দেশে প্রত্যক্ষ আয়কর দাতার সংখ্যা আশানুরূপ হারে বাড়ছে না। গত ১ ডিসেম্বর ব্যক্তি করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা শেষ হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা ‘এনবিআর’-এর আয়কর বিভাগ প্রাথমিক হিসাবে দেখেছে, এ বছর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ২২ লাখেরও কম। অথচ দেশে এখন ৪৬ লাখের বেশি ই-টিআইএনধারী রয়েছেন। অর্থাৎ ই-টিআইএনধারীর বড় অংশই আয়কর বিবরণী জমা দেননি। আয়কর খাতে রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সুফল পাচ্ছে না এনবিআর। চাকরিজীবী ছাড়াও কর দিতে সক্ষম ব্যক্তির খোঁজে নানা তৎপরতার মাধ্যমে এক বছরে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরধারীর সংখ্যা বাড়লেও কর আদায় আশাব্যঞ্জক হারে বাড়ছে না, এমনকি রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যাও বাড়ছে না। আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থদণ্ড রয়েছে। তা সত্ত্বেও করদাতার সংখ্যা না বাড়ায় চিন্তিত খোদ এনবিআর। একদিকে, আয় বাড়াতে না পারায় সরকারের নীতিনির্ধারকদের চাপের মুখে রয়েছে সংস্থাটি; অন্যদিকে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করে দৈনন্দিন কার্যক্রম ও উন্নয়নপ্রকল্প চালাতে হচ্ছে সরকারকে।
গত বছর আয়কর দিবস পর্যন্ত রিটার্ন দাখিলের বিপরীতে কর আদায় হয়েছিল ২১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। এ বছর একইসময়ে এমন কর আদায় হয়েছে ২৪ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে এই বছর কর আদায় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। কিন্তু সরকারের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা খুবই অকিঞ্চিৎকর। দেশের প্রায় চার কোটি নাগরিক মধ্যম আয়ের অন্তর্ভুক্ত হলেও আয়কর দেন ২১ লাখ থেকে ২২ লাখ ব্যক্তি। চলতি অর্থবছরের লিখিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল খুব শিগগিরই এই সংখ্যা ১ কোটিতে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। এই লক্ষ্য পূরণ করে আয়কর সংগ্রহ বাড়াতে এনবিআর বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়। এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা মহানগরের বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকদের ওপর জরিপ চালানো এবং বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতে জরিপ চালানো। এছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কর দেওয়ার যোগ্য তাদেরও করের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া। এসব কাজে কর্মী হিসেবে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীকে আউটসোর্স করা কর্মী হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগের কোনো দৃশ্যমান ফল দেখা যাচ্ছে না।
কর আদায় সম্পর্কে এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর একটি উক্তির কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘কর আদায়ে আমাদের নীতি হবে অনেকটা ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থমন্ত্রী জ্যঁ ব্যাপ্টিস্ট কোলবার্টের একটা উক্তি অনুসরণ করেÑ রাজহাঁস থেকে পালক ওঠাও যতটা সম্ভব ততটা, তবে সাবধান রাজহাঁসটি যেন কোনোভাবেই ব্যথা না পায়।’ কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন দেশের বাস্তবতার চিত্রটি এখনো ভিন্ন। তারা বলছেন, একদিকে প্রত্যক্ষ কর না দিয়ে বা বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দিয়ে আয়ের শীর্ষে থাকা ধনিক শ্রেণির অনেকে বেঁচে যাচ্ছেন, অন্যদিকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়ছে এবং অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা বাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরেই। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজস্ব আয়ের মূল অংশটি আসে ভ্যাটসহ বিভিন্ন অপ্রত্যক্ষ করের মাধ্যমে। আবার আয়করের মধ্যেও ৬০ শতাংশ করই আসে করপোরেট কর থেকে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোট আয়করের ৬৭ শতাংশই আসে ‘উৎসে কর্তন’ বাবদ। ১৯ শতাংশ আসে অগ্রিম আয়কর থেকে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ আয়কর বছর জুড়েই আদায় হয়ে যাচ্ছে। বড়জোর ১০ শতাংশ আয়কর আদায় হচ্ছে বছর শেষে ব্যক্তিশ্রেণির অন্যান্য আয়কর দাতাদের কাছ থেকে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন করদাতা তৈরির পাশাপাশি কর ফাঁকি রোধ করাটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করছেন, আয়কর আদায়ের দুর্বলতা কাটাতে না পারায় বেশি হারে অপ্রত্যক্ষভাবে কর নেওয়ার ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। শুধু বৈষম্যই নয়, খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে অর্থনীতির প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ অর্থ করের বাইরে, অর্থাৎ কালো টাকা। করের একটা বড় দর্শনই হলো সমাজের মধ্যে আয়-বৈষম্য কমানো। কিন্তু নাগরিকদের আয় বৈষম্যের সূচকে খুব একটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। সরকারের উচিত হবে অপ্রত্যক্ষ করের আপেক্ষিক মাত্রা ক্রমাগত কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আপেক্ষিক মাত্রা ক্রমাগত বাড়ানো। পাশাপাশি যারা কর দিচ্ছেন, তাদের রিটার্ন দাখিল করা থেকে আয়কর জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে আরও সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা যায় সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। তবে, আশার কথা হলো সাধারণ মানুষ যে আসলে কর দিতে চায় তার দৃষ্টান্তও দেখা যাচ্ছে। ২০১০ সালে প্রথম আয়কর মেলায় ৬০ হাজার ৫১২ জন সেবা নিতে আসেন। আর গত বছরের আয়কর মেলায় সেবা গ্রহীতার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৬ জন। ফলে আশা করা যায়, আয় বৈষম্য কমাতে পারলে আয়কর দাতার সংখ্যা আরও বাড়বে।
