লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান

অর্ধশতাধিক গাছ কাটার প্রস্তুতি খোদ বন বিভাগের

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৫৪ এএম

খাবারের অভাবে যখন বন্যপ্রাণী প্রায়ই ছুটে আসছে লোকালয়ে, তখন বন্যপ্রাণীদের খাবারের প্রয়োজনে নতুন ফলের গাছ না লাগিয়ে উল্টো মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের চাউতলী বিট থেকে অর্ধশতাধিক গাছ কাটার আয়োজনে ব্যস্ত বন বিভাগ। ইতিমধ্যে এসব গাছ কাটার চ‚ড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে বিশেষ চিহ্ন (লাল নম্বরযুক্ত) দেওয়ার কাজও শেষ হয়েছে। যার মধ্যে ৫০ থেকে ১০০ বছর বয়সী গাছের পাশাপাশি আমলকী, জারুল, বহেড়া ও ডzমুরের মতো ফল গাছও রয়েছে। বন বিভাগের এই উদ্যোগ লাউয়াছড়া বনে থাকা পৃথিবীব্যাপী মহাবিপন্ন উল্লyক ও চশমাপরা হনুমানসহ বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের খাদ্য ও বাসস্থান হুমকির মুখে ফেলবে বলে ধারণা বন্যপ্রাণী গবেষকদের।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, লাউয়াছড়ার পার্শ্ববর্তী বিট চাউতলী। এ বিটের আয়তন ৩২ হেক্টর। এর ১০ ভাগ জায়গায় ১০ বছর আগে সামাজিক বনায়ন করে বন বিভাগ। সামাজিক বনায়নের নামে এখানে লাগানো হয় আকাশমণি ও বেলজিয়াম গাছ। উপকারভোগীদের সঙ্গে করা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ১০ বছর আগে লাগানো গাছ কেটে বিক্রি করে তাদের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগি করবে বন বিভাগ। সে হিসেবে শুধু সামাজিক বনায়নের ১০ বছর আগে লাগানো গাছই কাটার কথা। কিন্তু উপকারভোগীদের সামাজিক বনায়নের গাছ কাটার পাশাপাশি বনের দুর্লভ এবং বন্যপ্রাণীদের খাবারের জোগান দেয়, এমন গাছও কাটার জন্য বাছাই করেছে মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। যদিও ৫০ থেকে একশ বছর বয়সী এই গাছগুলো সামাজিক বনায়ন করার আগে থেকেই এখানে ছিল।

সম্প্রতি চাউতলী বন বিট ঘুরে দেখা যায়, ফলের গাছসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির গাছ কাটার জন্য বিশেষ চিহ্ন (লাল নম্বরযুক্ত) দিয়ে রাখা হয়েছে। এই গাছগুলোর বয়স ৫০ থেকে ১০০ বছর। এর মধ্যে রয়েছে বহেড়া, ডুমুর, হরীতকী, আমলকী, জারুল, রিঠা, ডেউয়া, লটকন, কাঠ বাদাম, লুকলুকি, কাউফল, বন উরি ও কাটা জামসহ অর্ধশতাধিক ফলগাছ। যা থেকে ফল আহরণ করেই বেঁচে আছে বন্যপ্রাণীরা। উল্লyক ও চশমাপরা হনুমানসহ যেসব প্রাণী ফুল-ফল খেয়ে বেঁচে থাকে তাদের খাবারের গাছ এমনিতেই কমে গেছে লাউয়াছড়ায়, যার কারণে প্রায়ই লোকালয়ে ছুটে আসে বন্যপ্রাণী। তার ওপর এভাবে গাছ কাটার আয়োজন বন্যপ্রাণীর খাবারের অভাবকে আরও তীব্র করবে বলে জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও কাটার জন্য বাচাই করে রাখা হয়েছে অতি মূল্যবান ধূপ গাছ, শতবর্ষী চাপালিক গাছ এবং সাতটি বড় বড় আকারের লোহা কাঠের গাছ। এসব গাছ অতি মূলব্যান হওয়ার কারণেই কাটা হবে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

কেন এসব গাছ কাটার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে প্রকৃতি ও সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০ বছরের রোটেশনে এখন গাছের আবর্তন কাল। তাই গাছ কেটে উপকারভোগীদের টাকা দেওয়া হবে। উপকারভোগীরা এতদিন বাগান রক্ষা করেছে, এখন তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।’

তবে কাটার জন্য বাছাই করা গাছগুলোর মধ্যে সামাজিক বনায়নের বাইরের গাছও রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন এই বন কর্মকর্তা। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বনের উপকারভোগীরা চায়, এই গাছগুলো কাটা হোক। তবে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নেবেন।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১০ বছর আগে সামাজিক বনায়নের সময় বনায়নের টাকা ঠিকমতো খরচ করেননি তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এখন ১০ বছর পর যখন উপকারভোগীদের বনায়নের টাকা ফেরত দেওয়ার সময় এসেছে, তখন উপকারভোগীদের গাছের সঙ্গে বনের পুরাতন গাছ কেটে নেওয়ার পরিকল্পিত চেষ্টা করা হচ্ছে। 

এদিকে লাউয়াছড়ার মতো সংরক্ষিত একটি বন থেকে ৫০ থেকে একশ বছর বয়সী গাছ কাটার পরিকল্পনাকে অপরাধ বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের ভাষ্য, এর ফলে ঝুঁকির মুখে পড়তে চলেছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল্যবান প্রাণিজগৎ।

বন্যপ্রাণী গবেষকরা জানান, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান জীববৈচিত্র্যপূর্ণ সংরক্ষিত বন। এখানে পৃথিবীব্যাপী মহাবিপন্ন উল্লyক, চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর ও উড়ন্ত কাঠবিড়ালিসহ পৃথিবীব্যাপী বিপন্ন এবং সংকটাপন্ন মূল্যবান প্রাণিজগৎ রয়েছে। এরা পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল ফলের গাছের ওপর। তাদের খাদ্যসম্ভার ফল গাছ কেটে ফেললে হুমকির মুখে পড়বে বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্ব। এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় খাবারের ফলের গাছের সংখ্যা কমে এসেছে লাউয়াছড়ায়, যার কারণে প্রায়ই বন্যপ্রাণীরা বের হয়ে আসছে লোকালয়ে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. বিশ্বাস করবী ফারহানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই গাছগুলো কাটা হলে বন্যপ্রাণীরা খাবার এবং বাসস্থানের সংকটে পড়েবে। প্রাণীরা অন্যত্র ছুটে যাবে। এর ফলে কিছু প্রাণী মারাও যেতে পারে।  ব্যক্তিগত লাভের জন্য এত পুরাতন গাছ কেটে নেওয়ার ফলে হুমকিতে পড়বে ন্যাচারাল ইকো সিস্টেম। যেকোনোভাবেই হোক এই গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। যেসব ফলের গাছ কাটার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে তার সবই বন্যপ্রাণীদের খাবারের জন্য দরকারি। খাবারের অভাব থাকলে বন্যপ্রাণীরা বন থেকে বের হয়ে লোকালয়ে চলে আসতে পারে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ) আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘আমি জানার পর ফলের গাছ এবং পুরাতন গাছ কাটার বিষয়টি বাতিল করে দিয়েছি, ফলে এই গাছগুলো রক্ষা করা হবে। তবে সামাজিক বনায়নের আওতায় লাগানো আকাশমণি ও বেলজিয়াম গাছগুলো কাটা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত