মেহের আফরোজ শাওন। একাধারে অভিনেত্রী, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, পরিচালক ও প্রকৌশলী। অভিনয় দিয়ে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিলেও এখন অভিনয় থেকে দূরে। কী নিয়ে ব্যস্ত তিনি? ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? এসব নিয়েই তার সঙ্গে কথা বলেছেন শাকিল মাহমুদ
অভিনয়, পরিচালনা সব কাজ থেকে দূরে কেন?
অনেকেই জানেন আমি বুয়েটে পড়াশোনা করেছি। তাই স্থাপত্যবিদ্যাকেও কাজে লাগানো দরকার বলে মনে হয়েছে। এদিকে সময় দিচ্ছি। এছাড়া আমার বাবার অফিসের একটা অংশ আমাকে দেখতে হচ্ছে। একজন সিঙ্গেল প্যারেন্ট হিসেবে সাংসারিক অনেক বিষয় থাকে, যা পালন করতে হয় আমাকে। এতকিছু সামলাতে গিয়ে সিনেমা বা নাটকে সময় দিতে পারছি না। যখন যে কাজটা করেছি তা পূর্ণ মনোযোগ দিয়েই করেছি। আর অভিনয় হলো সাধনার জায়গা। যেনতেনভাবে করলে হয় না। এজন্য অভিনয় আর অন্য কাজ একসঙ্গে করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। শুধু এ কারণেও নয়, অন্য কারও কারণ আছে। টিভি নাটক উঠে যাচ্ছে। সবাই ওয়েব সিরিজ করছে, যা আমি বানাব না। যে ধরনের ভাষা, কনটেন্ট ব্যবহৃত হয়, তা আমি হজম করতে পারি না। যে কাজটা ভালোবেসে করব, সেটা নিচে নামাতে পারব না বলেই আপাতত একটু দূরে আছি। নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছি।
বর্তমানের ব্যস্ততা কী নিয়ে?
ইদানীং স্থাপত্যবিষয়ক কাজেই ব্যস্ততা। মাঝে আমেরিকা থেকে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা করে এলাম। তাছাড়া সংগীত নিয়ে কিছু স্টেজ পারফরম্যান্স করছি। আমেরিকাতেও শো করে এসেছি। সামনেই ওমানে একটা শো করতে যাচ্ছি। তারপর কলকাতায় যাব। ডিসেম্বরে আগরতলায় একটা শো আছে।
জাহিদ হাসান, মাহফুজ আহমেদের সঙ্গে জুটি হয়ে কাজ করেছেন। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ থেকে নাকি চরিত্রের খাতিরে?
বিষয়টা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ থেকে নয়। গল্পের খাতিরে পরিচালক যার সঙ্গে অভিনয়ের জন্য পারফেক্ট মনে করেছেন তার সঙ্গেই কাজ করতে হয়েছে।
আপনার অভিনীত বেশিরভাগ নাটক-সিনেমা হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায়...
অন্য পরিচালকের সঙ্গেও কাজের আগ্রহ ছিল। কিন্তু এমন কোনো লোভনীয় চরিত্র বা গল্প পাইনি যার জন্য অন্য পরিচালকের নাটকে বা সিনেমায় কাজ করব। তবে শুরুর দিকে বেশ কিছু কাজ হুমায়ূন আহমেদের বাইরে করেছিলাম।
সেসব দিনের কোনো শ্যুটিংয়ের স্মৃতি শেয়ার করবেন কী?
একটা দৃশ্যে আমি গায়ক মতির জন্য চা বানাচ্ছি মাটির চুলায়। আমি এর আগে কখনো মাটির চুলা ব্যবহার করিনি। তাছাড়া এটা নিয়ে রিহার্সেলও করা হয়নি। চুলায় আগুন জ্বলছে, মা আনোয়ারা এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার জন্য চা বানাস?’ এমন সময় দাউদাউ করে আগুনটা ছড়িয়ে গেল। হুমায়ূন আহমেদ তখনো কাট বলছে না। আমি একবার চমকে পেছনে সরে এলাম। কিন্তু যখনই মাথায় এলো কাট তো বলা হয়নি, তখন নিজেকে সামলে নিয়ে আবার চায়ের দিকে মনোযোগ দিলাম। আমাদের ক্যামেরাম্যান ছিলেন মাহফুজুর রহমান খান। তিনি হুমায়ূন আহমেদের দিকে তাকালেন। হুমায়ূন আহমেদ ইশারায় তাকে ক্যামেরা চালু রাখতে বললেন। হুমায়ূন আহমেদ দেখলেন আগুন লাগলে আমি ও আশপাশের মানুষগুলোর রিঅ্যাকশন কেমন। একজন লেখক হিসেবে তার এই অবজার্ভ করার বিষয়টি আমার কাছে এখনো ইন্টারেস্টিং লাগে।
পরিচালনার জন্য প্রথম সিনেমা হিসেবে ‘কৃষ্ণপক্ষ’কে বেছে নিলেন কেন?
‘কৃষ্ণপক্ষ’ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিল না। আমি চেয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদ ‘কৃষ্ণপক্ষ’ বানাবেন। আমি অরু চরিত্রে আর মুহিব চরিত্রে মাহফুজ ভাই অভিনয় করবেন। হুমায়ূন আহমেদকে বিষয়টা অনেকবার বলাও হয়েছিল। কিন্তু কোনো কারণে করা হয়নি। আমি মূলত ‘গৌরীপুর জংশন’ নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। স্ক্রিপ্ট করা, অনুদানের জন্য আবেদন করা, লোকেশন দেখা সব হয়ে গিয়েছিল। তখনই হঠাৎ চ্যানেল আই থেকে জানানো হলো, তারা হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলক্ষে তাকে নিবেদন করে একটি সিনেমা বানাতে চায়। সেটা ‘কৃষ্ণপক্ষ’। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে যেকোনো কাজে আমার আগ্রহ বেশি। তাই রাজি হয়ে যাই। অনাকাক্সিক্ষতভাবেই ‘কৃষ্ণপক্ষ’ আমার পরিচালিত প্রথম সিনেমা হয়ে গেছে।
‘দেবী’ সিনেমা নিয়ে আপনার মতামত কী?
উপন্যাস আর সিনেমা দুটির মধ্যে একটা গ্যাপ রয়েছে। সেটা হলো হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে ভূতের বিষয়টা ছিল না। কিন্তু ভূত না রেখে ভৌতিক করে তোলাটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সিনেমায় ভূতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বেশি। এক্ষেত্রে উপন্যাসের মতো হুবহু যে সিনেমা হবে তাও কিন্তু নয়। তবে হুমায়ূন আহমেদের অনেক ভক্তের কাছে একটা মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ওভার অল ‘দেবী’ এ সময়ের একটি ভালো সিনেমা।
প্রযোজনায় আসবেন কি?
হ্যাঁ। তবে নতুন যারা কাজ করতে চায় তাদের নিয়েই আগ্রহ বেশি। যাদের ক্রিয়েটিভিটি রয়েছে, আগ্রহ আর ভালোবাসা রয়েছে কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না, তাদের পথটা একটু মসৃণ করে দিতে প্রযোজনা করব।
