ক্যাসিনো হোতাদের সহস্রাধিক কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ০১:৩৬ এএম

আলোচিত ক্যাসিনো কাণ্ডার সঙ্গে জড়িত গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, সেলিম প্রধান, এনামুল হক ও রুপন ভূঁইয়া এবং হাবিবুর রহমান মিজানের বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান মিলেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে। রাজধানীর অপরাধজগতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত এই ছয় হোতার সম্পদের অনুসন্ধানে ২৬টি সংস্থায় চিঠি দেয় সিআইডি। এর পরেই তাদের সম্পদের সমস্ত তথ্য-প্রমাণ সিআইডির হাতে আসে। সিআইডির হাতে থাকা আলোচিত এই চার মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে সংস্থাটি। চলতি মাসের শেষের দিকে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তবে তদন্তকালে তাদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে সিআইডি বাদী হয়ে মানি লন্ডারিং আইনে আরও একাধিক মামলা করবে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

সিআইডির উপমহাপরিদর্শক (অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ

রূপান্তরকে বলেন, ‘আলোচিত এ চার মামলার আসামিদের বিপুল সম্পদের সন্ধান মিলেছে। সব তথ্য-উপাত্ত ইতিমধ্যেই আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। তদন্তকাজে নতুন কোনো ক্লু যুক্ত না হলে চলতি মাসে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা সম্ভব হবে বলে মনে করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তদন্তাধীন চার মামলা ছাড়াও মানি লন্ডারিং আইনে নতুন করে সিআইডি বাদী হয়ে মামলা করবে।’

জি কে শামীম : ক্যাসিনো কা-ের অন্যতম হোতা জি কে শামীমের এফডিআর ও ১৯৪টি অ্যাকাউন্ট মিলে ৩২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। সব অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পরপরই গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন জি কে শামীম। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অর্থ পাচার আইনে আলাদা মামলা করে র‌্যাব। গ্রেপ্তারের সময় শামীমের কার্যালয় থেকে তার মায়ের নামে ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকার এফডিআরের কাগজপত্র জব্দ করা হয়। এছাড়া শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চলার সময় ১ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং ৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকার সমপরিমাণ মার্কিন ডলারও জব্দ করে র‌্যাব। এর এক মাস পর দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। মামলায় জি কে শামীমের বিরুদ্ধে ২৯৭ কোটি ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। একই মামলায় শামীমের মা আয়েশা আক্তারকেও আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে শামীম ও তার মায়ের আরও সম্পদের তথ্য আসে দুদকের হাতে। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা পাওয়া যায় ৩২৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। আর জায়গা-জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট মিলিয়ে ৪০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া : খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ৫২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২৭৮ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমান তার অ্যাকাউন্টে জমা আছে ২৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরুর দিনই গ্রেপ্তার হন মহানগর যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও অর্থ পাচার আইনে আলাদা মামলা করে র‌্যাব। এর ৩৩ দিন পর ২১ অক্টোবর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খালেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম। মামলায় খালেদের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। তবে মামলার তদন্তে খালেদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্যাংকে খালেদের নামে পাওয়া ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া আনুমানিক ৩ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়।

এনামুল হক ও রুপন ভূঁইয়া : গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এবং তার ভাই থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার ২০টি বাড়ি ও ৯১টি ব্যাংক হিসাবে ২৯ কোটি ১১ লাখ টাকার সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। সেই সঙ্গে তিনটি দামি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে গত ২৪ সেপ্টেম্বর এনামুল হক ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়ার বাড়িতে অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই অভিযানে সব মিলিয়ে ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা, ৪ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করে র‌্যাব। এদিকে এনামুল হকের আরও ১০ কোটি ৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, রুপন ভূঁইয়ার ৮ কোটি ৭৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা রয়েছে। যা ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর এ দুজনের বিরুদ্ধ মামলা করে দুদক। মামলা এজাহারে বলা হয়, বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা ও অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে ২১ কোটি ৮৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। অন্যদিকে রুপন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুদকের আরেকটি মামলায় বেনামে ১৪ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৮৮২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সেলিম প্রধান : ক্যাসিনো কা-ের আরেক হোতা সেলিম প্রধানের থাইল্যান্ডে একটি বাগান বাড়ির ও ঢাকার গুলশানে হোয়াইট হাউজ নামে একটি বিলাসবহুল বাড়ির সন্ধান পেয়েছে সিআইডি। সংস্থটির তদন্তে উঠে এসছে, এস-৭ গ্রুপ, টি২১ গেমলিং অ্যান্ড ভেটিং, প্রধানস স্পা হাউজ, প্রধানস ফ্যাশন হাউজ, প্রধানস ল হাউজ, জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকও সেলিম প্রধান। এছাড়া ৮৬টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকার তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি।

এর আগে ১২ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ পেয়ে সেলিমে বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তাকে গ্রেপ্তারের সময় অফিস ও বাসায় অভিযান চালিয়ে ২৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা, ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ ২৩টি দেশের মুদ্রা, ১২টি পাসপোর্ট, ১৩টি ব্যাংকের ৩২টি চেক, ৪৮০ বোতল বিদেশি মদ, একটি বড় সার্ভার, চারটি ল্যাপটপ ও দুটি হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়

হাবিবুর রহমান মিজান : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজানের মোহাম্মদপুরের বসিলায় মার্কেট, মোহাম্মদপুর স্বপ্নপুরী হাউজিংয়ে চারটি ফ্ল্যাট, পুরানা পল্টনে পাঁচতলা বাড়ি, মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডে ২২০০ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে সিআইডি।

এর আগে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১১ অক্টোবর সিলেটের শ্রীমঙ্গল থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন হাবিবুর রহমান মিজান। তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করা হয়। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ৩০ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩১ টাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৬ নভেম্বর মামলা করে দুদক। বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা তার ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়। এছাড়া আনুমানিক ২০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত