সুন্দরবন যা শেখাচ্ছে শিখছে কি তা বাংলাদেশ

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৪৫ পিএম

‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন’-এর এই বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরেই ‘জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে’। এদেশ কখনো বন্যায় ভাসে, কখনো শহর-বন্দর-গ্রাম চুরমার হয়ে যায় ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে। প্রাকৃতিক তাণ্ডবের সঙ্গে এদেশের মানুষের এ লড়াই যেমন সত্য; তেমনি সত্য গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার মিলিত অববাহিকাজুড়ে শস্য-শ্যামলা সুজলা-সুফলা বাংলাদেশের অপরূপা প্রকৃতির অনন্য দান। নদীর একূল ভেঙে ওকূল গড়ার মতো শত-সহস্র বছর ধরে প্রকৃতি নিজেই নিজের ভারসাম্য রক্ষা করে আগলে রেখেছে বাংলাদেশকে। কিন্তু শিল্পবিপ্লব-উত্তর আধুনিক নগরসভ্যতায় প্রকৃতি ধ্বংসের আত্মঘাতী দখল-দূষণে পৃথিবী আজ বিপন্ন। নদী-জল-বন-বাদাড়-হাওর-বাঁওড়ের অনন্য প্রকৃতি নিয়ে সাগরমুখে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশও আজ এই আসন্ন বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না। বরং আরও স্পষ্টভাবে এই সত্যটা সামনে আনা জরুরি যে, প্রবল শিল্পায়নে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন গ্যাস নির্গমনে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি আমাদের এই নদীমাতৃক-সমুদ্রমাতৃক বাংলাদেশ।

এই প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দক্ষিণ আমেরিকায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৃষ্টিবন আমাজন থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাদাবন সুন্দরবনের অনন্য ভূমিকা এবং পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারা জরুরি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেনের ২০ শতাংশেরই উৎস বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৃষ্টিবন আমাজন। বিপুল পরিমাণ কার্বন জমা রেখে বৈশ্বিক উষ্ণতার গতিকে খানিকটা শ্লথ রেখেছে আমাজন। কিন্তু বিশ্বের ফুসফস খ্যাত অক্সিজেন ভাণ্ডার আমাজন নিজেই এখন জ্বলে-পুড়ে ছারখার হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে আমাজনে ৭৫ হাজারের বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। এ বিপর্যয়ের জন্য আমাজনের ৬০ ভাগেরও বেশি বনাঞ্চলের অধিকারী দেশ ব্রাজিলের ভুল রাষ্ট্রীয় নীতি আর শিল্পায়নের করাল গ্রাসকেই দায়ী করছেন পরিবেশবাদীরা। অন্যদিকে, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা শ্বাসমূলীয়-বাদাবন সুন্দরনের ৬২ ভাগেরও বেশি অংশের অধিকারী বাংলাদেশেও আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ-প্রতিবেশ। অথচ, যুগ যুগ ধরে বঙ্গোপসাগরের সাইক্লোন-ঘূর্ণিঝড় থেকে বাংলাদেশের উপকূল রক্ষা করে যাচ্ছে সুন্দরবন। এবারও প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’কে ঠেকিয়ে দিয়ে সুন্দরবন অগণিত মানুষের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করেছে। এর আগেও সুন্দরবনের সবুজ বেষ্টনীতে বাধা পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল ২০০৭ সালের সিডর ও ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলা। কিন্তু দুনিয়াজুড়ে প্রকৃতি ধ্বংসের উন্মত্ততার এই যুগে আজ আমাজন কিংবা সুন্দরবনকে রক্ষা করবে কে?

অসাধারণ জীববৈচিত্র্য এবং মিঠাপানি ও নোনাপানির অনন্য বাস্তুসংস্থানের মিলিত আধার হওয়ার কারণেই সুন্দরবনকে বিশ্বঐতিহ্য ঘোষণা করে জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেসকো। কিন্তু এখন পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে সুন্দরবনকে নিয়ে শঙ্কিত তারাও। ইউনেসকো সুন্দরবনের যেসব ঝুঁকির কথা বলছে তার মধ্যে রয়েছে উজানের নদীগুলো থেকে প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনের নদী-খালগুলোতে মিঠাপানির স্বল্পতা ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে পশুর নদ খনন, বন্যপ্রাণী শিকার, ভূমিক্ষয় ও ভাঙন, বনের ভেতর নানা অবকাঠামো ও স্থাপনা নির্মাণ, বনের পাশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নানারকম কলকারখানা স্থাপন এবং এসব নানা উৎসের কারণে মারাত্মক পানিদূষণ। একইসঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলোতে পলি বেড়ে গিয়ে সুন্দরবনের বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক উদ্ভিদ উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে না পেরে মারা যাচ্ছে। এছাড়া, মোংলা বন্দর এবং নানা শিল্পকারখানার কারণে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সেখানকার পানিদূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিগত বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় জ্বালানি তেল ও অন্যান্য রাসায়নিক পণ্যবাহী জাহাজডুবির কারণে সুন্দরবন মারাত্মক তেলদূষণের শিকার হয়েছে। এতে সুন্দরবনের সংকটাপন্ন ডলফিন, কুমিরসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীরা হুমকির মধ্যে পড়েছে। এভাবে ক্রমাগত সুন্দরবনের অনন্য বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ছে।

সুন্দরবনের পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে দেশে বিগত এক-দেড় দশক ধরে নানা আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে এবং এ নিয়ে নানা মাত্রায় আলোচনা-সমালোচনা বিতর্কও চলমান। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্দরবনের সুরক্ষার বিষয়ে সরকারের কোনো স্পষ্ট অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী আলোচিত নবীন পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবারির জাতিসংঘ ভাষণের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। বিশ্বনেতাদের সামনে সাহসী কিশোরী গ্রেটা বলেছিল, ‘আপনারা আমাদের স্বপ্ন ও শৈশব হরণ করেছেন। বিশ্বের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। আর আপনারা শুধু অর্থ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গালগল্প করে যাচ্ছেন।’ একইসঙ্গে এ কথাও আমাদের ভাবতে হবে যে, বারবার ঘূর্ণিঝড়-সাইক্লোন ঠেকিয়ে দিয়ে সুন্দরবন আমাদের যা শেখাচ্ছে, শিখছে কি তা বাংলাদেশ?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত