ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় ছাত্রীকে ‌‘দেহ ব্যবসায়ী’ আখ্যা চেয়ারম্যানের

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১০:২৩ পিএম

টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ধর্ষণের শিকার কলেজছাত্রীকে ‘দেহ ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে প্রতিবেদন লিখে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে পাঠিয়েছেন ধুবড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ভুক্তভোগী ওই তরুণীর বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ ও অভিযুক্ত ধর্ষকদের রক্ষা করতে চেয়ারম্যান মতিয়ার এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া গত ৫ নভেম্বর পাঠানো ওই প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী তরুণীর বাবাকে মাদক কারবারি আখ্যা দিয়েছেন তিনি। তবে চেয়ারম্যানের দেওয়া ওই প্রতিবেদনকে মিথ্যা উল্লেখ করে নাগরপুর থানা পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী ওই পরিবারের নামে এলাকায় বা থানায় মাদক কারবার ও দেহ ব্যবসার কোনো অভিযোগ নেই।

স্থানীয় আইনজীবীরাও বলছেন, চেয়ারম্যান যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ আইন বহির্ভূত, এক্ষেত্রে তার শাস্তি হওয়া উচিত।

এদিকে এ ঘটনার পর ভুক্তভোগী ওই কলেজছাত্রী লোকলজ্জায় ১২ দিন ধরে বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না। বন্ধ হয়ে গেছে তার কলেজে যাওয়া। এছাড়া ধর্ষণের বিচার পাওয়া নিয়েও উদ্বিগ্ন পরিবারটি।

নির্যাতিত তরুণীর বাবার করা মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধুবড়িয়া ইউনিয়নের ধুবড়িয়া গ্রামের ওই তরুণীকে (১৮) কলেজে আসা-যাওয়ার পথে প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত সারুটিয়াগাজি গ্রামের জুয়েল রানা নামে এক যুবক। সে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও স্বভাব-চরিত্র ভালো না থাকায় তরুণীর বাবা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে জুয়েল।

সে গত বছরের ১২ জুলাই সন্ধ্যায় ধুবড়িয়া বাচ্চু মিয়ার ব্রিজের সামনে থেকে বন্ধুদের সহযোগিতায় তরুণীকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। জুয়েল তরুণীকে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে তিন দিন আটক রাখে। পরে তরুণী কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানায়। পরে তরুণীর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি গ্রামের মাতব্বদের জানান। কিন্তু ধর্ষণের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মাতব্বররা বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েও টালবাহানা ও সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন।

ফলে তরুণীর বাবা বাদী হয়ে গত বছরের ১ নভেম্বর টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিরা হলেন জুয়েল রানা (২২), মো. শিপন (২৬), মো. রিপন (২৩), উফাজ (৪২) ও মো. রিয়াজ মিয়া (২১)। তাদের সবার বাড়ি ধুবড়িয়া গ্রামে। এরপর থেকেই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আসামিরা বাদীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। বিশেষ করে পুলিশ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর থেকে আসামিরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

অভিযোগ উঠেছে, আসামিরা এরই মধ্যে ধুবড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমানকে ম্যানেজ করে ফেলে। তারা ধর্ষণের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেয়ারম্যানকে দিয়ে ভুক্তভোগী তরুণীকে দেহ ব্যবসায়ী এবং তার বাবাকে মাদক কারবারি আখ্যা দিয়ে আসামিদের পক্ষে একটি প্রতিবেদন দেয়।

টাঙ্গাইল জজকোর্টের আইনজীবী শহীদুল আলম শাহীন এবং একই আদালতের আইনজীবী ও এপিপি সুলতানা আক্তার এ্যালী বরাবর ওই প্রতিবেদনটি পাঠান চেয়ারম্যান। তাদের নাগরপুরের বাড়িতে কাজ করেন ভুক্তভোগী তরুণীর বাবা।

ওই দুই আইনজীবীর কাছে প্রতিবেদনটি পাঠানোর পাশাপাশি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি ও টাঙ্গাইল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিকে প্রতিবেদনের অনুলিপি পাঠান চেয়ারম্যান।

গত ৫ নভেম্বর ওই আইনজীবী দম্পতির কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে তরুণীর বাবাকে তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে আগামী ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন চেয়ারম্যান। তা না হলে তাদের বাড়িতে উত্তেজিত জনতা হামলা করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে নির্যাতিত তরুণীর বাবার করা মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই তরুণীর বাবা হতদরিদ্র কৃষক। তিনি দিনমজুরের কাজের পাশাপাশি এক প্রবাসীর বাড়িতে স্ত্রী ও চার কন্যা নিয়ে বসবাস করে আসছেন। তার মেয়ে ভুক্তভোগী তরুণী ২০১৮ সালে ধুবড়িয়া ছেফাতুল্লাহ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের একটি কলেজে লেখাপড়া করছে। এর আগে ছেফাতুল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার সঙ্গে জুয়েল রানার পরিচয় হয়। জুয়েল প্রেমের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করে তরুণী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জুয়েল ওই ঘটনা ঘটায়। এছাড়া পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারা এই কৃষক পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক বা দেহ ব্যবসার কোনো অভিযোগ পায়নি।

চেয়ারম্যানের দেওয়া প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজছাত্রীর বাবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান আমার পরিবারকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। চেয়ারম্যান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে গ্রাম থেকে চলে যেতেও নির্দেশ দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পরিবার নিয়ে এখন নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছি।’

কলেজছাত্রীকে দেহ ব্যবসায়ীর তকমা দেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান মতিউর রহমান মতি বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যান, আমি দিতে পারি তাই দিয়েছি। তার (ছাত্রীর) বিরুদ্ধে মাদক ও দেহ ব্যবসার কোনো মামলা আছে কি না তা আমি জানি না। এলাকার লোকজন বলেছে তাই আমি এ প্রতিবেদন দিয়েছি।’

চেয়ারম্যানের দেওয়া ওই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ আইন বহিভূ©ত উল্লেখ করে টাঙ্গাইল জজকোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এস আকবর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত কর্তৃক কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে দোষী বলা তো দূরের কথা, মাদক ও দেহ ব্যবসায়ী বলে কাউকে আক্রান্ত করার এখতিয়ার কারও নেই। এক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের শাস্তি হওয়া উচিত।’

স্থানীয় পুলিশও চেয়ারম্যান মতির দেওয়া প্রতিবেদনকে মিথ্যা বলে জানিয়েছে। নাগরপুর থানার ওসি আলম চাঁদ বলেন, ‘চেয়ারম্যান কলেজছাত্রীর বিরুদ্ধে যে প্রতিবেদন দিয়েছেন তা সঠিক নয়। ওই পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ও দেহ ব্যবসার বিষয়ে এলাকায় ও থানায় কোনো অভিযোগ নেই। মামলার আসামিরা মেয়েটি ও তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং তারা পলাতক আছে। এ পরিস্থিতিতে মেয়েটির পরিবারের নিরাপত্তার প্রতি বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত