ট্রেন ভ্রমণকে সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক বলা হয়। কিন্তু খুলনা রেলস্টেশন থেকে চলাচলকারীদের কাছে তা যন্ত্রণার। প্রতিদিন এ স্টেশনে হাজারো যাত্রী ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে ওঠা-নামা করে। ট্রেনের কোচ (বগি) থেকে প্ল্যাটফর্ম অনেক নিচু হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়। কর্র্তৃপক্ষ বলছে, বিভিন্ন দেশ থেকে ইঞ্জিন ও কোচ কেনায়, উচ্চতা ভিন্ন থাকে। প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ফাঁরাক দেখা দেয়। নিজস্ব কারখানা থেকে ইঞ্জিন ও কোচ উৎপাদনের চিন্তা রয়েছে। সেটি করা গেলে সমস্যার সমাধান হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, খুলনা রেলস্টেশনে প্রতিদিন ১০টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে আন্তঃনগর চিত্রা ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস ঢাকা, সাগরদাঁড়ি ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস রাজশাহী, রূপসা ও সীমান্ত এক্সপ্রেস সৈয়দপুর, রুকেট ট্রেন পার্বতীপুর, নকশীকাঁথা ট্রেন গোয়ালন্দ ও কমিউটার ট্রেন বেনাপোলের উদ্দেশে খুলনা স্টেশন ছেড়ে যায়। একইভাবে বিভিন্ন স্টেশন থেকে এসব ট্রেন খুলনা স্টেশনে প্রবেশ করে। এসব ট্রেনে যাত্রীর পাশাপাশি মালামাল আনা-নেওয়া করা হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের তুলনায় ট্রেনের বগি বেশ উঁচু। মানুষের মাথার ওপরে বগির হাতল থাকায়, পুরুষদেরই উঠতে কষ্ট হয়। নারীদের পক্ষে ওঠা রীতিমতো দুঃসাধ্য। বেশিরভাগ সময় পুরুষ যাত্রী আগে ওঠে, পরে হাত ধরে টেনে নারী-শিশুসহ স্বজনদের ওঠায়। বয়স্করা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন। তাদের টেনে ওঠানো যায় না। এতে প্রতিনিয়ত যাত্রীরা হাত ফসকে পড়ে জখম হচ্ছে। একইভাবে ট্রেন থেকে নামতে গেলেও বিপদে পড়ছে যাত্রীরা। মালামাল থাকলে ভোগান্তির শেষ নেই।
নগরীর লবণচরা এলাকার হালিমা বেগম (৭০), গত বুধবার তার হাত ধরে টেনে বগিতে ওঠাচ্ছিলেন মেয়ে নাছরিন আক্তার। মেয়ের ভাষ্য, বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে তিনি ট্রেনে চড়েছেন। কিন্তু কোথাও এমন বেখাপ্পা প্ল্যাটফর্ম পাননি। মানুষই উঠতে পারে না, লাগেজ কীভাবে ওঠাবে? খুলনা স্টেশন থেকে যশোরে যাতায়াতকারী সলিমুল ইসলাম জানান, ব্যবসার কাজে সপ্তাহে পাঁচ দিন তিনি যশোর যান। প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে ওঠেন। চোখের সামনে ট্রেনে উঠতে নারীদের যুদ্ধ দেখলে কষ্ট হয়। বয়রার বাসিন্দা আহমেদ কবির জানান, প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের বগির উচ্চতা প্রায় চার ফুট। উঠতে গেলে মনে হয় এই চাকার নিচে পড়ে গেলাম। কিন্তু বিকল্প নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক প্রকৌশলী দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশে বেশিরভাগ ট্রেনের ইঞ্জিন আসে ভারত, কোরিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। আর কোচ (বগি) আসে জার্মানি, ইরান, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে। বিভিন্ন দেশের ইঞ্জিন ও কোচ হওয়ায় উচ্চতা সমান হয় না। রক্ষণাবেক্ষণ করাও কষ্টসাধ্য। তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশের উচিত, যে দেশ থেকেই ইঞ্জিন ও কোচ আনা হোক না কেন, নিজেদের প্ল্যাটফর্মের মাপ মেনে চাহিদা দেওয়া। সবচেয়ে ভালো হয়, সৈয়দপুরের পাহাড়তলি কারখানায় এগুলো উৎপাদনে যাওয়া। এতে খরচ বেঁচে যাবে, যাত্রীদের ঝামেলাও এড়ানো সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে খুলনা রেলওয়ের ট্রাফিক কর্মকর্তা অংশুমান রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কপোতাক্ষ ও রূপসা এবং সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেন ইন্দোনেশিয়ার; চিত্রা ও সুন্দরবন ভারতের। ফলে উচ্চতা ভিন্ন রকম। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম অনেক আগে করা। সব ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচ একটি দেশ থেকে আনা গেলে অথবা নিজেরা বানালে, এ সমস্যা দূর করা যেত। ভবিষ্যতে হয়তো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইঞ্জিন ও কোচ বানানো হবে।’
