রহস্যময় চার গুপ্তচর

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:৫৭ এএম

ইরানের বিপ্লবী গার্ডের চারজনকে নিয়ে গাঢ় রঙের গ্লাসের গাড়িতে জেনারেল কাসেম সুলেইমানি দামেস্ক বিমানবন্দরে পৌঁছান। গাড়িটি বাগদাদগামী চ্যাম উইংস এয়ারবাস এ৩২০-এর কাছে পার্ক করে। কিন্তু যাত্রী তালিকায় তাদের কারও নাম তোলা হয়নি। সুলেইমানিকে বহনকারী বিমানের সিরিয়া ছাড়ার এ চিত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন চ্যাম উইংস এয়ারলাইনসের এক কর্মচারী। সুলেইমানির নিরাপত্তা সম্পর্কে ইরাকি নিরাপত্তা সূত্র স্বীকার করেছে, নিরাপত্তার জন্যই তিনি ব্যক্তিগত বিমান এড়াতে চেয়েছিলেন। যাত্রীবাহী বিমানটিই সবশেষে দামেস্ক ছাড়ে। ইরাকে পৌঁছে বাগদাদ বিমানবন্দর ছাড়ার পরই যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় সুলেইমানি সরকারের সমর্থনপুষ্ঠ ইরাকি মিলিশিয়া বাহিনী পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সের (পিএমএফ) উপপ্রধান আবু মাহদি মুহান্দিস নিহত হন। দুজন ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ইরাকি তদন্তদল জানতে পেরেছে ৩ জানুয়ারি শুরুর হামলাতেই দুজনের মৃত্যু হয়। পরে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয় এবং পুলিশ, পাসপোর্ট কর্মকর্তা ও গোয়েন্দারা চলে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দামেস্ক ও বাগদাদ বিমানবন্দরে কাদের মাধ্যমে সুলেইমানির অবস্থান শনাক্ত করেছে, রয়টার্সের প্রতিবেদনে সেটি প্রাধান্য পেয়েছে। এজন্য ইরাকি তদন্ত দলের দুজন, বাগদাদ বিমানবন্দরের দুজন করে কর্মচারী ও পুলিশ এবং চ্যাম উইংস এয়ারলাইনসের দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে তারা। এ তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পিএমএফ প্রধান ফালিহ আল-ফায়াদ। তার সঙ্গে রয়েছেন ইরান ও সুলেইমানির ঘনিষ্ঠ শিয়া মিলিশিয়ারা।

ইরাকের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, তদন্তদল সুলেইমানির পৌঁছানোর তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সরবরাহের ক্ষেত্রে বাগদাদ বিমানবন্দরে অবস্থানরত গুপ্তচর নেটওয়ার্কের শক্তিশালী ইঙ্গিত পেয়েছে। সূত্র জানায়, তথ্য ফাঁসে বাগদাদ বিমানবন্দরের দুজন নিরাপত্তাকর্মী ও চ্যাম উইংসের দুজন গুপ্তচরের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এদের একজন দামেস্ক বিমানবন্দর ও অন্যজন বিমানের বোর্ডে ছিলেন। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, চার সন্দেহভাজন বড় কোনো গ্রুপের অংশ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে তথ্য সরবরাহ করছে।

ইরাকি সূত্র জানায়, চ্যাম উইংসের দুই কর্মচারীকে সিরিয়ার গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। তবে সিরিয়ার গোয়েন্দাপ্রধান এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি। এক ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা বিমানবন্দরের দুই নিরাপত্তাকর্মীর বিষয়ে তদন্ত করছে। কর্মকর্তারা জানান, তদন্তকারীরা প্রাথমিকভাবে দামেস্ক বিমানবন্দর থেকে সুলেইমানির অবস্থান ফাঁসের তথ্য পেয়েছেন। এরপর বাগদাদ বিমানবন্দরে তাদেরই সেলটি ফ্লাইট অবতরণ ও গাড়ির তথ্য নিশ্চিত করে। তবে এ বিষয়ে ইরাকি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মন্তব্য করেনি। জাতিসংঘের ইরাক মিশনের নিউ ইয়র্ক অফিসে যোগাযোগ করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর ইরাক ও সিরিয়া থেকে ভূমিকা রাখাদের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে হামলার রাতের কয়েক দিন আগে থেকে তারা সুলেইমানির গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা রয়টার্সকে জানিয়েছে। দামেস্কে চ্যাম উইংসের ব্যবস্থাপক তার কর্মচারীদের এ বিষয়ে কথা বলতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ইরাকের বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ মন্তব্য না করলেও ফ্লাইটি হাই-প্রোফাইল কর্মকর্তাদের বলে জানিয়েছে।

দুজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, সুলেইমানিকে বহনকারী ফ্লাইটটি ৩ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১২টায় বাগদাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। রক্ষীদের নিয়ে সুলেইমানি সরাসরি কাস্টমস পার হন। মুহান্দিস বিমানের বাইরে তাদের সঙ্গে দেখা করেন। কড়া নিরাপত্তায় সুলেইমানি সশস্ত্র এসইউভি গাড়িতে বিমানবন্দর ছাড়েন। কিছুদূর যাওয়ার পর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটের দিকে সড়কে দুটি রকেট তাদের গাড়িতে আঘাত হানে। এর কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় গাড়িতেও রকেট আঘাত হানে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কল ও এসএমএস বিনিময়ের তথ্য পেয়ে হামলার ঘণ্টাখানেক পর তদন্তদল বিমানবন্দরের রাতের শিফটের দায়িত্বরতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। এক নিরাপত্তা কর্মী জানান, তাকে ২৪ ঘণ্টা ধরে লাখ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। সুলেইমানির বিমান অবতরণের পর ‘অদ্ভুত অনুরোধের’ কলে দামেস্কের ফ্লাইটটি সম্পর্কে আলাপের তথ্য পাওয়া গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত