বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। বন্ধুরা ঠিক করলাম ঝরনা দেখতে যাব। যে-ই ভাবা সেই কাজ। খুব সকালে চট্টগ্রামের একে খান থেকে নোয়াখালীর বাসে উঠলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম খৈয়াছড়া যাওয়ার মূল রাস্তায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মূল সড়ক থেকে পূর্বদিকে প্রায় অনেক পথ যেতে হবে। রাস্তার পাশেই সিএনজি পাওয়া যায় তাতে অর্ধেকটা রাস্তা যাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১৫ টাকা। সিএনজি থেকে নামতেই দেখি কিছু লোক ছোট ছোট বাঁশ বিক্রি করছে। যারাই ঝরনার দিকে যাচ্ছে সবার হাতেই বাঁশ। আমরাও কিনে নিলাম বাঁশ। এই বাঁশ ছাড়া আপনি হাঁটতে পারবেন না। যত ভেতরে যাবেন তত কাদা মাটি। সেইসঙ্গে ঝরনার পানির ক্ষিপ্রতা। সবমিলিয়ে ভারসাম্য ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই খৈয়াছড়া যাওয়ার পূর্বে অবশ্যই হাতে একটা করে শক্ত লাঠি বা বাঁশ নিয়ে যেতে হবে।
আমরা সবার মতো একইভাবে এগোচ্ছি। সিএনজি থেকে নেমে খাবারের হোটেলে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিট হাঁটতে হয়। যাওয়ার পথে এসব হোটেলে দুপুরের খাবার অর্ডার করে যেতে হয়। মোবাইল, ব্যাগ সবকিছু হোটেলের লকারে জমা রেখে যাওয়ার সুযোগ আছে। আমরাও তাই করলাম। হোটেলের লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম এখান থেকে ঝরনার কাছাকাছি যেতে কতক্ষণ লাগবে? একজন বললেন, দ্রুত গেলে আধা ঘণ্টা লাগবে। এরপর আমরাও দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। যত যাচ্ছি তত কঠিন পথ। কোথাও ঝরনার পানি, কোথায় হাঁটু অবধি কাদা। অনেকে পিচ্ছিল কাদায় স্লিপ খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। খুব সতর্কভাবে পা ফেলতে হয়। পাহাড়ের মাটি এত শক্ত মনে হচ্ছে যেন পাথর। যাওয়ার পথে অনেক পাখি আর বানর দেখতে পেলাম। চিড়িয়াখানার বানর আর বনের বানর দেখার মধ্যেও তফাৎ আছে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে ঝরনার কাছে এলাম। এখানে ঝরনার অনেকগুলো ধাপ আছে । কারও মতে সাতটা, কারও মতে এগারটা । তবে প্রথম ঝরনার ধাপটা নিচে বলে সবাই এটা দেখেই ফিরে যায়। এর পরের ধাপগুলো দেখতে হলে অনেকটা ঝুঁকি নিতে হয়। কারণ দ্বিতীয় ঝরনা থেকে সবগুলো পাহাড়ের ওপর। যত উঁচুতে যাবেন ততই পানির ক্ষিপ্রতা বাড়বে। বৃষ্টির দিন সবকিছু পিচ্ছিল। তাই শীতের মৌসুমে ঝরনার পানি কম থাকলেও অনেকটা নিরাপদ। প্রথম ঝরনা দেখেই অধিকাংশ পর্যটক ফিরে যায়। বাড়তি ঝুঁকি নেয় না। কিন্তু আমরা যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। এখান থেকেই আমাদের খৈয়াছড়া ঝরনার মূল ট্রেকিং শুরু করতে হলো। পাহাড়ের গাছগুলোর সঙ্গে মোটা মোটা রশি বাঁধা রয়েছে। রশি দেখে বোঝা যাচ্ছে অনেক পুরনো। নিচ থেকে সেই রশি ধরে উঠতে থাকলাম
ওপরে। কিছুপথ উঠে দেখি আর রশি নেই। এরপর বাঁশ আর গাছ ধরে উঠতে থাকলাম। উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে যাচ্ছি। মাঝে জিরিয়ে নিলাম। মানুষের পায়ের ছাপ দেখে বুঝতে পারলাম ঝরনা আশপাশেই আছে। একটু পর ঝরনার পানির শব্দ। ঝরনা দেখে মনে হলো কষ্ট সার্থক। ঝরনার এই ধাপটা পাহাড়ের অনেক ওপরে। একজন পর্যটকের কাছে জানলাম এটা পাঁচ নম্বর ধাপ। আমরা অবাক। তাহলে বাকিগুলো কি ফেলে এলাম! সিদ্ধান্ত নিলাম আর ওপরে যাব না। নিচে নেমে পরের ঝরনার ধাপগুলো দেখে বাড়ি ফিরব।
চতুর্থ ঝরনা থেকে তৃতীয় ঝরনায় নামতে অনেক কষ্ট করতে হয়। পাহাড়ের মাটি না বলে পাথর বললেও ভুল হবে না। খুব কষ্টে তৃতীয় ঝরনার কাছে এলাম। পানি বেশ ঠাণ্ডা। পাহাড়ের ওপর থেকে পুরো শহরটা দেখা যায়। এরপর নিচে নেমে পেলাম দ্বিতীয় ঝরনা। দেখেই মন জুড়াল। ছবি তুলে নেমে এলাম প্রথম ঝরনায়। কিছুটা সময় কাটিয়ে সবাই মিলে খাবার হোটেলে ফিরে এলাম। তখন ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা। খাওয়া শেষ করে একই পথে বাড়ির পথ ধরলাম।
কীভাবে যাবেন
চট্টগ্রামের একে খান থেকে ঢাকা, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন লোকাল বাসে ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে খৈয়াছড়া রাস্তার মুখে নামবেন। এছাড়া ঢাকার যে কোনো বাস কাউন্টার থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠবেন। যাওয়ার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে মিরসরাই পার হয়ে বড়তাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া আইডিয়াল স্কুলের সামনে নামবেন। স্থানীয় লোকদের জিজ্ঞাসা করলে বলে দেবেন কোন পথে যেতে হবে। লোকজন যে রাস্তা দেখিয়ে দেবেন ওই রাস্তার মুখেই সিএনজি পাবেন। ১৫ টাকা দিয়ে অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত যাবেন বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে।
কোথায় থাকবেন
বড়তাকিয়া বাজারে থাকার হোটেল নেই। থাকতে হলে চেয়ারম্যানের বাংলোয় উঠতে পারেন। এছাড়া মিরসরাই বা সীতাকুণ্ডে থাকার কিছু হোটেল পাবেন। অথবা চট্টগ্রাম শহরে চলে আসতে পারেন।
