সড়ক আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মামলা তুলে নিন

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:৩৪ পিএম

প্রায় প্রতিদিন সড়কে, মহাসড়কে যানবাহনের বেপরোয়া চালনায় মৃত্যু ঘটছে নিয়মিত মানুষের নর-নারী-শিশু নির্বিশেষে। দৈনিক পত্রিকাগুলো সেসব শোকাবহ খবর ধরে রাখছে। ‘খবর’ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। আমরা সে খবর পড়ে দুঃখিত হই। কিন্তু এর নেপথ্য ভয়াবহতা নিয়ে কমই ভাবি। মনে হয় না, এক বা একাধিক মানুষের জন্য একটি পরিবারের অন্তহীন অপেক্ষার কথা, তাদের অর্থনৈতিক সর্বনাশের কথা।

এমন ঘটনাও কম নয় যে, একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি বাসচালকের দুর্বৃত্তপনায় প্রাণ দিলেন, সেই চালকের প্রায়শ কোনো গুরুতর শাস্তি হয় না, কিন্তু ওই পরিবার জীবনভর ভিক্ষাবৃত্তির শিকার হলো, কে তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে, দিয়েছে কি এ পর্যন্ত? কেউবা কোনো সংস্থা ভেবে দেখেছে, কীভাবে চলবে পরিবারটি? আহারে, না অনাহারে?

এ তো গেল একদিক। অন্যদিকে, যে শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, শিক্ষাজীবন শেষ করে পরিবারটিকে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল করে তুলবে, অনিরাপদ সড়কে বেপরোয়া বাসের চাপায় তার মৃত্যু শুধু তার স্বপ্নের মৃত্যু ঘটায় না, পুরো পরিবারটিকে স্বপ্নহীন, প্রাণহীন করে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। যেমন দিয়েছিল ২০১৮ সালে ২৯ জুলাই জাবালে নূরের বাসটি শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী রাজীবকে পিষে মেরে, তার গোটা পরিবারকে। পারিবারিক ঘটনা তাই বলে। সেই দিন বাসচাপায় মৃত্যু হয় ওই কলেজের আরেক শিক্ষার্থীর।

শোকাবহ মৃত্যুতে কাতর হয়ে রাজপথে নেমেছিল ওদের সহপাঠী ও অন্য শিক্ষার্থীরা। নেমেছিল আরও অনেক শিক্ষার্থী। কারণ জাবালে নূরের বাসের মতো ঘাতক বাস ও যানবাহনের সংখ্যা কম ছিল না, অসহায় মৃত্যুর সংখ্যাও কম ছিল না, এমনকি শিক্ষার্থীদেরও।

আর এসব নির্মম, নিষ্ঠুর মৃত্যু নিয়ে প্রতিবাদ কম হয়নি, লেখালেখি কম হয়নি, মানববন্ধন বা পথসমাবেশও কম হয়নি। কিন্তু ঘাতক বাসচালক বেপরোয়া, তার লোভী মালিক নির্বিকার। নির্বিকার বাসমালিক সমিতি নামক সিন্ডিকেট। প্রবল প্রতাপশালী তারা, অর্থবিত্তে এতই ক্ষমতাবান যে, তারা নিয়মকানুনের ধার ধারে না, সরকারকেও কেয়ার করে না।

তারা তাদের রীতিনীতি চালু রেখে, বাসচালকদের ইচ্ছামতো চুক্তিতে কাজে লাগিয়ে তাদের মুনাফাবাজির স্বার্থসিদ্ধি করেছে, কারোর প্রাণহানির তোয়াক্কা করেনি। বাসচালক ও তার সহযোগী তথাকথিত ‘হেলপাররা অনুরূপ বেপরোয়া যায় প্রাণ যাক। স্বনামখ্যাত ইলিয়াস কাঞ্চনের মতো কারও প্রতিবাদেই কিছু হয়নি।

দুই. তাই রাজীব-দিয়ার নির্মম মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে রাজপথে নেমে যাতায়াত অচল করে কি কোনো ভুল করেছিল, না অপরাধ করেছিল? তারা যে অন্যায় করেনি, অপরাধ করেনি, তার বড় প্রমাণ তাদের আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের। তারা কোনো ধরনের সহিংস আচরণ করেনি।

তারা চেয়েছে রাজীব-দিয়া হত্যার ন্যায়বিচার, অপরাধীদের শাস্তি। সর্বোপরি নিরাপদ সড়ক যাত্রা, যাতে বাসচালকের বেপরোয়া বেহিসেবী চালনার মাশুল গুনতে আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়। রাজপথে, সড়কে, মহাসড়কে যানবাহন চালনায় নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আবারও বলছি, ওরা অপরাধ করেনি ভবিষ্যতের আরও অন্যায় মৃত্যু ঠেকাতে আন্দোলনে নেমে, তার অন্যদিককার প্রমাণ এ আন্দোলনে শুধু শিক্ষার্থী শ্রেণি সাড়া দিয়েছিল, সক্রিয় হয়ে উঠেছিল তা-ই নয়, পুরো দেশবাসী তাদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। এ আন্দোলন শিক্ষার্থীদের হলেও পরোক্ষে ছিল গণ-আন্দোলন।

দুর্বোধ্য কারণে নিহত শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতার এই আন্দোলন হামলার শিকার হয় অচেনা দুর্বৃত্তদের দ্বারা। অন্যদিকে চলে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা তরুণ শিক্ষার্থীদের প্রতি। রুজু হয় অকরুণ সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কচিকাঁচা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা। মামলা মানেই হয়রানি। এসবে অনভ্যস্ত ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দিনের পর দিন হয়রানি।

একে তো মামলা। এরপর নিয়মিত আদালতে হাজিরা এক বছরের বেশি সময় ধরে। ফলে ওই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন বিপর্যস্ত। অথচ ইতিমধ্যে ওই ঘটনার তথা রাজীব-দিয়া হত্যা মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞ আদালত অনেক সময় নিয়ে, অনেক হিসাব-নিকাশ করে তাদের রায় ঘোষণা করেছেন। শাস্তি হয়েছে অপরাধী চালকদের।

তিন. মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য : আদালতের রায়ে যখন সড়ক অনিরাপদ করা, মৃত্যুকূপে পরিণত করার অপরাধ প্রতিপন্ন হলো, অপরাধীদের শাস্তি হলো, তখন এতে এটাই প্রতিপন্ন হয় যে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন ভুল ছিল না, অন্যায় ছিল না, তাতে কোনো অপরাধ ছিল না।

তাহলে শিক্ষার্থীদের মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে, তাদের শিক্ষার্থী জীবন স্বাভাবিক করতে, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের মামলা তুলে নিতে অসুবিধা কোথায়, বিশেষ করে ঘাতকদের বিরুদ্ধে রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে। তাতে শিক্ষার্থীদের প্রতি অভিভাবক হিসেবে সরকারের সহানুভূতিরও প্রকাশ ঘটবে।

এ প্রসঙ্গে পুরো ঘটনার আরও একটি দিক বিবেচনার দাবি রাখে। শিক্ষার্থীদের যেমন দাবি ছিল, ঘাতক বাসচালকদের চরম শাস্তি, তেমনি এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল সড়কযাত্রা নিরাপদ করতে, মৃত্যুহীন করতে নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন ও প্রবর্তন। তাদের এ দাবি আরও অনেকের মতো যে ন্যায়সংগত ছিল তার প্রমাণ, রাজীব-দিয়ার মৃত্যুর পরও, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরও বেপরোয়া বাস চালনার অন্যায়ে সড়কে-মহাসড়কে অনেক প্রাণ ঝরেছে।স

আবারও হয়েছে প্রতিবাদ, মানববন্ধন, সরকারের সমালোচনা, বাসমালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। অন্যায় মৃত্যুর সেই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করেই সম্ভবত সংসদে বিষয়টি নিয়ে উত্তাপ, উত্তেজনা, শেষ পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন, বিতর্ক এবং শেষ পর্যন্ত সে আইন পাস এবং তার প্রয়োগও দেখা গেল

যদি বলা যায় সরকার প্রণীত ‘নিরাপদ সড়ক আইন-২০১৮’ গত বছরের জুলাইয়ে সংঘটিত ছাত্রছাত্রীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের পরিণাম, তাহলে কি খুব একটা ভুল বলা হবে? কারণ এর আরও আগেও অনেক মৃত্যু, কিছুসংখ্যক নামি ব্যক্তিত্বের মৃত্যু উপলক্ষে নিরাপদ সড়ক আইনপ্রণয়নের দাবি উঠেছে, কিন্তু আইন প্রণীত হয়নি।

বিষয়টি নিয়ে অনেক কাটাছেঁড়া, অনেক বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে, পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে এমন আভাস-ইঙ্গিত মিলেছে যে, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের দাপটে সুষ্ঠু নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়ন সম্ভব হয়নি, মূলত তা প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতার সম্ভাব্য কারণে। একদা স্বৈরশাসক এরশাদও কঠোর সড়ক আইনপ্রণয়ন করে প্রবল বাধার মুখে তা প্রচলন করতে পারেননি।

তাই এমন ভাবনা যুক্তিহীন নয় যে, বর্তমান ‘নিরাপদ সড়ক আইন’ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুফল এবং ওদের আন্দোলনকে শিখণ্ডিরূপে দাঁড় করিয়ে, নিহত দুই শিক্ষার্থীর মামলার রায় সামনে রেখে সরকারের পক্ষে আইন প্রচলন সহজ হয়েছে। তবু এর বিরুদ্ধে হয়েছে পরিবহন খাতে ধর্মঘট মালিক ও পরিবহন শ্রমিকদের। দেশব্যাপী অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারকে আইন সংস্কারে আশ্বাস তথা ছাড় দিতে হয়েছে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে। সবই যদি ঠিকঠাক মতো হলো, তাহলে যাদের আন্দোলনের সুবাদে হলো, তাদের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়াটাই তো যুক্তিসংগত পদক্ষেপ।

এ প্রসঙ্গেই যেকোনো যুক্তিবাদী মানুষ প্রশ্ন করতে পারেন, হেলমেট পরা যে সন্ত্রাসীরা ছাত্রছাত্রীদের ওপর রাজপথে হামলা চালিয়েছিল, সেই হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দেয়নি কেন? এটা কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে ন্যায়সংগত ও সদাচারের লক্ষণ? গ্রেপ্তার দূরে থাক, সেই দুর্বৃত্তদের পুলিশ-সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে, যুক্তি কি তা সমর্থন করে?

আবারও শেষ কথা, যুক্তির কথা ঘটনা সমাপনের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে মামলা তুলে নেওয়া হোক, যাতে হয়রানি থেকে মুক্ত হয়ে তারা মানসিক শান্তিতে তাদের শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।

লেখক

ভাষাসংগ্রামী, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত