কেনাকাটার উৎসব মানে কারও কাছে ঈদ, কারও কাছে পূজা, কারও কাছে আবার বড়দিন। উৎসবের এই পৃথক্করণ পৃথিবীবাসীর কাছে বিশেষ কিছুদিনে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ‘ব্ল্যাকফ্রাইডে’ সেই দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় একটি প্রহর। চলতি বছর দিনটি পড়েছে ২৯ নভেম্বর।
পশ্চিমা বিশ্বে থ্যাংকস গিভিং ডের পরের দিন ব্ল্যাকফ্রাইডে হিসেবে পরিচিত। এ দিন ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় বিশেষ মূল্য ছাড় দেন। প্রযুক্তি জগতে পশ্চিমাদের আধিপত্যের কারণে এই দিনটি এখন পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। অনলাইনে ছাড়ে কেনাকাটার জন্য এক মেরু থেকে আরেক মেরুর মানুষ মুখিয়ে আছেন। দিনটিকে সামনে রেখে গার্ডিয়ান, ফোর্বস, ওয়াশিংটন পোস্ট এবং বিবিসির মতো সংবাদমাধ্যম প্রতিদিন ক্রেতাদের কেনাকাটা-বিষয়ক বিভিন্ন পরামর্শ দিচ্ছে।
ব্ল্যাকফ্রাইডে এবং ইতিহাস
ব্ল্যাকফ্রাইডের ধারণা মূলত ‘অর্থনৈতিক দুরবস্থা’ থেকে এসেছে। ১৮৬৯ সালের দিকে ওয়াল স্ট্রিটের দুই বিনিয়োগকারী আমেরিকার স্বর্ণ বাজারের বিশাল অংশ কিনে নেন। সোনা মজুদ করে দাম বাড়িয়ে সেটি আবার বেশি দামে বিক্রির পাঁয়তারা ছিল তাদের।
ওই বছর ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল শুক্রবার। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের বাজার মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই দিনটিকে মানুষ ‘কালদিন’ হিসেবে মনে রেখেছে।
এই ইতিহাসের সঙ্গে আরও কিছু বিষয় কথিত আছে। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা যে সময় হাতে হিসাবনিকাশ করতেন, সে সময় তারা লাভের বিষয়টি কালো কালিতে লিখতেন আর লোকসান হলে লাল।
ওই দিনগুলোতে প্রায় সারা বছর ব্যবসায়ীরা লালে (লোকসানে) থাকতেন। কিন্তু থ্যাংকস গিভিং ডে এলেই খাতা কালো অর্থাৎ লাভের হিসাবে ভরে যেত। কারণ ওই দিনটির জন্য দোকানগুলোতে তখন বিশেষ ছাড় দেওয়া হতো।
যেভাবে চালু হলো
ফিলাডেলফিয়ার পুলিশ সদস্যরা প্রথম ‘ব্ল্যাকফ্রাইডে’কে বিশেষ দিন হিসেবে চালু করেন। ১৯৫০-এর দশকে থ্যাংকস গিভিং উৎসবের পরের দিন শহরটিতে অসংখ্য মানুষ আর্মি-নেভি সদস্যদের একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে আসেন।
ভিড় সামলাতে বাধ্য হয়ে সেদিন অনেক পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়। তাদের কাজ করতে হয় লম্বা সময়। সেই থেকে ফিলাডেলফিয়ার পুলিশরা এই দিনটিকে ‘ব্ল্যাকফ্রাইডে’ হিসেবে অভিহিত করেন। ‘ব্ল্যাক’ শব্দটি দিয়ে অধিকাংশ সময় নেতিবাচক ভাব প্রকাশ করা হয় বলে অনেক ব্যবসায়ী এই দিনটিকে ‘বিগফ্রাইডে’ সম্বোধন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটি হয়নি আমেরিকান একটি ম্যাগাজিনের কারণে। ১৯৬৬ সালে ‘দি আমেরিকান ফিলিস্টলিস্ট’ ম্যাগাজিন ব্ল্যাকফ্রাইডে লিখে একটি বিজ্ঞাপন চালু করে। সেই থেকে এখনো চলছে।
ব্ল্যাকফ্রাইডে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বার্ষিক শপিং ইভেন্ট, পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম। এই ইভেন্টের পাশাপাশি ‘সাইবার মনডে’, ‘বক্সিং ডে’, ‘আমাজন প্রাইম ডে’ এবং ‘সিঙ্গলস ডে’র মতো জনপ্রিয় ইভেন্টও আছে।
ছাড়ে সয়লাব অনলাইন
বিদেশি প্রতিষ্ঠান আমাজন, বেস্ট বাই, ওয়ালমার্ট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের এক্সনহোস্ট এবং দারাজের মতো প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকফ্রাইডের আকর্ষণীয় সব অফার সাজিয়ে বসে আছে।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট সি নেট জানিয়েছে, ব্ল্যাকফ্রাইডে উপলক্ষে আমাজনে ৫০ ডলারের নিচে বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। যেগুলো কিনলে বাঁচতে পারে অতিরিক্ত ৫০ ডলার। এর মধ্যে আমাজন ইকো ডট থেকে শুরু করে ফায়ার টিভি স্কিট আছে। এই প্রতিবেদন লেখার সময় আমাজনের ওয়েবসাইটে ফায়ার এইচটি ১০ ট্যাবলেটে দারুণ একটি ছাড় দেখা গেছে। পণ্যটির পূর্বমূল্য ছিল ১৪৯ দশমিক ৯৯ ডলার। ছাড়ের পর সেটি ৯৯ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। সামনের কয়েক দিনে আরও চমকপ্রদ সব ছাড় আসতে পারে।
বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস জানিয়েছে, ফোনের ভালো ছাড় দিচ্ছে ওয়ালমার্ট। আইফোন ১১, আইফোন ১১ প্রো, আইফোন ১১ প্রো ম্যাক্স কিনলে ১০০ ডলারের মতো বাঁচতে পারে! ২৭ তারিখ থেকে প্রতিষ্ঠান আরও আকর্ষণীয় সব ছাড় নিয়ে হাজির হবে।
বাংলাদেশ থেকে যারা হোস্টিং সেবা নিতে চান, তারা ‘ব্ল্যাকফ্রাইডে অফারে’ এক্সনহোস্টে চোখ রাখতে পারেন।
ব্ল্যাকফ্রাইডে উপলক্ষে হোস্টিং সেবায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ ছাড় (https:// www.exonhost.com/blackfriday) ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এক্সনহোস্টের সাইট থেকে কুপন কোড ব্যবহার করে ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যাবে। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই সুবিধা চালু থাকবে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ দেশে ডোমেইন-হোস্টিং সেবা দিচ্ছে এক্সনহোস্ট। বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে পার্টনারশিপ গড়েছে বাংলাদেশের এ প্রতিষ্ঠানটি।
যারা ছাড়ে ক্যামেরা কিনতে চান, যারা ঢুঁ মারতে পারেন ‘বেস্ট বাই’তে। নিকন ডি৭৫০০ ডুয়েল-লেন্স এখানে ৯৯৭ ডলারে পাবেন। বেঁচে যাবে ৫০০ ডলার! নিকন ডি৫৬০০ ডুয়েল লেন্স পাবেন ৬০০ ডলারে, বাঁচবে ২০০ ডলার।
সনি এ৬০০০ মডেলে ৪০০ ডলার ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিক্রি হচ্ছে ৬০০ ডলারে। ২৮ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই ছাড়।
ছাড়ে ল্যাপটপ কিনতে চাইলে ওয়ালমার্ট, বেস্ট বাই কিংবা মাইক্রোসফটের ওয়েবসাইট ঘুরে দেখতে পারেন। যেমনÑ এ মুহূর্তে ওয়ালমার্ট থেকে আসুস ভিভোবুক ১৫ দশমিক ৬ ইঞ্চি কিনতে চাইলে দাম পড়বে ২৪৯ ডলার। আগে ছিল ৩৪৯ ডলার। ডেল থেকে কিনলে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ ছাড় পাবেন। https://
blackfriday.com/categories/laptops এই ঠিকানা থেকে আরও অফার জেনে নিতে পারেন।
এই দিনটিকে সামনে রেখে স্যামসাংও সেজেছে বিশেষ আকারে। স্মার্টফোন, মনিটর, ল্যাপটপে তারা ভালো ছাড় দিচ্ছে।
https://blackfriday.com/samsung-black-friday এই লিংক থেকে তাদের পণ্য কিনতে পারেন।
সবচেয়ে বেশি ছাড়
এই প্রতিবেদন লেখার সময় ব্ল্যাকফ্রাইডে উপলক্ষে সবচেয়ে বড় ছাড়ের খবর পাওয়া গেছে নিউ ইয়র্কভিত্তিক কধঃব ঝঢ়ধফব নামক একটি অনলাইন শপিং সেন্টার থেকে। মেয়েদের ব্যাগে তারা ৭৫ শতাংশ ছাড় দিয়েছে। যে ব্যাগ তারা এত দিন ২৪৯ ডলারে বিক্রি করেছে, সেটি এখন ৭৯ ডলারর পাওয়া যাচ্ছে!
দারাজ বাংলাদেশ ব্ল্যাকফ্রাইডে উপলক্ষে দেশে ‘ফাটাফাটি ফ্রাইডে’ অফার চালু করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে তারা এবার পাঁচ লাখেরও বেশি পণ্যে ছাড় দেবে। যঃঃঢ়ং://িি.িফধৎধু.পড়স.নফ/ভধঃধভধঃর-ভৎরফধু/ এই লিংক থেকে তাদের সব অফারের তথ্য জেনে কেনাকাটা করতে পারবেন।
সতর্কতা
ব্ল্যাকফ্রাইডের উন্মাদনা শুরু হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দেশ থেকে ক্রেতাদের সতর্ক করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টিএসবি ব্যাংক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ব্ল্যাকফ্রাইডেতে প্রতি দশজন ক্রেতার একজন প্রতারণার শিকার হন। তাই কেনার আগে পণ্য এবং প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া উচিত। বেনামি প্রতিষ্ঠান থেকে বড় কোনো কেনাকাটা না করাই ভালো।
