হারিয়ে যাওয়া সখিনা হারিয়ে গেলেন সড়কে

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০১:১৪ এএম

পঞ্চাশোর্ধ্ব ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ সখিনা বেগম। কে বাবা, কে তার মা– কিছুই জানা ছিল না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই নারীর রাজধানী ঢাকার পথে ঘুরতে ঘুরতে প্রায় এক যুগ আগে আশ্রয় মিলেছিল আদাবরের বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ৯ নম্বর সড়কের ৭৪০ নম্বর বাড়িতে।

সেখানে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করলেও ধীরে ধীরে একসময় বাড়িওয়ালা জাহানারা আখতারের (৬০) বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন সখিনা। কখনো বন্ধু আবার কখনো-বা নিজের মেয়ে হিসেবেই সখিনাকে দেখতেন জাহানারা আখতার।

রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাড়িওয়ালা জাহানারা আখতারের সঙ্গেই রিকশায় চড়ে বাজার করতে যাওয়ার পথে বেপরোয়া গতির একটি পিকআপের চাপায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন সেই সখিনা। আর আশঙ্কাজনক অবস্থায় জাহানারা আখতারকে ভর্তি করা হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

এদিকে সখিনার মরদেহের দাফন নিয়ে দেখা দিয়েছে কিছুটা জটিলতা। যাদের বাসায় তার আশ্রয় মিলেছিল তারাই দায়িত্ব নিয়েছেন লাশ দাফনের। কিন্তু তারপরও ভবিষ্যতে কেউ ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ সখিনার লাশের দাবি করলে যাতে মিলিয়ে দেখা যায় সেজন্য ডিএনএ পরীক্ষার মতামত দিয়েছে পুলিশ।

তবে মর্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক না থাকায় আজ সোমবার সখিনার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তারপর ঢাকার নবাবগঞ্জের গোবিন্দপুর গ্রামে জাহানা আখতারদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে সখিনা বেগমকে।

জাহানারা আখতারের ভাগ্নি ফরিদা পারভীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১২ বছর আগে আমার এক দাদি সখিনা বেগমকে খালার বাসায় রেখে যান। তারপর থেকেই সখিনাকে আমরা খালা হিসেবেই ডাকতাম। কিছুদিন পর দাদি মারা যান। সখিনা খালা খানিকটা মন ভোলা হওয়ায় তিনি কখনোই তার বাড়ি ও বাবা-মার পরিচয় বলতে পারেননি।’

ফরিদা আরও বলেন, ‘তিনি (সখিনা) যেমন ঘরের একজন বিশ্বস্ত মানুষ ছিলেন, তেমনি ঘরের বাইরেও মৃত্যুর আগেও জাহানারা খালাকে বাঁচিয়ে গেলেন।’

সখিনা নিহত হওয়ার দুর্ঘটনাস্থল লাগোয়া শেখেরটেক ১২ নম্বর রোডের ইলমা ফার্নিচারের কর্মচারী রবিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার দোকানের সামনেই চলন্ত রিকশার ডান পাশের চাকা খুলে যেতেই ডানদিকে কাত হয়ে পড়েন দুই নারী যাত্রী। তখন এক নারী আরেক নারীকে তুলতে যাওয়ার মুহূর্তেই পেছন দিক থেকে আসা দ্রুতগতির একটি পিকআপ তাদের চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়।’

ফরিদা পারভীন বলেন, ‘সখিনা খালা আমার খালার (জাহানারা আখতার) ওপরে পড়েছিলেন, তখনই তাদের দুজনের ওপর দিয়ে পিকআপ চলে যায়। সখিনা ওপরে থাকায় আমার খালা বেঁচে যান। যদিও তিনি গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরও বলেন, ‘খালার জ্ঞান ফেরার পর থেকেই বলছেন, আমার মেয়ে (সখিনা) কোথায়? সে কেমন আছে? যদিও তাকে সখিনা খালার মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি।’

সখিনা বেগমের লাশের সুরতহাল তৈরিকারী আদাবর থানার এসআই শংকর বালা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সখিনা কোথা থেকে এসেছেন, কে বাবা কে মা তার কিছুই জানা যায়নি। যাদের বাসায় ছিল তারাই দায়িত্ব নিয়েছে তার লাশ দাফনের। তারপরও ভবিষ্যতে কেউ সখিনার লাশের দাবি করলে যাতে মিলিয়ে দেখা যায় সেজন্য ডিএনএ পরীক্ষার মতামত দিয়েছি।’

জাহানারা আখতারের একাধিক স্বজন জানান, রবিবার মর্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক না থাকায় আজ সোমবার সকালে সখিনা বেগমের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। তারপর ঢাকার নবাবগঞ্জের গোবিন্দপুর গ্রামে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে সখিনাকে দাফন করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত