সরকারি চাকরি দেওয়া, কম দামে নিলামের পণ্য কিনতে সহায়তা এবং কম খরচে বিদেশে পাঠানোসহ নানা প্রলোভনের ফাঁদ পেতে নগরীর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। বেকারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারকের সংখ্যাও। এমনকি পুলিশ ও র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করেও চলছে প্রতারণা। বিশেষ করে চাকরিপ্রত্যাশীরা কর্মসংস্থানের আশায় প্রতারকদের নানা টোপ সহজেই গিলছেন। বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রামে গত ১১ মাসে এ ধরনের প্রতারণার ঘটনায় মামলা হয়েছে শতাধিক। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ কর্মকর্তা ও সমাজবিশেস্নষকরা বলছেন, শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, সচেতনতা বৃদ্ধিই পারে এমন প্রতারণা থেকে মুক্তি দিতে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে নিজেদের দেওয়া প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে প্রতারকরা। এমনই এক ঘটনায় সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের নিকটাত্মীয় পরিচয় দিয়ে পুলিশে ও সচিবালয়ে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নাহিম হাসান নামে এক যুবকের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় আজিজ নামের এক প্রতারক।
নাহিম হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আমাকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ২ লাখ টাকা নেয় আজিজ। পরে যখন বুঝতে পারি আজিজ প্রতারক, তখন সে উল্টো আমাকে মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়।’
সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে বিভিন্ন পদে নিয়োগের নাম করে ফাঁদ পেতে একটি প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে ৩১ লাখ টাকা। কথিত ওই নিয়োগের জন্য ভুয়া নিয়োগ পরীক্ষা এবং মেডিকেল ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর্যন্ত আয়োজন করে চক্রটি। শেষে ভুয়া সিল-স্বাক্ষরের নিয়োগপত্র নিয়ে প্রতারণার শিকার তিন যুবক কাস্টমস হাউজে যোগদান করতে গেলে প্রতারণা বিষয়টি জানাজানি হয়। আর শুধু সরকারি দপ্তরেই চাকরি নয়, র্যাবের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে চাকরি দেওয়ার নাম করেও প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া র্যাব সদস্য পরিচয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কিছুদিন আগে কাস্টমস অফিসার পরিচয়ে কম দামে নিলামের পণ্য কিনে দেওয়ার ফাঁদ পেতে গাজীপুরের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। অন্যদিকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এ বছরের ১৯ এপ্রিল একটি প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে, যারা বিদেশে পড়ালেখা ও চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে অর্থ হাতিয়ে নিত।
ওই চক্রের হাতে প্রতারণার শিকার কলেজছাত্রী সেœহা রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছয় মাস আগে স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসে ভর্তি হয়ে দেখি, প্রকৃতপক্ষে তাদের কার্যক্রম এমএলএমের। তখন ভর্তির টাকা ফেরত চাইলে আমাকে ভয়ভীতি দেখায় তারা।’
নগরীতে প্রতারণার ঘটনা বাড়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মোস্তাইন হোসেন বলেন, ‘অভিযোগ পেলেই আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠাচ্ছি। এ বিষয়ে গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন থানায় করা অভিযোগের তদন্ত করতে নেমে আমরা জানতে পারি, এরা সংঘবদ্ধ চক্র। ভুক্তভোগীদের বাসার আশপাশে অবস্থান নিয়ে এ চক্রের সদস্যরা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে সুযোগ বুঝে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. ইন্দ্রজিৎ কুণ্ডz দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্রুত ধনী হতে চাওয়া, অনৈতিক সুবিধা ও লেনদেনের কারণে এসব প্রতারণা বাড়ছে। পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলের ৪২০ ধারা অনুযায়ী এখনো প্রতারণার মামলা হওয়ায় বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা রয়ে গেছে। ফলে দুর্বল বিচারব্যবস্থার কারণে অপরাধীরা সুযোগ পাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে চরিত্রগত পরিবর্তন ও সচেতনতা বাড়লেই এসব অপরাধের হার হ্রাস পাবে।’
টিআইবির সাধারণ পর্ষদ সদস্য ও সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগরের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘কর্মসংকটে যেমন বেকার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি কর্মের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে অনৈতিক লেনদেন করছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। আর এ সুযোগটা কাজে লাগায় প্রতারক চক্র। পাশাপাশি সুশাসনের অভাবে এসব প্রতারক বারবার অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় কুশীলবরা।’
