নীল রংয়ের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যতম দুটি প্রাকৃতিক উপাদান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর একটি আকাশ ও অন্যটি সমুদ্র। কিন্তু সব সময়ই যে এই দুই উপাদানের সঙ্গে নীল রংয়ের তুলনা করা হতো এমনটা নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, মানবসভ্যতার শুরুর দিকের মানুষ মূলত রংয়ের এত বৈচিত্র্য ধরতে পারত না। তারা রং বলতে কালো, সাদা, লাল, হলুদ ও সবুজ বুঝত। ফলে তৎকালীন মানুষের মধ্যে নীল রংয়ের চেতনাই ছিল না।
হোমারের ওডিসির বর্ণনায় পাওয়া যায়, ‘ওয়াইন-রেড সি’।
বলা হয়, প্রথম নীল রং তৈরি হয়েছিল প্রাচীন মিসরে। তখন থেকে পরবর্তী ৬ হাজার বছরে নীল রং অনেক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এখনো এই বিবর্তন অব্যাহত রয়েছে। মিসরীয়দের তৈরি প্রথম দিকের নীল রংয়ের নাম ছিল ‘কাপ্রোরিভাইট’, যা প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ সালে তৈরি হয়। চুনাপাথরের সঙ্গে বালু ও তামাযুক্ত খনিজ পদার্থ মিশিয়ে ওই রং তৈরি করা হয়েছিল। উজ্জ্বল বিশুদ্ধ নীল বর্ণ রংয়ের যাত্রা শুরু হয় ৬ হাজার বছর আগে। আফগানিস্তান থেকে আমদানিকৃত রতœপাথর (লাপিস লাজুলি) দিয়ে ওই বিশুদ্ধ নীল বর্ণ তৈরি করা হতো। মিসরীয়রা তখন থেকেই মূলত চিত্রকর্মে নীল রং ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা অলংকার ও মাথার উষ্ণীষ তৈরিতেও এই রং ব্যবহার করত। কারণ তৎকালীন সময়ে নীল রংকে আভিজাত্যের প্রতীক ধরা হতো।
আফগানিস্তানের বামিয়ান প্রদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তখন লাপিস লাজুলি ব্যবহার করত চিত্রকর্মের জন্য। এই রংই ১৪ থেকে ১৫ শতকের দিকে মধ্যযুগীয় ইউরোপে গিয়ে রয়্যাল ব্লুতে রূপান্তরিত হয়। সেখানে এই রংকে স্বর্ণের মতো মূল্যবান মনে করা হতো। চিত্রকর জেরার্জ ডেভিডের ভার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড উইথ ফিমেল সেইন্টসে ওই রংয়ের উপস্থিতি দেখা যায়। সামন্ত প্রভুরা তাদের হয়ে ছবি আকার জন্য ওই রং দিয়েছিল ডেভিডকে। ১৮২৬ সালে সিনথেটিক নীল বর্ণ রং তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত রয়্যাল ব্লু ছিল ইউরোপের শৌর্যবীর্যের প্রতীক। ঐতিহাসিকরা বলেন, মাইকেল অ্যাঞ্জেলো তার ‘দ্য এনটোবমেন্ট’ (১৫০০-১) চিত্রকর্মটি শেষ করতে পারেননি রয়্যাল ব্লুর অভাবে। অর্থাভাবে তিনি ওই রং কিনতে পারেননি।
কোবাল্ট ব্লুর প্রচলন ছিল এশিয়ার চীনে। ১৮০৭ সালের দিকে কোবাল্ট ব্লুর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ফ্রান্সে। চিত্রকর জে. এম. ডব্লিউ. টার্নার, পিয়েরে আগুস্তে রেনর ও ভিনসেন্ট ভ্যান গগ তখন ওই ব্যয়বহুল কোবাল্ট ব্লুর ব্যবহার করতে শুরু করেন।
