দূরত্ব ঘুচেছে হাতের মোবাইলে, অন্ধকার উবেছে বিদ্যুতের ঝলকানিতে। তারপর পৃথিবীটা হয়ে গেছে কম্পিউটারময়। প্রযুক্তি বিকাশের এসব সংযোজন বেশ পুরনো। এর বাইরে গত কয়েক বছরে এমন কিছু প্রযুক্তি এই গ্রহবাসী দেখেছে, যা মানুষের জীবনকে নিয়ে গেছে আরেকধাপ ওপরে। চোখ রাখা যাক এবার এক দশকের এই পরিবর্তনে–
বায়োনিক যুগ
২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিনে হাগ হারকে বায়োনিক যুগের নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মেধাবী এই পর্বতারোহী দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে নিজেই নিজের জন্য কৃত্রিম পা তৈরি করে ফেলেন। নিজে প্রযুক্তিবিদ হওয়ায় এ কাজটি তার জন্য সহজ হয়।
হারের এ আবিষ্কার লাখ লাখ অঙ্গহীন মানুষের জীবনের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। রোবোটিং প্রযুক্তির কল্যাণে কৃত্রিম অঙ্গের প্রসঙ্গ এখন স্বপ্নের মতো মনে হতে পারে আদিকালের মানুষের কাছে।
আগেকার দিনে কৃত্রিম অঙ্গ মানেই ছিল ধাতব পদার্থের তৈরি। যা শিশুদের ব্যবহার উপযোগী ছিল না। এ ধারণার পরিবর্তন করে বায়োনিক প্রযুক্তি। ২০১৪ সালে একটি ব্রিটিশ কোম্পানি শিশুদের জন্য বিশেষ কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করে আলোচনায় আসে। তাদের অঙ্গের দাম যেমন কম, তেমনি ব্যবহার করাও সহজ।
কৃত্রিম অঙ্গে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে অনুভূতির ছোঁয়া। এখন কৃত্রিম অঙ্গে কেউ স্পর্শ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বুঝতে পারেন। সামনের ১০ বছরে এ প্রযুক্তিতে আসবে আরও চমক।
নিরাপত্তা
প্রযুক্তি মানুষকে অনিরাপদ করে তুলেছে এ কথা শুনতে শুনতে অনেকেই ক্লান্ত। এর বিপরীতে একটা সত্য আছে; এ প্রযুক্তিই মানুষের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে উন্নত করেছে। যেটা কয়েক দশক আগেও সম্ভব ছিল না।
SmartSafe’র মতো অ্যাপ দিয়ে এখন অনলাইন অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন কোনো বিষয় নয়। অনলাইনে কে বারবার ফোন করছে, কে হ্যাক করার চেষ্টা করছে সব এ অ্যাপ দিয়ে জানা যায়। ব্যবহারকারীরা এটি দিয়ে ফোনকল রেকর্ড, ছবির তথ্য সংগ্রহ, নোট লেখা এমনকি ভয়েস রেকর্ড করে রাখতে পারেন।
এখনকার দিনে বাংলাদেশের মতো অঞ্চলেও চলে এসেছে জরুরি ফোন নম্বরের সুবিধা। অনেক মানুষ আজকাল ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে কয়েক মিনিটের ভেতর পুলিশের সাহায্য নিতে পারছেন। পুলিশ আগে যে সাহায্য করত না, ব্যাপারটি তেমন নয়। জরুরি নম্বরের কারণে কাজে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা এসেছে।
তৃতীয়পক্ষ হয়ে থানায় ফোন যাওয়ার কারণে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কারণ তারা ব্যবস্থা না নিলে সেটি ৯৯৯-এর কাছে নোট করা থাকে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্য ভোডাফোন ফাউন্ডেশন নিজস্ব একটি অ্যাপ চালু করেছে, যেটি দিয়ে এক ক্লিকে পুলিশের সাহায্য নেওয়া যায়। আপনি বিপদে পড়লে জরুরি নম্বরে ফোন গেলেই হলো, তারা দ্রুততম সময়ে আপনার অবস্থান বের করে পৌঁছে যাবে।
২০০৭ সালে কেনিয়ার একদল কিশোরী i-Cut নামে একটি অ্যাপ তৈরি করে, যেটি দিয়ে পুলিশ এবং চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া যায়। দেশটিতে এই দুটি সেবা বেশ নাজুক। প্রযুক্তির কল্যাণে সেখানে দৃশ্যপটে এসেছে আমূল পরিবর্তন।
শরণার্থী শিবিরে আশার আলো
মা-মাটি-দেশ হারিয়ে যারা ভিনরাজ্যে ঠাঁই নিয়েছেন তাদের জীবনকে কল্পনাতীত উন্নত করেছে প্রযুক্তি। ২০১৬ সালের দিকে ফ্রান্সের ‘ক্ল্যাসিক জাঙ্গল’ শরণার্থী শিবিরে ওয়াইফাই প্রযুক্তি দিয়ে সেখানকার মানুষ উপকৃত হন। ক্যাম্প থেকে তারা ভিনদেশি ভাষা শিখেছেন, চাকরি খুঁজেছেন, মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ফ্রান্সের মতো এ দৃশ্য পৃথিবীবাসী দেখেছে জার্মানিতেও।
ছোট্ট একটি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে শরণার্থীদের জীবনকে চোখের পলকে পাল্টে দিয়েছে ওই ভোডাফোন ফাউন্ডেশন। গ্রিসে তারা তাৎক্ষণিক চার্জার তৈরি করে। চার্জের এমন একটি উৎস তারা তৈরি করে যা দিয়ে দ্রুত একসঙ্গে ৬৬টি ফোন চার্জ দেওয়া যায়। তুর্কি এবং উত্তর আমেরিকা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে জীবন বাঁচানো মানুষের জন্য এটি ছিল দারুণ স্বস্তির বিষয়।
এই একই ফাউন্ডেশন ক্লাসরুম প্রযুক্তি তৈরি করে উদ্বাস্তু কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট সিনেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু কেনিয়ার দাদাব অঞ্চলে ৬০ হাজার তরুণ শরণার্থী লেখাপড়া শিখেছে।
দুর্যোগের সঙ্গী
জরুরি নম্বরের প্রচলন শুরু হওয়ার পাশাপাশি এই দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা আরও সহজ হয়েছে।
এয়ারোস্পেস প্রযুক্তি অর্থাৎ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও তাকে ঘিরে থাকা মহাকাশ নিয়ে কাজ করে বিজ্ঞানের যে ধারা, সেটিকে কীভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে ২০১২ সালের দিকে নতুন করে নানা ভাবনাচিন্তা শুরু হয়। চিরাচরিতভাবে এয়ারোস্পেস প্রযুক্তির ব্যবহার মূলত প্রতিরক্ষা শিল্পেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বড় বড় বিপর্যয়ের সময়ও এ প্রযুক্তি ভীষণ কাজে আসছে।
দুর্যোগের কবলে পড়া মানুষকে রক্ষা করছে রোবট প্রযুক্তি। হারিকেন ক্যাটরিনা মেক্সিকো উপসাগর উপকূলে আঘাত হানার দুদিন বাদে ওই এলাকায় রোবট প্রেরণ করা হয়। রোবটগুলো আক্রান্ত ব্যক্তি এবং উদ্ধারকারীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সিএনএন জানিয়েছে, বর্তমানে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বেড়েছে। এর ফলে দুর্যোগের সময় জানমালের নিরাপত্তা এবং সার্বিক অবস্থার উন্নয়নের মতো শ্রমসাধ্য ব্যাপার বেশ সহজ হয়েছে।
চোরাকারবারি প্রতিরোধ
মানুষের সম্পদ রক্ষার প্রযুক্তি নতুন কিছু নয়। কিন্তু আমাদের ইকোসিস্টেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বন্যপ্রাণীদের রক্ষা করতে আগে তেমন প্রযুক্তি ছিল না।
এখন ড্রোন দিয়ে সেটি করা হচ্ছে। রাতের বেলায় ছবি কিংবা ভিডিও করতে সক্ষম এমন ড্রোন দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বনে নজরদারি করা হয়, যাতে বিরল প্রাণীদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অপরাধীরা হত্যা করতে না পারে।
ঘরে ঘরে মিডিয়া
গত এক দশকে সংবাদমাধ্যমের সংজ্ঞায় এসেছে অন্যতম বড় পরিবর্তন। এখন মানুষ সমস্যার কথা জানাতে আগের মতো পত্রিকা কিংবা টিভি অফিসে ধরনা দেন না। এলাকায় কোনো রাস্তা নষ্ট হলে কিংবা অনিয়ম চোখে পড়লে শুরু হয়ে যায় ফেইসবুক লাইভ। কোনো কোনোটি ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। চলে আসে সমাধান।
সহজলভ্যতায় চমক
গত দশকে অনেক দামি প্রযুক্তিপণ্য মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়েছে। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত যানবাহন এসেছে মানুষের হাতের নাগালে। ট্যাবলেটের মালিকানা পাওয়া ২০১০ সালে যেখানে ৩ শতাংশ মানুষের জন্য সহজলভ্য ছিল, তা ২০১৬-তে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ শতাংশে!
