক সহযোগিতা করেন।
ফেনী জেলা কারাগারে সিনিয়র জেল সুপার রফিকুল কাদের বলেন, ফেনী জেলা কারাগারে থাকা নুসরাত হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কুমিল্লা কারাগারে স্থান ফাঁকা থাকলে সেখানে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে ফাঁকা না থাকলে কাশিমপুরসহ যেসব কেন্দ্রীয় কারাগারে কনডেম সেল ফাঁকা রয়েছে, সেখানে আসামিদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কামরুন নাহার মণিকেও তার সন্তান নিয়ে যেতে হবে।
তবে এ মামলার আসামি পক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন নান্নু বলেন, যত দিন পর্যন্ত শিশুটি নিজ হাতে খেতে না পারবে তত দিন মণির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে না। আমরা অতি দ্রুত হাইকোর্টে আপিল কবর।
কামরুন নাহার মণির স্বামী রাসেদ খান রাজু বলেন, গত ৯ সেপ্টেম্বর ৩৪২ ধারায় আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়ার সময় কামরুন নাহার মণি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। পিবিআই হেফাজতে তাকে চরম নির্যাতন ও পেটে লাথি মেরে বাচ্চা নষ্ট করার হুমকি দিয়ে জবানবন্দি আদায়ের করে। সে জানায়, যে মণি হুজুরের মুক্তির জন্য জন্য মিছিল মিটিং মানববন্ধন করেছে তাকে গ্রেপ্তার করেও ছেড়ে দেয় পিবিআই।
মামলার বিচারকাজ শুরু হলে অন্তঃসত্ত্বা মণিকে প্রতি কার্যদিবসে আদালতে হাজির করা হয়। তার আইনজীবী কয়েকবার জামিন চাইলেও আদালত নামঞ্জুর করেন। অন্তঃসত্ত্বা থাকার কারণে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারকাজে অংশ নেয়ার আবেদন জানালে আদালত সেটা মামলার শেষের দিকে মঞ্জুর করেন।
রায়ের পর মণির স্বামী রাশেদ খান রাজু তার ফেসবুক আইডিতে শনিবার রাতে আবেগঘন একটি পোস্ট করেন, যা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-
আমার আমানত, আমার কলিজার টুকরা মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়ে পিবিআইর বানানো মিথ্যা জবানবন্দি দিয়ে আজ ফাঁসির আসামী তুমি। তোমার কাছে আমার আমানত এতোই বড় ছিলো যে যাকে তুচ্ছ করে তুমি সত্যের সাথে থাকতে পারোনি। যেদিন রিমান্ডে তোমার পেটে আমার বাচ্ছাটাকে ড্রিল মেশিন দিয়ে ফুটো করে দিবে বলেছিলো সেদিন নিশ্চয়াই ভেবেছো তোমার জীবনের চেয়েও তোমার বাচ্ছার জীবন অনেক মূল্যবান।
হ্যাঁ মা হিসেবে তোমার দায়িত্ব বোধকে আমি সম্মান করি শ্রদ্ধা করি, পৃথিবীর সকল মাই জীবন দিয়ে হলেও তাদের সন্তান রক্ষা করার চেষ্টা করে। কিন্তু যে মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে তুমি মিথ্যা জবানবন্দি দিয়ে আসামী হয়েছো আজ সেই মেয়ে কোলে নিয়েই তোমাকে ফাসির রায় শুনতে হলো। তোমার মেয়ের কথা কি আজ এই দেশ চিন্তা করেছে?
তোমাকে যে পরিমান নির্যাতন করে, পিটিয়ে, পেটে তারের আঘাত করে, হাতের পায়ের তালুতে পিটিয়ে, জামা কাপড় খুলে ফেলার চেষ্টা করে ও সর্বশেষ বাচ্ছা নষ্ট করার ভয় দেখিয়ে আসামী করলো তা কি এই দেশের কেউ জানে? তোমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ার পরেও যে তোমাকে ফাঁসি দেওয়া হলো তা কি এই দেশের কেউ জানে? এই সন্তান কে নিয়ে যে এদেশের মানুষ ট্রল করে, সন্তানের বাবা ও পিতৃ পরিচয় নিয়ে ট্রল করে না জেনে তাকি জানো? তুমি যে ঘটনার পরে ৩টা সহ মোট ৬ টা পরিক্ষা দিয়েছো আর ঘটনার দিনের পরিক্ষা সহ সবগুলাতেই এ প্লাস পেয়েছো সেই খবর কেউ রেখেছে? তুমি খুন করে কিভাবে স্বাভাবিক ছিলা বা ঘটনার দিন ও তার পরের ৩টা পরিক্ষা সহ মোট ৬ টাতেই এ প্লাস পেতে পারো সেটা কি কেউ চিন্তা করেছে? কেউ কি জানে যে অন্য আরো একটি মনি ছিলো যে কিনা সিরাজের পক্ষ নিয়ে নুসরাতের বিরুদ্ধে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলো। তাকে যে পিবিআই গ্রেপ্তার করে টাকা নিয়ে ছেড়ে দিছে তা কি দেশের কেউ জানে?
অবশেষে বলবো আমার কলিজার সন্তান একদিন এই দেশে মাথা উচু করে দাড়াবে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ তাকেই করতে হবে।তোমার মৃত মুক্তিযোদ্ধা বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো জিজ্ঞেস করতে দেশ কি এই জন্য স্বাধীন করেছিলো কিনা যেখানে তোমরাই আজ পরাধীন। আজ জাতীর কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম এই মা মেয়ে যদি নির্দোষ হয় আপনাদের কি আল্লাহ এর আদালতে জবাবদিহি করতে হবেনা?
আবারও বলছি, বুক ফুলিয়ে বলছি মনি ১০০ ভাগ নির্দোষ ।আমি আমার ভালোবাসাকে অন্যায়ের কাছে হেরে যেতে দিবোনা। লড়বো এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই আমি লড়বো ইনশাআল্লাহ। মুবাশশিরা খানম ‘রাখী’ এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে দেশের ইতিহাসে। দেশের আর কোন নারী যেন এমন বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতার শিকার না হয় সেটাই কামনা করি।
স্ট্যাটাসের সত্যতা নিশ্চিত করে রাজু বলেন, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পূর্বের রাতে ডায়রিয়া ও পেট ব্যথার কারণে সকালে মণিকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করানোর পর পরীক্ষা কেন্দ্রে দিয়ে এসেছিলাম। পরে পিবিআই সদস্যরা তাকে গ্রেপ্তার করে ড্রিল মেশিন দিয়ে পেটের সন্তান নষ্ট করার হুমকি দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেন। আমার বিশ্বাস মণি এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে না। আশা করছি হাইকোর্টে আপিল করে ন্যায় বিচার পাব।
(ফেসবুক পোস্টের বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)
