আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের অপমানজনক ব্যর্থতা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৩৩ এএম

একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ায়নি, মার্কিন জনগণ দাঁড়িয়েছে। খোদ ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তারাও পাশে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। এমনকি ২৫ মার্চেরও তিন সপ্তাহ আগে ঢাকায় কর্মরত আমেরিকান কনস্যুলার আর্চার ব্লাড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন : পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ঐক্যের সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি, দুই অংশের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ স্পষ্টতই শেষ হয়ে গেছে। হেনরি কিসিঞ্জারকে   লেখা জন সিসকোর গোপন চিঠিই বলে দিচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা তাদের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ।  স্বাধীন বাংলাদেশের যে আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে– এই সত্যটি মার্চের শুরুতেই আর্চার ব্লাডের টেলিগ্রাম ও জোসেফ সিসকোর চিঠিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

২ মার্চ ১৯৭১ আর্চার ব্লাড লিখেছেন : একটি সাধারণ ধর্মঘট পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী  ঢাকাকে আজ অচল করে দিয়েছে, এই ধর্মঘট আগামীকাল সারা দেশে পালিত হবে। ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদ অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে বাঙালিরা এর প্রতিবাদে হরতালে যোগ দেয়। ইয়াহিয়া আরও ক’ধাপ এগিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে নিযুক্ত গভর্নরকে সরিয়ে তার জায়গায় একজন সেনা জেনারেলকে বসিয়েছেন, প্রেস সেন্সরশিপ আরোপ করাসহ সামরিক আইনের বিধান আরও জোরদার করেছেন।

সাধারণ হরতালের জবাবে গভর্নর সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারি করেছেন। বিক্ষিপ্ত সহিংস সংঘর্ষের খবর আসছে। পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তীব্র ভাষায় জবাব দিয়েছেন। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইয়াহিয়ার এই অধিবেশন স্থগিতকরণের সিদ্ধান্তকে নিন্দা জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এটি পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন করার দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। তিনি বলেন, বাঙালিরা জানে কেমন করে রক্ত দিতে হয়, তবে আমরা আর বৃথা রক্ত দেব না।

৫ মার্চ ১৯৭১ কিসিঞ্জারকে আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট জোসেফ সিসকো লিখলেন : আমার গতকালের স্মারকে যতটা অনুমান করেছিলাম, আমাদের দূতাবাস বিশ্বাস করে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তার চেয়ে অনেক বেশি। পাকিস্তানকে ধরে রাখার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপকেই যদি একমাত্র পন্থা বিবেচনা করা হয়, তাহলে পাকিস্তান ভালোভাবেই তা প্রয়োগ করবে। দূতাবাস আমাদের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত যে, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি বাঙালিদের আন্দোলন দমাতে এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবহার করছে।

সিসকো আরও লিখলেন সব দিকে থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, মুজিব তার ৭ মার্চের ভাষণে পূর্ব পাকিস্তান কোনদিকে যাচ্ছে তা খোলাসা করবেন এবং তিনি যে ঘোষণা দেবেন তা প্রায় স্বাধীনতার ডাকের কাছাকাছি। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক সংবিধান, পৃথক সরকার, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য অনুরূপ ব্যবস্থা, এরপর উভয় অংশের মধ্যে একটি আলগা বাঁধন কমনওয়েলথ বা কনফেডারেশন ব্যবস্থার কথা বলবেন, যা এ পরিস্থিতিতে ভালো খাপ খায়। শেষ পর্যন্ত তা শািন্তপূর্ণ রাজনৈতিক ক্রািন্তকাল হবে, না বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত ঘটাবে তা নির্ভর করবে মুজিবুরের ঘোষণায় সামরিক আইন প্রশাসনের কী প্রতিক্রিয়া তার ওপর।

আমাদের স্বার্থ বিবেচনায় পূর্বাঞ্চলে কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে পাকিস্তান সরকারের নিজস্ব বিষয়ে আমাদের হস্তক্ষেপ করা সমীচীন হবে না। বাঙালিদের স্বাধীনতার আন্দোলন সামরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিহতের চেষ্টা করা হলে সহিংসতা ও রক্তপাত ঘটবে, তাতে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে।

১৫ মার্চ ১৯৭১ হেনরি কিসিঞ্জারকে জোসেফ সিসকো লিখেছেন, মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছেন। আজ ঢাকায় দিনের প্রথম ভাগে শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছেন, তার দল আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে (৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি অধিকার করে) পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার নিয়ে নিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইন প্রশাসন, যা এখনো পাকিস্তান সরকার, তার তোয়াক্কা না করেই মুজিব এককভাবে এ কাজটি করেছেন। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, মুজিবের ঘোষণার ৩৫টি নির্দেশনা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ হাতে তুলে নেওয়ার ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ।

এই পদক্ষেপ নিয়ে মুজিব সরাসরি ইয়াহিয়া সরকারের মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তবে তিনি সচেতনভাবে পূর্ব পাকিস্তানের নিঃশর্ত স্বাধীনতা ঘোষণা এড়িয়ে গেছেন এবং তার এ কাজের ভিত্তি যে গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণের গণতান্ত্রিক রায় তা উল্লেখ করেছেন।

ইয়াহিয়ার সামনে দুটি পথ। এর যেকোনোটি ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর হয়ে পড়া পাকিস্তানের ঐক্য আরও বিপদাপন্ন করে তুলবে। ইয়াহিয়া যদি মুজিবের এ পদক্ষেপ মেনে নেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তার সামরিক আইনের ক্ষমতা অন্তত পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাহৃত হয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানে তা বহাল রাখা দুরূহ হয়ে পড়বে (ভুট্টোর রবিবারের ভাষণ তা আরও স্পষ্ট করেছে)।

যদি ইয়াহিয়া কিংবা সামরিক বাহিনীর অন্যরা বলপ্রয়োগ করে মুজিবকে প্রতিহত করেন, পূর্ব পাকিস্তান হয়ে উঠবে সামরিক বাহিনী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের লড়াইয়ের রণক্ষেত্র। যার ফলে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলার আত্মপ্রকাশ ঘটবে।  স্টেট ডিপার্টমেন্টকে জানানো হয়, বেসামরিক সরকারের মুখোশের পেছনে সেনানীতি ও সেনা অপারেশন পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালি জনগণকে ক্রমবর্ধিত হারে এবং তীব্রভাবে বিচ্ছিন্ন  করে ফেলছে। ইয়াহিয়া খানের চোখে দেখা ক্রমবর্ধমান স্থিতিশীলতার মিথ এবং বাস্তবতার ফারাক এত বেশি যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো।

পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। যদিও সেখানে দাপ্তরিকভাবে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে–সামরিক হস্তক্ষেপ ও সামাজিক অস্থিরতায় প্রশাসন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। মুক্তিবাহিনীর হাতে সারা দেশে মার খাচ্ছে এমনকি শহর এলাকাতেও বিদ্রোহী মুক্তিবাহিনীর লাঞ্ছনা, সন্ত্রাস এবং নাশকতামূলক কাজ ঠেকাতে সরকারি বাহিনী ব্যর্থ হয়েছে।

যুদ্ধের ভীতি ঠেকাতে প্রয়োজন পূর্ব পাকিস্তানে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান এবং শরণার্থীদের নিজ বাসভূমিতে প্রত্যাবর্তন।

এরপর কী ঘটতে যাচ্ছে স্টেট ডিপার্টমেন্ট অঁাচ করতে পেরেই ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ একই সঙ্গে আমেরিকান কনসাল ঢাকা, আমেরিকান দূতাবাস ইসলামাবাদ, আমেরিকান দূতাবাস নয়াদিল্লিকে গোপন টেলিগ্রামে জানায়, ঢাকায় পরবর্তী যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। অনেক বিষয়ের সম্মিলিত ফলাফলের ওপর সম্পর্কটি নির্ভর করবে : যেমন–সামরিক/রাজনৈতিক নিষ্পত্তির ধরন, পূর্ব পাকিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের নেতৃত্বের মনোভাব। তবে আমাদের বিশ্বাস, এর মধ্যে নিচের সাধারণ দিকনির্দেশনা প্রযুক্ত হবে। উদ্ভূত রাজনৈতিক/নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে আমাদের সাধারণ লক্ষ্যসমূহ পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য ভারত ও পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে অবস্থা অনুযায়ী বাংলাদেশ নেতৃত্ব ও মুক্তিবাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের গোপনীয় সব চিঠিপত্র ও নথি ডিক্লাসিফাইড হওয়ার পর স্পষ্ট হয়েছে– এমনকি কিসিঞ্জারও একাত্তরের মাঝামঝি সময় থেকে বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশের অভু¨দয় কোনোভাবেই ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বিশ্বাস করেননি প্রেসিডেন্ট নিক্সন। স্টেট ডিপার্টমেন্ট বোঝেনি এমন নয়, বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে নিক্সনকে। পাকিস্তানের টুকরো হওয়া ঠেকাতে স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই ব্যর্থতার গস্নানি মুছে উঠে দাঁড়াতে অনেকটাই সময় লেগেছে যুক্তরাষ্ট্রের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত