মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ অতিক্রম করার খবর আগেই দিয়েছিল সরকার। গত মার্চে প্রাথমিক হিসাব শেষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্জনের কথা জানায়, চ‚ড়ান্ত হিসাব শেষে তা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তাদের হিসাবে, গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত অর্থবছর শেষে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলনকক্ষে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
তবে জিডিপির ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের তথ্য মানতে নারাজ অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, হিসাবে অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। দেশের অর্থনীতির চেহারা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান ও বেসামাল খেলাপি ঋণের দিকে তাকালে এত বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে মনে হয় না।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর শেষে মোট দেশজ আয় (জিএনআই) দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯২ কোটি টাকা। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়লেও মাথাপিছু আয় আগের মতো ১৯০৯ ডলারই রয়ে গেছে। তবে টাকার অংকে মাথাপিছু আয় ৩৮০ টাকা বেড়ে হয়েছে এক লাখ ৬০ হাজার ৪৪০ টাকা। মূলত, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে টাকার অংকে মাথাপিছু আয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছর স্থিরমূল্যে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ১২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ছাপিয়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সেবা খাতে গত অর্থবছর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিত ৭৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সংশয় সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থনীতিবিদ ও কিছু ব্যক্তি দেশের অগ্রগতির অনেক বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। এর আগে বড় অংকের বাজেট নিয়ে সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) নানা ধরনের মন্তব্য করেছে। ওইসব বাজেট উচ্চাভিলাষী, বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলেও তারা দাবি করেছিল। কিন্তু আমরা সেই বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। এখন তারা বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এভাবে তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বক্তব্যও পাল্টায়।’ তিনি বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব করে একমাত্র বিবিএস, অন্য কোনো সংস্থা নেই। এজন্য বিবিএস যেটা বলে সেটাই ঠিক। এখন যারা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তারাও এক সময় এই বিষয়টি মেনে নেবেন। এই প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী অনেক খুশি। আমরাও খুশি। কে বির্তক তুলল, সেটা পরের বিষয়।’
জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিবিএস যে প্রাথমিক হিসাব দিয়েছিল, চ‚ড়ান্ত হিসাবে খুব বেশি পরির্বতন নেই। তবে চ‚ড়ান্ত হিসাবে সরকারি বিনিয়োগের চেয়ে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক হিসাবে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ দেখানো হয়েছিল ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ, চ‚ড়ান্ত হিসাবে যা বেড়ে হয়েছে ২৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এর মানে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ বেড়েছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের হিসাবের সঙ্গে এটি মেলে না। কারণ ওই সময়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণপ্রবাহ কমেছে। তাহলে কীভাবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ল? এ রকম অনেক বিষয়ে অসংগতি রয়েই গেছে। জিডিপি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার যে মিল কম, সেটা আগেও বলা হয়েছে। বিবিএসের উচিত এসব বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া।’
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেশে অর্থনীতির যে চাঙ্গাভাব থাকার কথা, বাংলাদেশে তা দেখা যাচ্ছে না। জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর্মসংস্থানও নেই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহেও ধীরগতি। এ অবস্থায় ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হলো, তা নিয়ে আমাদেরও সংশয় আছে। অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের দিকে তাকালে এত বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়ার চিত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, ‘বিবিএস স্থিরমূল্যে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো শিল্প খাত খুবই ভালো করছে এবং সাড়ে পাঁচ বছরে ব্যবসা দ্বিগুণ হচ্ছে। তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ার কথা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার কথা, জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয়ও বাড়ার কথা। কিন্তু তা বাড়ছে না। প্রায় ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে শিল্প মালিকদের ঋণখেলাপি হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ছেই।’
গত ৩ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে ‘সুতা কাটা ঘুড়ির মতো’ মন্তব্য করে বলেন, ‘কাটা সুতার সঙ্গে যেমন ঘুড়ির সম্পর্ক থাকে না, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে না।’
