১৯৬৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী আলফ্রেড কাস্টলার একসময় জার্মান ভাষায় কবিতা লিখতেন। কাস্টলারের গবেষণার ক্ষেত্র অপটিক্যাল স্পেকট্রোস্কোপি, বিশেষ করে অ্যাটমিক ফ্লyরোসেন্স। পারমাণবিক আলো কল্যাণে না লাগিয়ে তা যে হত্যাযজ্ঞে ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি জোর দিয়ে তাই বলেছেন। চোখের আলোয় যেমনই দেখেছেন, অন্তরের আলোয় দেখেছেন মানুষের মর্মমূলের যাতনা, সংকটে মানুষের নৈর্ব্যক্তিক নিস্পৃহতার নিন্দা করেছেন, সংকটের শািন্তপূর্ণ সমাধান চেয়েছেন আলফ্রেড কাস্টলার।
তিনি প্রশ্ন করেছেন খবরটি কেমন করে সবার দৃষ্টি এড়িয়ে গেল যে ক’দিনের মধ্যে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটবে। এখনই যদি ব্যাপক খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে আগামী কয়েক মাসে তিন থেকে পাঁচ লাখ কিংবা তারও বেশিসংখ্যক শিশু মারা যাবে। এটা কী করে সম্ভব যে এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে পড়বে না। আমরা সম্পূর্ণ নির্বিকার থাকব, আমরা এই শিশুদের যন্ত্রণা কিছুমাত্র অনুভব করব না। আমরা এই শিশুদের মায়েদের হতাশার মুখোমুখি বিবেকহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব? মানবতা যদি নির্বিকারভাবে এই ট্র্যাজেডির কেবল সাক্ষী হয়েই থাকে, তাহলে নিজ থেকে এর ধ্বংসের সময় কি এখনো আসেনি?
তিনি লিখেন : পৃথিবীর জন্য হিরোশিমা ছিল ভয়াবহ একটি আঘাত। মুহূর্তের মধ্যে শত-সহস্র মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল। এই আঘাত আমাদের বিবেক জাগাল, আমাদের সচেতন করে জানিয়ে দিল, আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলো জীবন রক্ষার সাফল্য দেখার আগেই মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ আমাদের শিক্ষা ছিল, আমাদের বিপরীত দিকে যাদের অবস্থান, তারা আমাদের শত্রু হলেও আমাদের মতোই মানুষ।
যে সময় হিরোশিমার ঘটনা ঘটেছে, সে সময় এ ধরনের ট্র্যাজেডির ব্যাপকতা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। হিরোশিমা ট্র্যাজেডির যারা শিকার, তাদের মধ্যে তারাই ভাগ্যবান, যারা মৃত্যুবরণের বিষয়টি বুঝেই উঠতে পারেনি। ভিয়েতনামের নাপাম বোমার আগুনের নিচে ড্রেসডেনের শত-সহস্র মানুষ যে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছে, সেই ট্র্যাজেডি ছিল আরও বেশি ভয়ংকর। সপ্তাহের পর সপ্তাহ লাখ লাখ নারী-পুরুষ-শিশু নাৎসি হত্যাযজ্ঞের সময় যেভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনেছে, তা কি আরও ভয়াবহ ছিল না?
ইন্দোনেশিয়ার আবু হানিফা লিখেছেন, যদিও সে দেশের সংবিধানে ইসলামকে গুরুত্ব দিয়ে পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক স্টেট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, নিজ দেশের মানুষের প্রতি তাদের যে আচরণ ও মনোভাব, তাতে ইসলামের লেশমাত্র ছোঁয়া নেই। ফলে এই নেতারা আমাদের এমন একটা ধারণা দেন যেন, ইসলামকে তারা কেবলমাত্র অলংকারের মতো ধারণ করে আছেন। রাজনীতি সম্পর্কে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অজ্ঞতা পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলি ভুট্টোর সঙ্গে তার ষড়যন্ত্র ও পাঞ্জাবি জেনারেলদের নির্যাতন ও নিপীড়ন পূর্ব পাকিস্তানকে একটি রক্তাক্ত ভূ-খণ্ডে পরিণত করেছে।
ফরাসি দার্শনিক অঁাদ্রে মালরো প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে চিঠি লিখেছেন, ‘যখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী অর্থাৎ আপনার সেনাবাহিনী ভিয়েতনামের নগ্নপদ যোদ্ধাদের পরাস্ত করতে ব্যর্থ হলো, আপনি কেমন করে বিশ্বাস করেন স্বাধীনতার জন্য উদ্বেল একটি দেশকে এক হাজার ২০০ মাইল দূর থেকে ইসলামাবাদ এসে পুনরুদ্ধার করতে পারবে? পৃথিবীর নিয়তি অনিশ্চিত, বঙ্গোপসাগরে রণতরী পাঠানো কোনো নীতি হতে পারে না। হতে পারে কেবলই অতীতের ধ্বংসস্ত‚প।
ক্লদ মস বললেন, ‘আমরা যদি এই এক কোটি মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুকে মেনে নিতে পারি, তাহলে গ্যাস চেম্বারে নিহত এক কোটি মানুষের মৃত্যুকেও মেনে নিতে পারব।’ এই এক কোটি মানুষ হচ্ছে শরণার্থী শিবিরের ভাগ্য বিড়ম্বিত এক কোটি মানুষ। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, হোর্হে লুই বোর্হেসসহ আর্জেন্টিনার বুদ্ধিজীবীরা পূর্ববাংলার শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ-সহায়তাসহ তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আর্জেন্টিনার সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
একাত্তরের উন্মাতাল বাংলাদেশে এসে শরণার্থী শিবির থেকে ব্যথিত অ্যালেন গিন্সবার্গ লেখেন, ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামের স্মরণীয় কবিতা। খান মোহাম্মদ ফারাবীর অনুবাদে দু’টি অনুচ্ছেদ :
শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল,
যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল।
কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে,
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে।
ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ি দেশ,
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালরাত কবে হবে শেষ।
শত শত মুখ হায় একাত্তর যশোর রোড যে কত কথা বলে,
এত মরা মুখ আধমরা পায়ে পূর্ব বাংলা কোলকাতা চলে।
শিল্পী জোয়ান বায়েজ লিখলেন এবং গাইলেন,
বাংলাদেশ, বাংলাদেশ
হোয়েন দ্য সান সিঙ্কস ইন দ্য ওয়েস্ট
ডাই এ মিলিয়ন পিপল অব বাংলাদেশ।
চিলির বিবেকবান মানুষ তো অনেক আগেই বলেছেন, মাইলাইতে শত মৃত্যু বিশ্ববিবেক নাড়িয়ে দিয়েছিল, স্বাধীন সংবাদপত্র ও বেতার মাধ্যমের সংবাদ যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ সংকটের সূচনা করেছিল। তিন লক্ষ-ই হোক কি বিশ হাজার মৃতদেহ (সংখ্যায় হেরফের হতে পারে কিন্তু ঘটনা তো একই) পূর্ববাংলায় শহরের রাস্তায় কেন বিশ্ববিবেককে নাড়া দিচ্ছে না– এসবের ধারণ করা চলচ্চিত্র ও পুরনো ঘটনার রেকর্ড তাদের কাছে নেই, তাই!
সুইজারল্যান্ডের বিবেক প্রশ্ন রাখল : গাঙ্গেয় উপত্যকায় যা ঘটছে তাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিতে গণযুদ্ধ নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের ষড়যন্ত্রে নির্দেশিত পাশবিক ও রক্তাক্ত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রক্রিয়া বলা যায়। ইসলামাবাদ বারবার জোর দিয়ে বলছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে– কিন্তু আমরা যে খবর পাচ্ছি তা পাকিস্তানি দাবির ঠিক উল্টো। সেখানকার অবস্থা আসলে শোচনীয়। শহর ও গ্রাম ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে আর অর্থনৈতিক জীবনে নেমে এসেছে পুরোপুরি স্থবিরতা।
এখানে এসেই বাংলার ট্রাজেডি কলঙ্কে রূপান্তরিত হয়। বৃহৎ শক্তিগুলোর কেউ কি একটি আঙুল উঁচিয়ে বাঙালিরা যে নির্মমতার শিকার তা বন্ধ করার জন্য পাকিস্তানকে বলতে পারল না?
সাদা মানুষ হোমার জ্যাক বললেন : যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ এবং বিশ্ব পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে নিরুদ্বেগ কেন? আমেরিকানদের নিরুদ্বেগ হওয়ার কারণ কি এটাই যে, মুসলমানরা মুসলমানদের হত্যা করছে, তা ছাড়া এতে তো আর সাদা, আমেরিকান জড়িয়ে নেই? নাকি আদর্শগত কোনো বিষয় নেই– এর সঙ্গে অন্তত কমিউনিজম তো নেই-ই? নাকি তারা নিরুদ্বেগ এ কারণে যে খুব সহজেই পূর্ব পাকিস্তানকে দ্বিতীয় ভিয়েতনামে পরিণত করা যাবে।
মাদার তেরেসা আহ্বান জানালেন, আসুন আমরা স্মরণ রাখি : পাকিস্তানের মানুষ, ভারতের মানুষ, ভিয়েতনামের মানুষ, যেখানকারই হোক, সব মানুষই স্রষ্টার সন্তান, সবাই তৈরি হয়েছে একই হাতে। এ সমস্যা শুধু ভারতের নয়, গোটা পৃথিবীর। এ বোঝা পৃথিবীরই বহন করা উচিত। প্রশ্নের জবাবও দেওয়া উচিত পৃথিবীরই।
