মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে আসবে যন্ত্রমানবের যুগ বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির সেই শুরুর সময় থেকে মানুষ এমন ধারণা পোষণ করেছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মানুষের বিকল্প ‘ডিজিটাল’ কিংবা কৃত্রিম মানুষ এখনো তৈরি হয়নি। লাস ভেগাসে কনজিউমার ইলেকট্রনিকস শোতে (সিইএস) দক্ষিণ কোরীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্যামসাং গত মঙ্গলবার একটি যন্ত্রের সঙ্গে বিশ্ববাসীকে পরিচয় করিয়েছে, যা দেখে প্রযুক্তিবিদরা বলছেন মানুষের পৃথিবীতে ‘আরেক মানুষের’ আগমন এখন সময়ের ব্যাপার।
এই যন্ত্রমানবের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিয়ন’। ‘নিউ হিউম্যান’ শব্দ দুটি এক করে নামটি নির্বাচন করেছে স্যামসাং। কোম্পানিটির ‘স্টার ল্যাবস’ থেকে এই প্রজেক্ট সফল করতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কম্পিউটার-বিজ্ঞানী প্রণব মিস্ত্রি।
বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসকে প্রণব জানিয়েছেন, নিয়ন জীবন্ত মানুষের মতো দেখতে, কথা বলতে ও চলাফেরা করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারে সাড়া। নিয়ন মানুষের মতো লাখ লাখ এক্সপ্রেশন দেখাতে পারে। ২০২০ সালের শেষ নাগাদ এর বেটা ভার্সন নিজস্ব ব্যক্তিত্ব অর্জন করবে, তার থাকবে নিজস্ব চিন্তাভাবনা!
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কারণে ইতিমধ্যে কিছু রোবট বিশ্ববাসী দেখেছে, যারা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে। আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তি সহজলভ্য করেছে, যা মানুষের ভয়েস বুঝতে পেরে সাড়া দেয়। কিন্তু এসব যন্ত্র এখনো পর্যন্ত এআই অ্যাসিস্ট্যান্স ছাড়া কিছুই না।
এশিয়ার গর্ব প্রণব মিস্ত্রি বড় হয়েছেন গুজরাটের ছোট একটি শহর পলানপুরে। ‘সিক্সথ সেন্স’ নামক একটি ডিভাইস আবিষ্কার করে আলোচনায় আসেন তিনি। এই ডিভাইসটি শরীরে পরা যায়। প্রণব মাইক্রোসফট, গুগল এবং নাসার মতো প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেছেন। সিইএস ২০২০ প্রেজেন্টেশনে তিনি বলেন, ‘আমি নিয়নকে দিয়ে বিপ্লব ঘটাতে চাই।’ তিনি কয়েক ধরনের নিয়নের কথা জানিয়েছেন : ইয়োগা প্রশিক্ষক, বিমানবালা, শিক্ষার্থী এবং সংবাদপাঠক।
নিয়নের প্রযুক্তি
নিয়ন এই মুহূর্তে দুটি প্রযুক্তিতে কাজ করছে : কোর আর৩ (রিয়্যালিটি, রিয়েল টাইম, রেসপনসিভনেস) এবং স্পেকট্রা (চলমান রয়েছে)। স্পেকট্রার কাজ শেষ হলে নিয়ন মানুষের মতো দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি পাবে!
‘নিয়নের প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বেটা ভার্সন আসবে ২০২০ সালের শেষ দিকে,’ প্রেজেন্টেশনের সময় প্রণব বলেন, ‘ব্যাপারটা এমন না যে, এখনই উন্মোচন করা হচ্ছে আর আপনি বাড়ি নিতে পারবেন। আমরা এমন কিছু করতে চাই, যেটা পুরোপুরি মানুষের মতো কাজ করবে।’
যেভাবে এলো আইডিয়া : প্রণবের মাথায় এই আইডিয়া আসে ভারতে বসেই। ইন্ডিয়া ইনকিউবেশন সেন্টারে তিনি গুজরাটি কিবোর্ড তৈরির সময় ভাবেন, এমন কিছু তৈরি করবেন, যা মানুষের মতো হবে।
‘এরপর স্যামসাংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর এই নিয়ন নিয়ে কাজ শুরু করি। কেনাকাটার জনপ্রিয় ওয়েবসাইট আমাজনের ইকো স্মার্ট স্পিকারের অংশ অ্যালেক্সা ডিভাইসের মতো শুধু উত্তর দেবে, এমন কিছু বানাতে চাইনি। আমরা চেয়েছি, এটি মানুষের মতো আচরণ করবে।’
এআই অ্যাসিস্ট্যান্স বনাম নিয়ন
মানুষের কথার উত্তর দিতে এআই অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো নিয়ন ইন্টারনেট চালিত নয়। নিয়ন নতুন কিছু শিখতে পারে, এআই অ্যাসিস্ট্যান্স পারে না। স্পেকট্রা শেষ হলে মানুষের মতো স্মৃতি পাবে নিয়ন।
এখনকার প্রযুক্তিতে এআই ডিভাইস সচল করতে পাসওয়ার্ড কিংবা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন প্রয়োজন হয়। কিন্তু নিয়ন আপনাকে চিনতে পারবে, আপনার আচরণ মনে রাখতে পারবে। কোনো পাসওয়ার্ড দরকার হবে না।
কারও বাড়িতে অ্যালেক্সা থাকলে, যে কেউ এসে নির্দেশনা দিতে পারে। নিয়ন এ ক্ষেত্রে বেশি নিরাপদ। কারণ সে আপনার আচরণ মনে রাখবে। অন্য কেউ তাকে নির্দেশনা দিতে পারবে না। প্রত্যেকটি নিয়নের আলাদা-আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকবে।
যেভাবে ব্যবহার করা যাবে
করপোরেট জগৎ দিয়ে শুরু হবে নিয়নের পথচলা। এ জন্য নির্বাচিত কিছু পার্টনারের সঙ্গে কাজ করবে স্যামসাং। যেমনÑ ব্যাংক খাতে এটি বিক্রি করতে পারে কোম্পানিটি।
ব্যাংকের কর্মীদের অনেক সময় একাধিক ভাষা জানতে হয়। কিন্তু এমন দক্ষ কর্মী খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। এ ক্ষেত্রে তারা নিয়নকে ‘নিয়োগ’ দিতে পারে। কোর আর৩ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সে সব ধরনের গ্রাহকের প্রয়োজন মেটাবে। শুধু তা-ই নয়, ফোন রিসিভ করে মানুষের মতো উত্তর দিতে পারবে। একইভাবে হোটেল সেবায় এবং ফিটনেস ট্রেইনার হিসেবেও একে ব্যবহার করা যাবে। ইংরেজির পাশাপাশি হিন্দি, মারাঠিসহ ৫০টির মতো ভারতীয় ভাষা এতে যোগ করা হচ্ছে।
চাকরি ক্ষেত্রে প্রভাব
স্যামসাং মনে করছে, নিয়নের কারণে মানুষের চাকরির সুযোগ কমবে না। বরং প্রযুক্তির কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে।
প্রণব এ ক্ষেত্রে মিডিয়া জগতের উদাহরণ দিয়েছেন, ‘গভীররাতে যদি ব্রেকিং নিউজ আসে, তাহলে কর্মীদের তখনই সেটি ঘোষণা দিতে হয়। সারা দিনের কাজের পর মানুষের জন্য এমন দায়িত্ব পালন কঠিন। এমন সময় নিয়ন নিজেই কাজ করবে, নিজে-নিজে ভাষান্তর করবে। নিজেই সংবাদ প্রচার করবে। এ ক্ষেত্রে সংবাদ উপস্থাপকের চাকরি যাবে না বরং তিনি উদ্দীপ্ত হবেন। বিশ্রাম পাবেন।
ডিপফেক বনাম নিয়ন
ডিপফেক প্রযুক্তির কারণে বর্তমান সময়ে নকল ভিডিও, অডিও এবং ছবিতে সয়লাব অনলাইন। এই প্রযুক্তি দিয়ে যেকোনো মানুষের চেহারা এবং ভয়েস নকল করে ভুয়া ভিডিও বানানো যায়। নিয়ন এসব করবে না।
ডিপফেক দিয়ে নতুন কনটেন্ট বানানো যায় না। অন্য একটি ভিডিওকে এডিট করে অন্য কিছু করা যায়। কিন্তু নিয়ন নিজেই নতুন কনটেন্ট তৈরি করবে। এটাই হচ্ছে কোর আর৩-এর শক্তি। আগে কেউ কিছু বলেছেন, করেছেন নিয়ন সেটি নিয়ে কাজ করবে না। কোর আর৩ দিয়ে কনটেন্ট তৈরি হবে বলে ফেক নিউজেরও বালাই থাকবে না।
বেটা ভার্সন
নিয়নের এখন যে ভার্সন আছে, সেটি মানুষকে চিনতে কিংবা মনে রাখতে পারে না। নিয়নের সঙ্গে কারও কথোপকথন শেষ হলে সেটি ডিজিটাল ইথারে হারিয়ে যায়। ‘স্পেকট্রা’ প্রজেক্ট শেষ হলে এসব সমস্যা কাটিয়ে যন্ত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠবে।
নিয়নের এখন দুটি কার্যপ্রণালি। এর মধ্যে একটি ‘অটো মোড’। এই মোডে থাকলে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করে। কখনো ভাবে, কখনো উত্তর দেয়, কখনো আবার অভ্যর্থনা জানায়। দ্বিতীয় টি ‘লাইভ মোড’। নিকটবর্তী স্থান থেকে এই মোডে নিয়নকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
