একটি নতুন বইয়ের গৃহপ্রবেশে অভ্যর্থনা কিছুটা থাকেই। উৎসাহ দানা বেঁধে থাকে তার গন্ধময় পৃষ্ঠায়। একাগ্র অক্ষরমালায় থাকে উন্মুখ ইচ্ছের স্বাভাবিক আনাগোনা। কিন্তু পান্ডুলিপি পাঠে সেই চিরাচরিত আগ্রহ অনেকটাই হীনবল। কবি জাহিদুর রহিমের ‘হেমলক সন্ধ্যার গান’ কাব্যগ্রন্থটির পান্ডুলিপি পাঠেও তাই ঔৎসুক্য থাকলেও, তাতে উৎফুল্লতার স্বাভাবিক সঞ্চার ছিল না।
কবির পূর্ববর্তী গদ্য সংকলন ‘কথারা আমার মন’-এর মগ্নপাঠের মায়াজাল থেকে বেরোতে না বেরোতেই কাব্য সুধার সঞ্চার। বলতে দ্বিধা নেই, কবিতা পাঠেই এই মিতজ্ঞান পাঠকের সবচেয়ে আনন্দ। কিন্তু সেই অনির্বচনীয় অনুভূতিকে বাক্সময় করে তোলার মতো অক্ষরসংগতি কোথায়। তবু এই অক্ষম প্রচেষ্টার ধৃষ্টতা অমার্জনীয় নয় আশা করি।
কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্য সমালোচক সর্বোপরি জ্ঞানের বহুধা বিস্তৃত ক্ষেত্রভূমের ঋদ্ধ প্রব্রাজক জাহিদুর রহিমকে এযাবৎ চিনেছি ফেইসবুক বন্ধুতায়। তার প্রথম ও কবিতার বই ‘সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ’ থেকে কিছু কবিতা পাঠের সুযোগ হয়েছে ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে। এবারে সেই খ- অভিজ্ঞতা-উত্তর পূর্ণ পাঠ পরিক্রমা।
তার কবিতায় যেভাবে তাকে পাই, মনে হয় তিনি তারুণ্যদীপ্ত সোনালি অক্ষরের কারিগর নন বরং প্রজ্ঞা ও মননের প্রাচীন ঋষিসুলভ নির্বিণ্ণ পুরুষ। তার কবিতা নিঃসন্দেহে উচ্চকিত বোধের আধার কিন্তু তার স্বর নত, নম্র ও ঐকান্তিক। তাকে পাঠ করলে [যদিও সে পাঠ বোধসঞ্জাত এমন দাবি করা দুঃসাহসের নামান্তর] মন এক উদাসীন বনপ্রান্তরে পাতাঝরা অপরাহ্নে একাকী বিচরণসুখে আচ্ছন্ন হয়। যার একদিকে অনাড়ম্বর, অভিমানী একাকিত্ব অন্যদিকে নিগূঢ় ভাবময় মায়াটান যুগপৎ আনন্দলোকচিত সুধা পরিবেশনে নিমগ্ন। এই মায়া ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা তো দূর, মন দীর্ঘক্ষণ একতারা উদাসী সুরের বশবর্তী হয়ে থাকতে চায়। তার অক্ষর নিঃসৃত জ্যোতিরাবয়ব অস্ফুট উচ্চারণে পাঠকের সঙ্গে এমন এক ভাষাসন্ধি গড়ে তোলে যে পাঠক নান্দনিক পরিভ্রমণে ধ্যানমগ্ন হয়।
কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলক সন্ধ্যার গান’ পাঠে চেতনায় যে অনাবিল জোনাক জ্বলে ওঠে তার শুভারম্ভ ‘ভূমিকার বদলে’ কবি যা লিখলেন তা থেকেই... ‘বেঁচে থাকা মানে ক্রমাগত দুঃখকে অতিক্রম করা। জীবন যেন অসহনীয় বিষাদে ভরা চির সন্ধ্যা’ এই সিসিফাস উপলব্ধি তো মানুষেই অমরগাথা। ক্ষণভঙ্গুর মানবজীবনে তাই তো মানুষ গান গায়, কবিতা পড়ে, খুঁজে নেয় শিল্পসান্নিধ্য।
‘হেমলক তো রূপক। যা সক্রেটিস পান করেছিলেন নিরুপায় স্বেচ্ছায়। প্রতিটি মানুষের হাতে কি নেই এই হেমলক বিষপাত্র, দিনশেষে যা পান করে চলি আমরা!’ এই গভীর বোধের কাছে নতমস্তক আবহমান পাঠক।
‘হেমলক’, ‘সন্ধ্যার’, ‘গান’, তিনটি ভিন্ন মাত্রার শব্দবন্ধে বাঁধা শিরোনাম প্রতিটি কবিতার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত। তিনটি শব্দের মধ্যে গান শব্দটি সর্বজনীন। সংগীতের ধ্রুপদী ভাব বিবর্জিত গান যেন হয়ে উঠেছে আ-মানুষিক। ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সাংগিতিক ভাব নয়, নয় সান্ধ্য মধুর গীতিকা এ যেন ‘হোলি গ্রেইলের’ মতো শুদ্ধ ও পবিত্র অনুভূতি। যে মানুষের মন গভীরতায় অতল, অনুভব যার গাঢ় সে-ই কেবল এই অনন্যস্বাদী হেমলক পানের অধিকারী। সমস্ত দিনের আলো, হাসি, আনন্দ যখন সন্ধ্যায় গাঢ় হয়ে আসে এক পেয়ালার তরল হেমলকে তখনই তো তা কবিতা হয়। শব্দের কোনো এক জাদুকরী আকর্ষণীতে হয়ে ওঠে অনুপম চিত্রকল্প। জাহিদুর রহিমের ‘হেমলক সন্ধ্যার গান’ এমনই ‘এক পেয়ালা আশ্চর্য পান’। প্রতিটি চুমুকেই স্নায়ুতে সম্পৃক্ততা ও উদাসীনতার যুগপৎ আশ্বাস যা কবির নিজস্ব অনুভবেরই প্রতিধ্বনি, এতে কৃত্রিমতার লেশমাত্র অনুপস্থিত। এই সহজাত আন্তরিকতাকে কারও ‘ব্যক্তিগত’ মনে হতে পারে, এতে যদি এলিয়ট সাহেবের বিদেহী আত্মা নারাজ হন, তো সে দায় তাদের।
‘হেমলক সন্ধ্যার গান’ কবিতাকে গদ্যের কাছাকাছি এনে উপস্থিত করেছে। যেন এই ধুলোখেলা জীবনে বোধের আকর পদ্যের চেয়ে গদ্যের কাছে বেশি ঋণী। পুরো বইটিতে এমন একটি শব্দও নেই যার জন্য অভিধান খুলে বসতে হয়, তবু পরিশীলিত পাঠক মাত্রই বলবেন, ‘কই আমি তো পারিনি এভাবে বলতে, অথচ প্রতিটি কথাই আমারও তো বলার ছিল!’ এখানেই বইটির অভিনবত্ব।
ভেতরে বাইরে সবখানে ছড়ানো
নিঃসঙ্গতার অন্ধকার আমাকে ছেড়ে তুমি কোথায় যাবে?
আমার কেবল মনে হয়েছে এই ‘তুমি’ কবিতার সেই পাঠক, কবির প্রিয় কবিদের সাথে যিনিও এই বইয়ের উৎসর্গ তামরস লাভ করেছেন। বিস্মিত বিহ্বলতায় আওড়ে গেছি অন্যতম কাব্যিক পঙ্ক্তিগুলো :
তারার মতো নিঃস্ব দীপ্ত মানুষ
একাকী তারা একাকী নিজের কাছে;
মানুষের দিকে হাত বাড়িয়েছে মানুষ
মনে শত কথা- উন্মুখ- জেগে আছে
এমন করে মানুষের গাথা গেয়েছেন যে পারিপার্শ্বিক বিষন্নতার ঘনঘোরেও মানবিক আকুলতা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। অব্যক্ত ক্রোধ যখন সর্বগ্রাসী পুঁজির হাতে সামগ্রিকভাবে পরাভূত হয় তখন নেমে আসে অপার দুঃখবোধ। সেই দুঃখবোধেরই বৌদ্ধিক ফসল বুঝি ‘সুন্দর বনের প্রতি এলিজি’ কবিতাটি :
‘বায়ুভুক মানুষেরা লণ্ঠন জ্বেলে খুঁজতে থাকবে শ্বাসমূলের শ্বাস! অহেতুক চঞ্চল পাখিরা রক্তশূন্য পড়ে থাকবে ভোরের আলোয়! সানগ্লাস চোখে রঙিন পানি চেখে কেউ কেউ তুলে দেবে রঙিন স্বপ্নের বুদবুদ! হাঁ চোখে সারা দিন আমরা সেই বুদবুদ দেখব অবিশ্বস্ত চোখে! দেখো, একদিন এমনি হবে। ভালোবাসা নিহত হবে বিকেলের চেনা আলোয় মায়াবী সুন্দরবন কৃত্রিম শ্বাস ছেড়ে মরে যাবে নিশ্চিন্তে আমাদের চোখের সামনেই।
নিঃসঙ্গ প্রদীপটির বুকে একা জ্বলছে সলতে। তাতে আছে আলোর আশ্বাস। কিন্তু পুড়ে যাওয়ার জ্বালা! সে তো কেবল একলাই সয়ে যেতে হয় : ওগো ষড়ভুজ তন্দ্রা, দূরবিন চোখে কত দেবে দৃষ্টি? প্রাণের বৃন্তে ফুটছে যেই সর্বনাশের ফুল, তাকে ছায়া দাও, প্রবীণ বীথিকা; যত জন্মান্ধ কবি আকাশের দিকে চেয়ে মনে মনে ফেলে দীর্ঘশ্বাস আকাশ ও মাটির ব্যবধানের মাঝে তারা পাক প্রসন্ন ব্যবহার [জীবন কি আকাশের মতো ফোয়ারা হবে কোনদিন]
অথবা,
চোখ মেলতেই উড়ে যায় ঘুমের খোলসে বন্দি স্বপ্ন। ভেজা রাস্তায় স্যাঁতসেঁতে ঘোর, ভীরু পায়ে ভেজা বাতাসের চলাচল। তুমি চলে গেলে এই সন্ধ্যায়। শূন্যের ভর শারীরিক নয়
হয়তো কোমল অনুপস্থিত বিদ্যুৎ যেমন মনে করো : প্রথম স্পর্শের রেশ, যেমন হারানো আলো, যেমন জীবনের প্রাঞ্জল সাঁতার; একসঙ্গে ভাগ-করা জীবনের নিস্তরঙ্গ গতি তারপরও স্থির নিঃসঙ্গ তুমি চলে গেলে কত কথা বলা হলো না, এই সন্ধ্যায়... [তুমি চলে গেলে] অস্ফুট বেদনাহত হয়ে বসে রয়েছি।
গান মরে এলো। পৃথিবী ঝরে প্রতি রাতে পথচ্যুত নক্ষত্রের নিঃসঙ্গতায়। মানুষের গতিশীল সুষমা, মানুষের স্খলিত স্নিগ্ধতা সবটুকু শঙ্কা নিয়ে মিশে যায় হৃদয়হীন পদ্যে। লালসার গোপন রন্ধ্র খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনি নুন তবু এখানে নেই প্রলাপের ছন্দ। মধ্যাহ্ন জ্যোতি ভরা অস্পষ্ট শহরে অপ্রতিরোধ্য ঘুমের ব্যাকুলতায় ঐশী আকরে দাঁড়িয়ে এক পথভোলা রাজকন্যা। বাংলা কবিতার এই ব্যতিক্রমী নির্মাণ তার মায়াকলমে শোভা পায়।
এমনই প্রতিটি কবিতা নিয়ে কিছু বলবার থেকে যায়। কবির সমস্ত সৃষ্টির জন্য অক্ষরে অক্ষরে তোলা রইল সামান্য দূর্বা-ধান্য।
প্রকাশক : বুকিশ পাবলিকেশন্স
প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈশব্দ্য, দাম : ২০০ টাকা
