ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে জেনারেল কাসেম সুলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে ইরান। ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের ইরবিল ও আইন আল আসাদ বিমানঘাঁটিতে গত মঙ্গলবার রাতের চালানো হামলায় অন্তত ‘৮০ জন সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে বলে দাবি তেহরানের। ইরানের পার্লামেন্টে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সব বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এরপরই মূলত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের সন্ত্রাসী বলতে শুরু করে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরবিল ও আইন আল আসাদে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত দুটি স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে পেন্টাগন। গত মঙ্গলবার ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর কেরমানে সুলেইমানির
দাফন অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের ঢল নামে। শোকার্ত জনতা সেখানে সেøাগান দেয়Ñ ‘আমেরিকা নিপাত যাক’, ‘ট্রাম্প নিপাত যাক’। সুলেইমানিকে দাফনের কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। ইরানের আল মায়াদিন টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, প্রথমে হামলা হয় আল আসাদের ঘাঁটিতে। এর পরপরই ইরবিলে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র স্টেফানি গ্রিশাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় হামলার ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত। প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তিনি পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি টিমের সঙ্গে পরামর্শ করছেন।’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে বৈধ আত্মরক্ষা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইরান।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ দাবি করেছেন, ‘আমাদের পদক্ষেপ আত্মরক্ষার এক বৈধ কৌশল ছিল।’
অন্যদিকে হামলার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গালে একটি চড় দেওয়া হলো।’ ১৯৭৮ সালের কোম বিক্ষোভের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি গতকাল এ মন্তব্য করেন।
খামেনি বলেন, ‘যখন সংঘাতের প্রসঙ্গ আসে তখন এ ধরনের সামরিক হামলা যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, (মধ্যপ্রাচ্যে) আমেরিকার অবস্থানের অবসান ঘটানো। কেউ যদি আমাদের ক্ষতি করতে চায় তাহলে সেটির বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তেহরানের।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমেরিকার সহযোগীদের আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি, যারা তাদের ঘাঁটি ওই সন্ত্রাসী সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। যে জায়গা থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হোক না কেন, সেটা আমাদের টার্গেটে পরিণত হবে।’ যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের নতুন হামলার মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ার করা হয় বিবৃতিতে। এবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘১৪০ স্থাপনা’ টার্গেট করেছে ইরান। আক্রান্ত হলে তেহরান এ স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে বলে পরিকল্পনা নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটিতে ইরান যে ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে তা আগেই বাগদাদকে জানিয়েছিল তেহরান। ইরাকের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদির মুখপাত্র গতকাল ভোরে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
ইরান সমর্থিত ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠীর নেতা কায়েস আল খাজালি এক টুইটবার্তায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে তেহরান তাদের কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সুলেইমানি হত্যার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এবার ইরাকেরও একই রকম কিছু করে দেখানোর পালা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর হতাহতের কোনো তথ্য দেয়নি। কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সৈন্য নিহত হয়নি। যদিও তেহরান দাবি করেছে, তাদের ছোড়া ১৫টি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত ৮০ ‘যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে।
এদিকে হামলার ঘণ্টা দুয়েক পর এক টুইটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অল ইজ ওয়েল’ বলে মন্তব্য করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বলেছে, এ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার রিপাবলিকান সিনেটর জেমস ইনহোফের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে চাইছেন। সিনেটর জেমস বলেন, ‘গত রাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েকজন আইনপ্রণেতাকে ফোন দিয়েছিলেন।’
অন্যদিকে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর ইরানের পাল্টা হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা। ইরানের হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের একটি বৈঠক চলছিল। এর মধ্যেই কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির কাছে হামলার সংবাদবাহী একটি নোট আসে। তৎক্ষণাৎ তিনি বৈঠক ছেড়ে চলে যান বলে সেখানে উপস্থিতদের মধ্যে কয়েকজন রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
পরে এক টুইটে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট স্পিকার পেলোসি বলেন, ‘ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো বোমা হামলার ওপর কড়া নজর রাখছি। আমাদের অবশ্যই সেনাসদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে (ট্রাম্প) প্রশাসনের অপ্রয়োজনীয় উসকানি বন্ধ করাতে হবে। ইরানকে তাদের সহিংসতা থামাতে দাবি তুলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব যুদ্ধের ভার বহন করতে পারবে না।’
ইরাকে ইরানের হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্ব নেতারা। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি উভয়পক্ষের হামলা ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা আরও বাড়বে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন পার্লামেন্টে বলেন, ‘ইরানের উচিত হয়নি বিপজ্জনক এ হামলা চালানো।’ অন্যদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ফ্রান্স এখনো বিশ্বাস করে সব পক্ষের আলোচনার মধ্য দিয়ে উত্তেজনা কমানো সম্ভব।’
১৯৯৮ সাল থেকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ‘বিদেশি শাখা’ কুদস ফোর্সের নেতৃত্ব দিয়ে আসা মেজর জেনারেল কাসেম সুলেইমানিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যুক্তরাষ্ট্র তাকে ‘সন্ত্রাসী’ ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন বাহিনীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করলেও নিজের দেশে সুলেইমানি বীরের মর্যাদা পেয়ে আসছিলেন। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিহত হন সুলেইমানি। ওই হত্যাকাণ্ডের পরই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে বহুজাতিক বাহিনীর অভিযান শুরুর পর ইরাকে ঘাঁটি গাড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা। ২০০৭ সালে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয়ে ধাপে ধাপে অধিকাংশকে ফিরিয়ে আনা হলেও এখনো ৫ হাজার সৈন্য রয়েছে। নিজেদের শত্রুতা ভুলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এক হয়েছিল আইএসের বিরুদ্ধে। ইরানের আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ২০১৪ থেকে ’১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সঙ্গে মিলেই এই যুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু ট্রাম্পের নির্দেশে সুলেইমানি হত্যাকাণ্ডের পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। ইরাকের পার্লামেন্টে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের বাগদাদ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
