শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার ২৮ বছরে মাত্র দুটি সমাবর্তন হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এর নেপথ্যে ক্যাম্পাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন শিক্ষকরা। জানা গেছে, দীর্ঘ ১২ বছর পর তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বছরের ৮ জানুয়ারি। উদ্ভাবন, শিক্ষা ও গবেষণায় ক্রমবর্ধমান সাফল্য থাকলেও সমাবর্তন আয়োজনের দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে খ্যাতনামা এ প্রতিষ্ঠান। ১৯৯১ সালে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ জটের কারণে তৃতীয় সমাবর্তন আয়োজনেও হিমশিম খাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯৮ সালের ২৯ এপ্রিল বিশবিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন আয়োজন করেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এম হাবিবুর রহমান। প্রথম সমাবর্তনে গ্র্যাজুয়েটদের হাতে সনদ তুলে দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। এর ঠিক নয় বছর পর ২০০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সমাবর্তন আয়োজন করেন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম। দ্বিতীয় সমাবর্তনে সনদ প্রদান করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ। এরপর থেকে গত ১২ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সমাবর্তন হয়নি। এসময় দুজন উপাচার্য মেয়াদ পূর্ণ করে অবসরে গেলেও সমাবর্তনের স্বপ্নে দিনের পর দিন পার করেছেন গ্র্যাজুয়েটরা। এদিকে ১৯৯১-৯২ থেকে ২০০০-০১ সেশন পর্যন্ত মোট ১০ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মাত্র দুটি সমাবর্তন পেয়েছেন। এরপর ২০০১-০২ থেকে ২০১৪-১৫ সেশন পর্যন্ত মোট ১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এখনো সমাবর্তন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণের পর সমাবর্তন আয়োজনের উদ্যোগ নিলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেননি। ১৪ ব্যাচের প্রায় ২৫ হাজার সমাবর্তনপ্রত্যাশী গ্র্যাজুয়েটকে একসঙ্গে সমাবর্তন দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের গ্র্যাজুয়েটদের সমাবর্তন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের গ্র্যাজুয়েটরা সমাবর্তন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দেন তারা।
১২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও কেন নিয়মিত সমাবর্তন আয়োজন সম্ভব হলো না এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনে। সিনিয়র শিক্ষকরা জানান, গত ১২ বছর সরকার স্থিতিশীল থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করেছে। আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন, সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ক্যাম্পাস ও সিলেট নগরীতে বিশৃঙ্খলা, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলন, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের গ্রুপিং, কোন্দলসহ নানা ইস্যুতে ক্যাম্পাস ছিল উত্তাল। এসব ঘটনাপ্রবাহের কারণেই মূলত সমাবর্তন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে শাবিপ্রবির সাবেক শিক্ষার্থীরা জানান, দায়িত্ব পালন করা উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবেই মূলত সমাবর্তন আয়োজনে দীর্ঘসূত্রতা। লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও নিয়মিতভাবে সমাবর্তন আয়োজন করছে। শিক্ষাজীবন শেষে প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েটের স্বপ্ন থাকে গাউন-হ্যাট পরিহিত অবস্থায় আচার্যের হাত থেকে মূল সনদ গ্রহণ করার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতির কারণে সমাবর্তন আয়োজনে এই দীর্ঘসূত্রতা।’
উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সমাবর্তন আয়োজনের জন্য চেষ্টা করেছি। যার ফলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ইতিমধ্যে তৃতীয় সমাবর্তনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। এখন থেকে প্রতি বছরই সমাবর্তন আয়োজন করা হবে। কোনো ধরনের সেশনজটও থাকবে না।’
