বিজয় দিবস উপলক্ষে আমাদের মধ্যে চলে উৎসবের আমেজ। বিশেষ সাজ-পোশাকের আয়োজন। তা ছাড়া জাতীয় চেতনাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দিবসভিত্তিক পোশাক পরা একটি ট্রেন্ড। এই ধরা অব্যাহত রেখে এক দশক ধরে আন্তরিকতার সঙ্গে করে যাচ্ছে আমাদের দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো। মূলত ক্রেতার চাহিদাকে মাথায় রেখে তাদের এই আয়োজন হলেও এগুলো জীবনাচরণে এমন পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আমাদের জাতীয় জীবনে বইছে নতুন এক ধারা।
বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করতে চাই নতুন পোশাক। আর দিবসভিত্তিক পোশাকের ব্যাপারটা আমাদের সংস্কৃতিতে আনেন এ দেশের ফ্যাশন ডিজাইনাররা। বোদ্ধারাও মনে করেন, দিবসভিত্তিক পোশাকের ধারাটা চালু থাকা জরুরি। এতে ফ্যাশনের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ ঘটার পাশাপাশি স্বাধীনতা লাল-সবুজ বসন অঙ্গে জড়ানো হবে। বিজয় দিবস আনন্দের দিন, তাই আমরা পোশাকের মধ্যে সেই আনন্দভাবটা তুলে ধরতে পারি। লাল-সবুজ যেহেতু আমাদের জাতীয় পতাকার রং, তাই পোশাকে এই দুটি রঙের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে আনন্দের রং সৃষ্টি হয়েছে। এভাবেই স্বাধীনতার রঙে সেজেছে এ দেশের ফ্যাশন হাউজগুলো।
দিবসের তাৎপর্য অনুযায়ী নিজেকে উপস্থাপনে মনোযোগী মানুষের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। ডিজাইনাররাও চেষ্টা করে যাচ্ছেন পোশাকের মানোন্নয়নের জন্য। মূলত পোশাকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছেন তারা। পাশাপাশি বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অঙ্গে ধারণ করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে চাইছেন তারা।
শাহীন আহম্মেদ
স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার, অঞ্জন’স
অঞ্জন’স নতুন প্রজন্মকে পোশাকের দিক থেকে করেছে স্বদেশমুখী। আমাদের ডিজাইনের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে দেশাত্মবোধের চেতনা। এবারের বিজয় দিবস উপলক্ষে লাল-সবুজের প্রত্যয়ে আবার সে চেষ্টাই অব্যাহত রেখেছি। মূলত ফ্যাশনের ধারা সময়কে ধারণ করে। স্টাইল, স্মার্টনেস, আউটলুকের সামগ্রিক কনসেপ্টে বৈচিত্র্য এলেও বিজয় দিবসের ফ্যাশনে দেশাত্মবোধের ভাবধারাটি প্রাধান্য পায়। এর সঙ্গে অন্যান্য উৎসবকেন্দ্রিক ফ্যাশন প্রবাহের রয়েছে এক বিরাট তফাত। তাই পোশাকে ডিজাইন, নকশা ও রঙে উঠে আসে বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় জন্মলাভের ইতিহাস। তাতে রয়েছে বাঙালির স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, মমতা এবং এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের প্রবল অনুরণন। যে অনুরণনের প্রতিটি পল-অনুপলে রয়েছে স্বাধীনচেতা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের মহিমান্বিত গৌরবগাথার মহত্তম স্বপ্ন বিকাশের স্ফুরণ। দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আর এই অর্জনের ভেতর দিয়েই অন্ধকার সরিয়ে সরিয়ে আজ বাঙালি পথ চলেছে বিজয়ের আলোয়। পোশাক অনুষঙ্গ হিসেবে ফ্যাশনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এই ফ্যাশন-স্টাইলে উৎসবের আমেজ থাকলেও তার চেয়ে বেশি থাকে দেশাত্মবোধ তথা দেশপ্রেম। '৭১ নিয়ে বাঙালির যেমন হৃদয় ছোঁয়া, মর্মস্পর্শী, আবেগঘন অনুভূতি রয়েছে; তেমনি রয়েছে অর্জনের আনন্দও। ফলে দুটি রূপেরই প্রতিফলন ঘটে ১৬ ডিসেম্বরের ফ্যাশন কনসেপ্টে। আর এই ফ্যাশনবোধের মর্মকথাটা চিত্র ও পঙ্ক্তির মাধ্যমে পোশাকে উৎকীর্ণ করার সফল প্রয়াসটা প্রতি বছরের এই বিশেষ দিনগুলোতে আমরা করে থাকি।
তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিবারের মতো অঞ্জন’স এবারও বিজয়ের পোশাক নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে। আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধকালীন পত্রিকার সংবাদের কোলাজ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দেয়াল চিত্র এবং আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আমাদের পতাকার রং লাল ও সবুজ পোশাক ডিজাইনে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শাড়ি, পাঞ্জাবি, মেয়েদের টপস, সালোয়ার-কামিজ এবং টি-শার্ট পাওয়া যাবে। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য থাকছে পাঞ্জাবি, শাড়ি, টি-শার্ট, ফ্রক ও সালোয়ার-কামিজ।
বাহার রহমান
স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার, নিত্যউপহার
বিজয়ের দিনটিতে বাঙালির চলনে-বলেনে, পোশাক-আশাকে দেশপ্রেমের প্রকাশ চোখে পড়ার মতো। ভাষা আন্দোলনের সময় পোশাক যেমন হয়ে ওঠে ভাষাশহীদদের প্রতি নীরব সম্মান জানানোর মাধ্যম, তেমনি ডিসেম্বরে লাল-সবুজ পোশাকের মাধ্যমে স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর সেনানীদের প্রতিও সম্মান জানানো হয়। এ ধরনের ঐতিহ্য আর ইতিহাসের কথা মনে রেখে পোশাক পরেন অনেকেই। যদিও শীত বলে ডিজাইনারদের নজর থাকে গরম কাপড়ের দিকে। কিন্তু তাই বলে তো বিজয় বাদ দিয়ে নয়। এ বছরেও সেটার ব্যতিক্রম হয়নি। লাল-সবুজের আঁচড়ে সাজানো পোশাকগুলো যেন এক-একটি বিজয়োৎসবের পতাকা। টি-শার্ট সব সময়ই তারুণ্যের এক ধরনের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ এমন শব্দগুলোর সঙ্গে এক ধরনের তারুণ্যের আকুলতা জড়িয়ে থাকে। আমরা সব সময়ই চেষ্টা করেছি টি-শার্টের মাধ্যমে সেই আকুলতা ছুঁয়ে যেতে। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধ ও তারুণ্য একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে দিন দিন, তাই পোশাক হিসেবে টি-শার্টের থিমগুলোতেও উঠে আসছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-সংগ্রামের মতো বিষয়। আমরা আমাদের টি-শার্টের থিমগুলোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক বিভিন্ন কবিতার পঙ্ক্তি মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের মতো আমাদের জাতীয় অহংকারগুলো। তরুণ প্রজন্ম সেসব সাদরে গ্রহণ করছে।
লিপি খন্দকার
স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার, বিবিয়ানা
বাংলাদেশের পোশাক সংস্কৃতিতে দিবসভিত্তিক ফ্যাশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ২১, ২৬ আর ১৬-এর মধ্যে আবার অন্য আবেগের উপলক্ষ। এই তিনটি দিবস আমাদের সাহিত্যে, শিল্পে যেমন প্রতিফলিত, তেমনি আমাদের পোশাকের নকশায়। ফলে আলাদা গুরুত্বেই ডিজাইনাররা এই তিন দিবস মাথায় রেখে পোশাকে নকশা করে থাকেন। এটা ডিসেম্বর, আমাদের বিজয়ের মাস। এ মাসেই বাংলাদেশ অর্জন করেছে সার্বভৌমত্ব। ফলে অনন্য এই অর্জনকে পোশাকে ধরে রাখার প্রয়াসের শুরু অন্তত দুই দশক আগে। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করে বিবিয়ানা। বিজয় দিবস উপলক্ষে বিজয়ের রঙে কাপড় ক্যানভাস রাঙিয়েছেন ডিজাইনাররা তাদের সৃজনশৈলীতে। ফ্যাশন হাউজগুলো এসব ডিজাইনে তৈরি বিজয় দিবস কালেকশন হাজির করেছে ভোক্তার কাছে। প্রতিবারের মতো এবারও বিবিয়ানার রয়েছে বিজয় দিবসের আয়োজন। মূলত লাল আর সবুজ দুটি রংই প্রাধান্য পেয়েছে। মোটিফ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের নানা বিষয়কে বেছে নিয়েছে। বিবিয়ানা সব সময়ের মতো এবারও ডিজাইন ভাবনায় দেশীয় ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েছে। এই হাউজের এবারের নকশার প্রেরণা হয়েছে, গুরুত্ব পেয়েছে জাতীয় পতাকার নকশায় শাড়ি। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ডাকটিকিট, কবিতা, ছবি, জাতীয় ফুল শাপলা ও স্মৃতিসৌধ। সঙ্গে বেছে নেওয়া হয়েছে বাংলা টাইপোগ্রাফি।
ফাহমিনা বিনতে ইব্রাহিম ও তাহসিন নাইমা
ডিজাইনার ও স্বত্বাধিকারী, রঙবতী
ডিসেম্বর বাঙালির স্বাধীনতা ও বিজয়ের মাস। নিজের দেশ, ভাষা এবং সার্বভৌমত্ব। এ মাসের গুরুত্ব বাঙালির জীবনে অনেক বেশি। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের এ দিনটি নানাভাবে উদযাপন করবে বাঙালি জাতি। তবে বিজয় দিবস উদযাপনে প্রথম যে বিষয়টি এ সময় গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো_ পোশাক। তার সঙ্গে চাই মানানসই গহনা। জাতীয় চেতনাভিত্তিক পোশাক পরে বাঙালি দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। স্বদেশপ্রেমের এ চেতনা থেকে গহনার ডিজাইনাররাও ফ্যাশনে নিয়ে আসেন বিজয় ও দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ঘটায় এমন গহনা। রঙবতী বিজয় দিবস উপলক্ষে গহনার নকশা করেছেন পতাকা মোটিফটাকে প্রাধান্য দিয়ে। গলার হার এবং কানের দুল পতাকার ডিজাইনে করা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে লাল-সবুজ পলা। এখানেও পতাকাকে মোটিফ ধরে কাজ হয়েছে। বিজয়ের মাসে এই গহনা বাংলাদেশের পতাকাটাকে তুলে ধরবে। গহনাগুলোর জন্য মেটাল হিসেবে ইন্ডিয়ান রুপা বেছে নেওয়া হয়েছে। সঙ্গে থাকছে মুক্তা। বিশেষভাবে সূর্যমুখী ডিজাইনের কানের গলার সেট আছে, যেটা লাল-সবুজে করা।
