সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দরবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া ও নগদ অর্থের পরিমাণ কমে যাওয়াসহ নানামুখী সংকটে পড়েছে দেশের সিমেন্ট শিল্পের নেতৃস্থানীয় কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেড। এসব কারণে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এর ফলে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে লোকসানে রয়েছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট। কোম্পানি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করে। তবে এরপর থেকে কাঁচামালের দরবৃদ্ধি ও সুদ আয় কমে যাওয়ার কারণে দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) লোকসানে পড়ে যায় কোম্পানিটি। তৃতীয় প্রান্তিকেও (জুলাই- সেপ্টেম্বর) একই ধারা বজায় রয়েছে। সর্বশেষ দুই প্রান্তিকে লোকসানের কারণে চলতি বছরের নয় মাসে (জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর) হাইডেলবার্গ সিমেন্টের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৪ লাখ টাকায়। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৬ কোটি টাকা।
মূলত ২০১৭ সাল থেকে ক্লিংকারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের সিমেন্ট শিল্প চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। এর সঙ্গে জ¦ালানি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফা করা কঠিন হয়ে পড়ে। জানা গেছে, ২০১৭ সালের পর থেকে ক্লিংকারের মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এ কারণে সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। তবে ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকায় তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বিক্রয়মূল্য বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দেশের সিমেন্ট শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে সাড়ে ৫ কোটি মেট্রিক টন। আর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ কোটি মেট্রিক টনের। দেশে চাহিদার তুলনায় সিমেন্টের উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকায় তীব্র প্রতিযোগিতাও রয়েছে। এর ফলে এক বছরে বস্তাপ্রতি সিমেন্টে প্রায় ৫৫ টাকা ব্যয় বাড়লেও বিক্রির ক্ষেত্রে একই হারে দাম বাড়াতে পারেনি সব কোম্পানি।
বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে সর্বশেষ দুই প্রান্তিকে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ১৮ কোটি টাকার বেশি লোকসানে পড়েছে। ফলে চলতি বছরের নয় মাসে কোম্পানিটি কোনো রকমে নিট মুনাফায় থাকলেও বছর শেষে নিট লোকসানে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের কোম্পানি সচিব এমদাদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম বেড়ে যাওয়া। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ার কারণেও কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। গত বছর মেঘনা এনার্জি কেনার কারণে কোম্পানির নগদ অর্থের পরিমাণ কমে গেছে। এছাড়া কয়েক বছর ভালো লভ্যাংশ দেওয়ার কারণেও নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে। এ সময় ব্যাংক আমানতের সুদহারও কমে গেছে। এছাড়া আমাদের সুদ আয়ও কমে গেছে। চলতি বছরের বাজেটে ন্যূনতম করহার নির্ধারণের কারণেও ব্যয় বেড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি লোকসানে আসার এসবই কারণ বলে জানান তিনি।
বর্তমানে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের উৎপাদন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। কোম্পানিটির সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশ ব্যয় করে উৎপাদনে। অথচ লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় কোম্পানির মোট বিক্রির মাত্র ৭০ দশমিক ৭১ শতাংশ। লাফার্জের নিজস্ব ক্লিংকারের খনি থাকায় তাদের উৎপাদন ব্যয় সবচেয়ে কম। তালিকাভুক্ত কনফিডেন্স সিমেন্ট ৮৬ শতাংশ, প্রিমিয়ার সিমেন্ট ৮৬ দশমিক ৮ শতাংশ, এম আই সিমেন্ট ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ ও মেঘনা সিমেন্টের ৯০ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয় উৎপাদনে।
তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময় হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বিক্রির পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে এ প্রান্তিকে মোট মুনাফা হয় ১৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কেম্পানির বিক্রয়, বাজারজাতকরণ ও প্রশাসনিক ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এতে করে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে হাইডেলবার্গ ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা পরিচালন লোকসানে পড়ে যায়। যদিও আগের বছরের একই সময় কোম্পানির পরিচালনা মুনাফা ছিল ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের অপরিচালন খাত থেকে কোনো আয় হয়নি। একই সময় সুদ আয় নেমেছে অর্ধেকে। যদিও আয়কর বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি আয়কর বাবদ ১৩ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭১ শতাংশ বেশি। এর ফলে চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানির নিট লোকসান দাঁড়ায় ১৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময় কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ১২ কোটি টাকা।
এদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে ২০১৬ সালের পর থেকেই কোম্পানির নিট মুনাফা কমছে। ২০১৬ সালে এ কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ১৫০ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সালে ৮০ কোটি টাকায় নেমে আসে। ২০১৮ সালে নিট মুনাফা হয় ৮০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। নিট মুনাফায় ধসের কারণে গত দুই বছরে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের শেয়ার দর ৬১ শতাংশ কমে গেছে। গত কয়েক বছরে এটিই কোম্পানির শেয়ারের সর্বনিম্ন অবস্থান।
