যেমন উপলক্ষ তেমন কেক

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৫৪ এএম

ছোটবেলার জন্মদিন মানেই সাদা চারকোনা বা গোলাকার একটি কেক। আর এর ওপর অন্য রঙে হ্যাপি বার্থডে লেখা। স্বাদ বলতে ময়দা, ডিম আর বেকিং পাউডারের সাধারণ স্বাদ। কিন্তু এখন কেক কলতে শুধু জন্মদিনে নয়, দোকানর উদ্বোধন থেকে বন্ধুদের গেট-টুগেদার_ সবকিছুতেই কেকের উপস্থিতি। আবার যেনতেন কেক নয়। হতে হবে বিষয়ভিত্তিক আর যার যেমন স্বাদ পছন্দ সেটাই থাকছে কেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাই কেকেও জুড়ে যায় কাস্টমাইজড শব্দটাও। এই কাস্টমাইজড কেক শুধু একটি কেক নয়, যেন একটি পুরো গল্প।

কখনো কেকের মধ্যে ফুটে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি, কখনো-বা হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই, আবার কখনো কেক হয়ে ওঠে শিউলিতলা, কেকের ওপর সাজে পুরো একটা সমুদ্র, কেক হয়ে ওঠে প্রিয়জনকে লেখা কোনো চিঠি। সারা দেশেই এই কাস্টমাইজড কেক নিয়ে কাজ করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। পছন্দসই কিছু থিম বেইজড কেক দোকানে পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ কেক যারা তৈরি করেন, তাদের কাজ পুরোটাই অনলাইননির্ভর।

সুগারক্যাসেল

ট্র্যাডিশনাল কেকের ধারা বদলে ভিন্নধারায় কেক তৈরিতে ছয় বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিলেন ‘সুগারক্যাসেল’-এর প্রতিষ্ঠাতা শাওন। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। দেশে শুরুর দিকে যে সময় থেকে কাস্টমাইজড কেক নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, সেই শুরুর তালিকায় প্রথম দিকেই চলে আসে সুগারক্যাসেলের নাম।

সুগারক্যাসেলের শুরুর গল্পটা একটু অন্য রকম। বেকিং ভালো লাগা থেকেই তার শুরু। প্রতিষ্ঠাতা শাওন জানালেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বেকিংয়ের প্রতি আমার অন্য রকম একটা ভালো লাগা ছিল। নিজের পছন্দমতো খাবারও বানাতাম। এর পাশাপাশি আগ্রহ ছিল বই পড়ার। দেশি-বিদেশি নানা ধরনের রান্নার বই পড়েছি আমি। পরে যখন বেকিংটাকে প্যাশন হিসেবে নিতে চাইলাম, তখন বানাতে গিয়ে দেখলাম আমাদের এখানে কেক বানানোর প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো ঠিকঠাক পাওয়া যায় না। তখন দেশের বাইরে থাকা বন্ধু-বান্ধবদের দিয়ে কেক বানানোর সরঞ্জাম আনানো শুরু করলাম। সেগুলো দিয়ে কেক বানাতাম শুধু নিজেদের জন্যই। তা থেকে বন্ধুদের মধ্যে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অল্পবিস্তর পরিচিতি। এরপর থেকে পথচলা শুরু সুগারক্যাসেলের।’

যেকোনো কাজই শুরু করতে হলে একটা অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয়। সুগারক্যাসেলের সেই অনুপ্রেরণার পেছনে কে ছিলেন জানতে চাইলে শাওন জানান, ‘অনুপ্রেরণা বলতে আমার নিজের স্বপ্ন ছিল বেকিং নিয়ে কিছু করার। আর গতানুগতিক দোকানের কেকগুলো আমার খুব একটা ভালো লাগত না। সব সময় একই ধরনের টেস্ট। ভ্যানিলা, স্ট্রবেরি, চকলেট_ এগুলোর মধ্যেই স্বাদ ঘুরেফিরে থাকতো। তখনই ভাবতাম কেকের স্বাদের এই ধারাটা বদলাতে হবে। শুরু করি নিজের বেকিং। পরিবার, বন্ধু সবাই সব সময় সহায়তা করেছে আমার কাজে। শুধু তাই নয়, আমার কেকের ডিজাইনে কোথায় কোন রং বসবে সেটির সিদ্ধান্তও আমার মেয়ে নেয়।’

সুগারক্যাসলের এখন পর্যন্ত নিজস্ব কোনো দোকান বা কারখানা নেই। আলাদা একটি কিচেনে সব কাজ শাওন নিজ হাতেই করেন। কেকের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বাদের মাফিন, কাপ কেক, চিজ কেক, তিরামিসু_ সবই বানাচ্ছেন।

সুগারক্যাসেলের শুরুর কাজ ছিল দেশি মোটিফে করা। তখনই তিনি শিউলি ফুল দিয়ে একটা কেক বানিয়েছিলেন। তখনই অনুভব করলেন নিজস্ব টুলসের। সেগুলো সব দেশে পাওয়া যেত না বলে নিজেই বানিয়ে নেন প্রয়োজনীয় টুলস।

এখন কাজে অনেক অগ্রগতি এসেছে। গ্রাহকের কাছ থেকেও বেশ ভালো সাড়া পেয়েছেন। চেনা গ্রাহকরা তো নিয়মিত তার কাছ থেকে কেক নেনই, অপরিচিতরাও তাকে খুঁজে নেন। সুগারক্যাসেলের অধিকাংশ কাজ অনলাইনে করা হলেও নারী উদ্যোক্তাদের মেলায় তিনি দারুণ সাড়া পান। মেলায় শুধু কেক দেখে ভালো লাগেনি দর্শকদের খাওয়ার পর পুরো কেক বিক্রি হয়ে গেছে এবং পরে নতুন ক্রেতা তৈরি হয়েছে, এমন অনেক গল্প রয়েছে সুগারক্যাসেলের ঝুড়িতে।

কাস্টমাইজড কেকটাই তৈরি করা হয় বেশি। প্রিয় মানুষের জন্য অনেকেই বানিয়ে নিতে চান কেক। তাদের চাওয়ামতো আর নিজের প্যাশন_ দুই মিলিয়ে যখন কেকটা গ্রাহকের হাতে পৌঁছায় আর তাদের কাছ থেকে বেশ ভালো রিভিউ আসে, তখনই পুরো কষ্টটা সার্থক হয় বলে জানান শাওন।

যেহেতু আমাদের দেশে বেকিং ততটা পরিচিত ছিল না, আগে তাই শুরুর সময়টুকু কতটা কঠিন ছিল, সে বিষয়ে জানতে চাইলে শাওন বলেন, ‘আমি প্রফেশনালি কাজ শুরু করার পরও অনেক দিন খুব আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগেছি। মনে হতো আমার কাজ অতটা ভালো নয় হয়তো। আমাদের দেশে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় মেয়েদের যতটা সমালোচনা এবং অন্যান্য বাধার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়, তাতে নিজের কাজের ব্যাপারে ফুল কনফিডেন্ট হওয়াটা বেশ কঠিন। তখন সামান্য কোনো ভুল হলেই একদম ভেঙে পড়তাম। হতাশ হয়ে পিছিয়ে যেতাম, বিজনেস বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভেবেছি বহুবার। এ রকম একটা নাজুক সময়ে ‘মেয়ে’ গ্রুপের রাঙতা মেলায় অংশ নিলাম ভয়ে ভয়ে। মনে হয়েছিল কিছুই বিক্রি হবে না, কেউ পছন্দ করবে না। যেখানে দোকানে গেলেই কেক কিনতে পাওয়া যায়, সেখানে ঘরে বানানো কেক মানুষ কেন কিনবে! কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে এক অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলাম সবার থেকে। নতুন, অনভিজ্ঞ একজন বেকারের নিজের পায়ের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর জন্য সেটা খুবই দরকার ছিল। এরপরও মেয়ে নেটওয়ার্কের চেনা-অচেনা সদস্যরা বিভিন্ন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের দেওয়া সাহস, ভালোবাসা, উৎসাহ না পেলে সুগারক্যাসেলের এত দূর আসাই হতো না। বর্তমানে ঘরে বসে শুধু বেকিংয়ের কাজ করছেন এমন অনেক নারীই আছেন। তাদের জন্য শাওনের পরামর্শ হচ্ছে বেকিংয়ের ব্যাপারে প্রচুর পড়াশোনা করা। তিনি নিজে যখন শুরু করেছেন তখন প্রতিটি কাজের আগে তিনি নিয়মিত হোমওয়ার্ক করেছেন। ডিজাইন থেকে শুরু করে স্বাদ সব বিষয়েই আগে থেকে পড়াশোনা করে সব গুছিয়ে নেন তিনি। এতে করে কাজ করার সময় এলোমেলো অবস্থা তৈরি হয় না। সুগারক্যাসেলের এখনো হোম ডেলিভারি সার্ভিসের কোনো ব্যবস্থা নেই। ক্রেতারা অনলাইনে অর্ডার দিয়ে নিজেই এসে নিয়ে যান।

ডক্টর’স কিচেন

চিকিৎসা পেশায় হাসপাতালে ছোটাছুটি করে একদম সময় পাওয়া যায় না। সারা দিন এমনকি রাতেও এই পেশায় যখন-তখন ছুটে যেতে হয় হাসপাতালে। তবু চিকিৎসা পেশায় সব ব্যস্ততাকে ছাপিয়ে বেকিংটাকেই ভালো লাগার জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ‘ডক্টর’স কিচেন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সামছুত্তাব্রীজ বর্ণা।

কাজের শুরুটা হয়েছিল খুব ছোট করে। শুরুর দিকে কেক যে কাস্টমাইজড করে বানানো যায়, সেটা কাউকে ভালোভাবে বুঝিয়ে উঠতে পারেননি বর্ণা। তাই সবার মধ্যে পরিচিতি পেতে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন খেজুরের পিঠা দিয়ে। খেজুরের পিঠার চাহিদা অনেক ছিল। গ্রাহক সেই পিঠা খেয়ে বেশ খুশি হতেন। প্রথম কাস্টমাইজড কেক বানিয়েছিলেন বান্ধবীর জন্য। সেই একটি কেকই বদলে দিয়েছিল বর্ণার কাজের ধারা। আত্মবিশ্বাসের শুরু সেই থেকেই। পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প সময়েই পরিচিতি লাভ করেন বর্ণা। বন্ধু-বান্ধবসহ পেজের মাধ্যমেও অনেক অর্ডার পান তিনি।

বেকিং নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন বর্ণা। এক দিন তার ডক্টর’স কিচেন অনেক বড় হবে। গ্রাহক সরাসরি অফিসে এসে কাস্টমাইজড কেকের থিম পছন্দ করবেন_ এমনটাই চাওয়া তার। এখন তিনি পুরো কাজটাই করছেন অনলাইনকে ঘিরে। আর্জেন্ট কোনো কেকের অর্ডার নেন না বর্ণা। অন্তত তিন দিন আগে তাকে জানিয়ে রাখতে হয়। ডক্টর’স কিচেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় কেক ময়েস্ট চকলেট কেক। গ্রাহকরা এটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন থিমেও কাস্টমাইজড কাজ করেন তিনি।

পুনিজ কিচেন

একটা শখ, একটা ভালো লাগা থেকে যখন পেশা নির্ধারণ হয়ে যায়, তখন তার প্রতি ভালোবাসা একটু বেশিই থাকে। শুরুতে তিন বন্ধু মিলে শুরু করলেও বর্তমানে দায়িত্বে থাকা দুই কর্ণধার আনিকা আলম এবং মোস্তফা রুমিকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে পুনিজ কিচেন। পুনিজ কিচেনের যাত্রা শুরু হয়েছিল হুট করে এক শীতের সন্ধ্যায়। তখনই তারা বেকিং শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল না, তা আজ অকপটেই স্বীকার করেন তারা।

ব্যবসায়িকভাবে শখকে উপস্থাপন করলেও তারা এখনো নিজেদের শিক্ষানবিশ হিসেবেই ভাবেন। বেকিং নিয়ে ডেকোরেশন এখনো তারা শিখছেন। ২০১৩ সালের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল পুনিজ কিচেন।

দেশে অনলাইননির্ভর কাস্টমাইজড কেক তৈরিতে কারও নাম বললে শুরুতেই চলে আসে পুনিজ কিচেনের নাম। বর্তমানে তারা বেকিংয়ে আগ্রহী অন্যদের ও বেকিংয়ে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য বেকিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ ক্লাস এবং বার্ষিক বেকিং ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে থাকেন বিভিন্ন সময়।

পুনিজ কিচেনের দুই কর্ণধার আশা করেন এক দিন তারা আন্তর্জাতিক সুগার আর্ট স্ট্যান্ডার্ডে অংশগ্রহণ করবেন। এমনকি ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের সুগারক্র্যাফট স্কুল চালু করার স্বপ্নও আছে তাদের। অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয় এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি ঢাকায় পুনিজ কিচেনের একটি ক্যাফে চালু করার পরিকল্পনাও করছেন তারা।

আনিকা আলম পেশায় ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং স্বামী মোস্তফা রুমি ছিলেন দন্ত চিকিৎসক। কেক বানানোর কারিগর হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর দুজনেই তাদের নির্দিষ্ট পেশা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি মনোযোগ দেন কেকের দিকেই।

কাস্টমাইজড কেকের যে কত ভিন্নতা আসতে পারে, সেটা পুনিজ কিচেনের কাজ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন। প্রিয় কোনো মানুষের জন্য একদম নির্দ্বিধায় সারপ্রাইজ হিসেবে নিয়ে নেওয়া যায় এই কেক। কীভাবে এত কেক বানানোর আইডিয়া ভাবনায় আসে, সে বিষয়ে আনিকা জানান, ছোটবেলা থেকে কেক আর সুগারক্র্যাফটের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা কাজ করত তার। টুকটাক নিজের পরিবারের জন্য বানানো শুরু করলেও এখন এটাই পেশা হয়ে গেছে। কেকের ডিজাইনের বেশির ভাগই শেখা হয় বই পড়ে আর ইউটিউব ঘেঁটে।

‘পুনিজ কিচেন’-এর ফেইসবুক পেজে দেখা মিলবে নানা রকম কাস্টমাইজড কেকের। সেখানে আছে বেশ কিছু কার্টুন চরিত্র, লাল টুকটুকে শাড়ি পরা বউ, ঝুড়ি ভরা শিউলি, বেশ কিছু বই, হবু জামাইয়ের পাগড়িসহ পাঞ্জাবি, ডাক্তারি সরঞ্জাম, পুরো রান্নাঘরের সেট কিংবা গাড়ি। আছে আরও অনেক ডিজাইনের কেক।

এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজারেরও বেশি কেকের নকশা করেছে পুনিজ কেক। তাদের কাছে অর্ডার দিতে হলে সাত দিন আগে জানাতে হবে। নকশাভেদে কেজিপ্রতি কেকের দাম হয় ২ হাজার ২০০ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। পুনিজ কিচেনের মূল কার্যক্রম অনলাইনে হলেও তাদের অফিস আছে। গ্রাহক চাইলে সরাসরি সেখানে গিয়েও নকশা বুঝে অর্ডার দিয়ে আসতে পারেন।

গ্রাহকদের পছন্দের তালিকায় এখন কাস্টমাইজড কেক বেশ শক্ত একটা অবস্থান করে নিয়েছে। অনলাইনেই এই কেকগুলো বেশি বানানো হলেও বর্তমানে পিছিয়ে নেই রাজধানীর বেকারি শপগুলো। মিস্টার বেকার, কুপার’স, ওয়েল ফুড, সুইস বেকারিসহ বেশ কিছু বড় বেকারি শপগুলোতে এখন নিয়মিত কাস্টমাইজড অর্ডার নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের অর্ডার  দিতে হবে দুদিন আগে। পায় ৫০ ধরনের কেকের ফ্লেভার পাবেন। কেজিপ্রতি ১৫০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত