জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সর্বাধিক ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। এই ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনতে ২০১৫ সালে প্যারিসে কপ-২১ সম্মেলনে ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে (এলডিসি) আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় উন্নত দেশগুলো। কিন্তু বাংলাদেশ সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোনো অর্থ পায়নি। একই সঙ্গে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরে স্পেনে অনুষ্ঠিতব্য ২৫তম জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৫) নিজেদের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে অর্থায়নের বিষয়টির ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে চুক্তিতে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে তৎপরতাও চালাবে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ২৫তম জলবায়ু সম্মেলন
(কপ-২৫) চলবে ২-১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এবারের সম্মেলনটি চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে গত সপ্তাহের বুধবার চিলি সরকার ডিসেম্বরে জলবায়ু সম্মেলন ও চলতি মাসে নির্ধারিত এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর স্পেন সেই সম্মেলন আয়োজন করেছে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জলবায়ু পরিবর্তন) ড. নূরুল কাদির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অর্থায়নের (সবুজ জলবায়ু প্রকল্প) প্রক্রিয়া আটকে গেছে। কীভাবে উন্নত দেশের প্রুতিশ্রুত অর্থ পাওয়া যায়, সেই চেষ্টা করা হবে। সেজন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এবারের সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে ফেরানো যায় সেই তৎপরতাও আমাদের থাকবে।’
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রিত কার্বন নির্গমনের জন্য বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে আগামী সম্মেলনে ঐক্যবদ্ধভাবে চাপ তৈরি করতে হবে। আমাদের পক্ষ থেকে প্যারিস চুক্তির রুল বুক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়াও বাংলাদেশ কোনোভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না, তাই আমরা ঋণ নেব না, অনুদান নেবÑ এ বিষয়টি আবারও তোলা হবে সম্মেলনে। তারা আরও বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হবে, এদের দায়িত্ব ধনী দেশগুলোকে নিতে হবে, প্যারিস চুক্তিতে এটা বলা ছিল। এরপরও বাংলাদেশ কোনো আর্থিক সহযোগিতা পায়নি। যদিও প্রশমন ও অভিযোজনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ২৭ বিলিয়ন ও ৪২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। সেজন্য বাংলাদেশ গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে রাখবে। এছাড়া চুক্তিতে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। সম্মেলনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে তুলবে বাংলাদেশ।
এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন) জাকির হোসেন বলেন, ‘এবারের সম্মেলনটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্যারিস চুক্তি ভেস্তে গেলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হব আমরা। ক্ষতি পোষাতে যে অর্থায়ন হবে তা যেন অনুদানভিত্তিক হয় সেটি আলোচনা করতে হবে। ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তিতে সবুজ জলবায়ু প্রকল্প থেকে যে অর্থায়ন করার কথা ছিল সে অর্থ এখন ছাড় হয়নি। কবে হবে তাও বোঝা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়া প্যারিস চুক্তির জন্য বড় ক্ষতি। যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ফেরাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন কয়েকজন প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের দিয়ে চাপ তৈরি করতে হবে যাতে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ দেয়। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না দিলে মানবাধিকার বা আইনের মাধ্যমে সেটি আদায় করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভালোভাবে অনুধাবন শুরু করেছে। দেশে ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, খরা, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এর সবকটিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। দেশে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, বন্যা কিংবা খরার বিরূপ আচরণ খুবই পরিষ্কারভাবে টের পাওয়া যায়। কোনোটিই আগের মতো সময় মানছে না। অসময়ে যেমন অতিবৃষ্টি হয়, তেমনি আবার অসময়ে খরা কিংবা বন্যাও হয়। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে পানি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও রাসায়নিক দূষক পদার্থ বহন করে থাকে। একইভাবে ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটায় ও নানা কীটপতঙ্গের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফলে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুসহ নানা ব্যাধি বাসা বাঁধছে। একই কারণে গ্রীষ্মকাল ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে এবং বর্ষাকাল বিলম্বিত হচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি, ফসল ও মানুষের ওপর। ঋতুভিত্তিক ফসল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ুর এই ক্ষতিকর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শহরগুলোতে অভিগমনের হার বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত সচিব ড. নূরুল কাদির বলেন, এবারের ডেঙ্গু এবং গত বছরের চিকুনগুনিয়ার জন্য জলবায়ু ব্যাপকভাবে দায়ী। এজন্য উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শহরগুলোতে অভিগমনের মাত্রা বেড়ে গেছে। এবারের সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য ও অভিগমনের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনা করা হবে।
