পেঁয়াজ ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলে সরকারি প্রণোদনা

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৩ পিএম

বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ। যাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ দেশের কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টার শেষ নেই। যার বদৌলতে দেশ এখন অনেকাংশেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তবে মানুষের নিত্যপণ্যের মাঝেমধ্যেই কোনো কোনো পণ্যের সংকট দেখা যায়। তখন সংকটের সে পণ্য আমদানি করে দেশীয় চাহিদা পূরণ করতে হয়। অনেক সময় আমদানি করলেও ভোক্তার কষ্টের শেষ থাকে না। ভোক্তাদের অনেক বাড়তি দামে যে পণ্য কিনে খেতে হয়।

যেমন সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ পেঁয়াজের দর বেড়ে যায়। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পেঁয়াজে ভোক্তার চাহিদা পূরণ না হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়। হঠাৎ ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে পেঁয়াজের কেজি একশ টাকার ঘর অতিক্রম করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের আগে আমাদের জানালে অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ পেতাম। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত পেঁয়াজ রপ্তানির আদেশ দেয়নি। এটাই বাস্তবতা, কেউ তো আর নিজের ক্ষতি করে অন্যের উপকার করবে না। হয়তো ভারতে পেঁয়াজ রপ্তানি করার মতো মজুদ নেই। ফলে আশ্বাস দিয়েও প্রতিশ্রতি রক্ষা করতে পারছে না।               

ইতিমধ্যে পেঁয়াজের বাজার দেড়শ টাকার ঘর অতিক্রম করেছে, যা সাধ্যের অনেক বাইরে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর অনুরোধে ব্যবসায়ীরা মিসর ও তুরস্ক থেকে ৩০ টন করে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছে। হয়তো আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। অবশ্য এ ধরনের উদ্বেগ আগে থেকে নিলে হয়তো পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের বাজারদর সহনীয় পর্যায়ে রাখা অনেকাংশেই সম্ভব হতো। বাস্তবে আমদানি করে নিত্যপণ্যের চাহিদা পূরণ করা অধিকাংশ সময়েই কঠিন হয়। কঠিন এই বাস্তব অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজসহ শীতকালীন নয়টি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে চাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। ঘোষণা মতে, নয়টি ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহ দিতে প্রায় সাত লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ৮০ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রণোদনা দেবে সরকার।

৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ বিঘা ফসলি জমিতে পেঁয়াজ, গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, শীতকালীন মুগ ও রবি মৌসুম-পরবর্তী খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মুগ ও তিল উৎপাদন বাড়াতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে দেশের ৬৪ জেলায় ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক

কৃষক এই প্রণোদনা পাবেন। প্রতিটি কৃষক পরিবারকে সর্বমোট এক বিঘা জমির জন্য বিনামূল্যে এক কেজি বীজ, ২০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে জনপ্রতি আর্থিক এই সহায়তার পরিমাণ হবে ১ হাজার ৭১৪ টাকা। এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ১ টাকা ৮৩ পয়সা আয় হবে বলে সরকার আশা করছে।

কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কৃষির সমৃদ্ধি ছাড়া আমরা সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারব না, যা চিরন্তন সত্য। অথচ কৃষি খাতে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ কম। আমরা মনে করি, শীতকালীন ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে যে পরিমাণ প্রণোদনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। এ উদ্যোগ যথার্থই। তবে এ উদ্বেগকে সফল করতে হলে মাত্র চার-সাত লাখ

কৃষক নয়, এ পরিমাণকে কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা উচিত। যদি শীতকালীন ফলন বৃদ্ধিতে সরকারের সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি করে শীতকালীন প্রতিটি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে সংকটে পড়ে ভোক্তাদের গলাকাটা যাবে না। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না। উৎপাদনের পর সংরক্ষণ করার ব্যবস্থাও করতে হবে। কারণ অনেক সময় ফসলের বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের কপাল পোড়ে। উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ফসল ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যায়। আজ যে পেঁয়াজ ১৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, এমন একসময় ছিল যখন উপযুক্ত মূল্যের অভাবে পেঁয়াজচাষিদের লোকসান গুনতে হয়েছে।

অথচ সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার সরকারিভাবে পুরো দেশেই স্থাপন করা সম্ভব হলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর বাড়তি পরিমাণ শীতকালীন সবজি হিমাগারে সংরক্ষণ করতে পারলে, তা দিয়ে সারা বছরের ভোক্তার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল। এখন দেশে ফসল উৎপাদনে চাষিরা যেভাবে শ্রম দিচ্ছেন, ফলে কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য এসেছে সত্য। কিন্তু শুধু সংরক্ষণের অভাবেই চাষিদের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। ফলে ভাগ্যের ওপর দোষ দিয়ে এ দেশের চাষিদের সান্ত্বনা খুঁজতে হয়। কিন্তু কেন? সরকার ফসল উৎপাদনে যেভাবে নজর দেয়, উৎপাদন শেষে উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণে তেমন কোনো নজর দেওয়া হয় না, অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য। ফলে চাষিদের কমবেশি প্রতি বছরই কোনো না কোনো পণ্য পানির দামে বিক্রি করতে হয়। শীতকালীন ফসলের বেলায়ও বটে, এমনকি ধান চাষ করে উপযুক্ত মূল্যের অভাবে ধানচাষিদের কপাল পুড়ছে কয়েক বছর ধরে।

শুধু ভিজা ধান শুকানোর অভাবে এবং টাকার প্রয়োজনে ধানচাষিরা কাটা-মাড়াই মৌসুমে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ফলে ধানের উৎপাদন খরচ তোলা কৃষকের পক্ষে সম্ভব হয় না। ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষক। সামনে আমন ধানের কাটা ও মাড়াই শুরু হবে। অবশ্য কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ বছর আগেভাগেই খাদ্য মন্ত্রণালয় ধান, চালের সরকারি দর নির্ধারণ করে অভ্যন্তরীণভাবে ধান, চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে। এ বছর আমনে চালের চেয়ে বেশি পরিমাণ ধান কেনা হবে। মূল উদ্দেশ্য কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। শেষ পর্যন্ত কৃষকের ভাগ্যে কী ঘটে, যা দেখার জন্য হয়তো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে আমরা আশাবাদী, যেহেতু বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে শুল্ক এখন অনেক বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেহেতু এ বছর আমনে উৎপাদিত ধান থেকে ভোক্তার চাহিদার চালও দেশীয়ভাবে জোগান দেওয়া সম্ভব হবে। এ কারণে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আমাদের দেশে আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া সহসাই কোনো কিছু আদায় হয় না। আমাদের দেশের কৃষক অসংগঠিত এক বৃহৎ জনগোষ্ঠী। যারা খাদ্যশস্য উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্যের অভাবে লোকসান গুনলেও মিটিং-মিছিল, হরতাল, অবরোধ করতে পারেন না। ফলে বছরের পর বছর ধরে কৃষকের স্বার্থ ক্ষণ্ন হলেও ন্যূনতম প্রতিবাদ করার সুযোগ তাদের নেই। অথচ এ দেশের রাজনীতিতে প্রতিটি মূল দলের কৃষকের স্বার্থ রক্ষায়

কৃষক সংগঠন থাকলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। কারণ কৃষক সংগঠনগুলো কাগজে-কলমে থাকলেও প্রকৃতভাবে কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম করার মতো কর্মসূচি চোখে পড়ে না।

পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, সরকার এ বছর শীতকালীন ফসল উৎপাদনে যে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে, তা সময়োচিত। কৃষকের ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে আমরা মনে করি, প্রণোদনার পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে কৃষি, চাষাবাদকে নির্বিঘ্নে করতে হবে। তাহলে ভোক্তার কষ্ট অনেকাংশেই লাঘব করা সম্ভব হবে।

লেখক : কৃষি ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত