যুদ্ধোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য নতুন বিস্তার, নতুন মাত্রা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০১:১৩ এএম

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি প্রকাশনা সংস্থা সাহিত্য প্রকাশের প্রাণ মফিদুল হক। ছবি তুলেছেন সাহাদাত পারভেজ  

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মাত্র নয়-মাসব্যাপী ঘটনাপ্রবাহ। তবে এর চেয়ে তীব্র পরিব্যাপ্ত বিপুল অভিঘাত সম্পন্ন ঘটনা বাঙালি জীবনে আর ঘটেছে বলে মনে হয় না। ঐতিহাসিক ঘটনাটির একটি ভৌগোলিক সীমারেখা টানা ছিল। এমনকি বাঙালি যখন স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র নিয়ে লড়াই করছেন, তখন অনায়াত্ত রাষ্ট্রের যে পতাকা তারা আয়ত্ত করেছিলেন; সেখানে লাল সূর্যের পটভূমিকায় রাষ্ট্রের সোনালি মানচিত্র আঁকা হয়েছিল। রাজনীতি নির্দিষ্ট করে দেয় রাষ্ট্রসীমা, তা’ সেখানে অসংগতি যাই থাকুক, সেটি মান্য করেই চলতে হয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রের আন্দোলনের। ভাষার ও সংস্কৃতির ঐক্য যত শক্তই হোক, রাষ্ট্রের সীমানা তার অনুবর্তী হতে পারে না। সংগত কারণেই তাই ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বাংলাদেশ রাষ্ট্রসীমার বাঙালি জীবন তছনছ করে দিয়েছিল, সীমানার বাইরের বাঙালিদের তা’ স্পর্শ, আলোড়িত এবং অনেকাংশে যুক্ত করলেও সে ছিল অন্যতর অভিজ্ঞতা।

ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাহিত্যে আমরা এক নতুন ধারার উদগম লক্ষ করি, যার পূর্বসূরি বিশেষ ছিল না, যার বৈশিষ্ট্য ও যুগলক্ষণ এখনো আমরা ভালোভাবে শনাক্ত করে উঠতে পারিনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তাৎপর্যের মতো এই সাহিত্যের বিশিষ্টতাও আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি কি না সেই প্রশ্ন রয়ে যায়। হলোকাস্ট যেমন পাল্টে দিয়েছিল ইউরোপীয় ইহুদিদের জীবনযাত্রা ও মানস, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন নাৎসি পীড়নের অভিজ্ঞতা ছিল যেমন নিদারুণ ও সর্বগ্রাসী, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ তেমন অভিজ্ঞতা সঞ্চার করেছিল বাংলাদেশের বাঙালি মানসে। বাস্তব জীবনে এর ছাপ এখন হয়তো তেমন খুঁজে পাওয়া যাবে না, অন্তঃসলিলা এই প্রবাহ বাহ্যিক আড়ম্বর দ্বারা অনেকাংশে আবৃত হয়ে পড়লেও সাহিত্যে এর খোঁজ মিলবে অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য জোরের সঙ্গে দাবি করে আলাদা মূল্যায়ন ও বিচার-বিশ্লেষণ।

বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ এমন এক ঘটনা যা কেবল নয় মাসের ফিরিস্তি ছিল না, এমনকি নিছক পাকিস্তানের তেইশ বছরের শোষণ-পীড়নের পরিণতি নয়। বলতে গেলে বিশ শতকের ইতিহাসের উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতায় জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সীমিত ঘটনা শুধু নয়, এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার স্বকীয়তা খুঁজে পেয়েছিল এবং নিজেকে স্থাপন করতে পেরেছিল হাজার বছরের ইতিহাসের পটভূমিকায়। জীবনানন্দ দাশের পঙ্ক্তি, ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ খণ্ডিতভাবে হলেও বাঙালি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মাধ্যমে এর সার্থক পরিণতি দিতে পেরেছিল।

আজ যখন স্তুতি ও চিন্তাহীন বন্দনার মন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ অভিধা, তখন এর নেতিবাচকতা উপেক্ষা করে আরও গভীরে তাকালে আমরা এমন এক লোকসত্য খুঁজে পাই যা বাঙালি বিস্মৃত হয়েছিল এবং যা এখন আবার জাতীয় পরিচয় ও মূল্যবোধের আধার হয়ে উঠেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের একদিকে রয়েছে অনেক রক্ত, অশ্রু, বেদনা ও বীরত্বের গাথা আর এর সঙ্গে রয়েছে বাঙালির আত্মসত্তা সন্ধান, নির্মাণ ও নতুনভাবে ফিরে পাওয়া। এই নিরিখে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের দিকে তাকালে গল্পে-উপন্যাসে যদি পাই প্রত্যক্ষের পরিচয়। তবে জাতিসাধনার রূপ আমরা নানাভাবে দেখতে পাব কবিতা, রূপকল্প, প্রতীক এবং নতুন কাব্যভাষা ও কাব্যরীতি নির্মাণের সাধনায়। পাশাপাশি রয়েছে আরেক অনন্য সাহিত্য-সম্ভার, মুক্তিযুদ্ধ যা বাঙালিকে দিয়েছে এবং দিয়ে চলছে। এই সাহিত্যধারা একাত্তরের স্মৃতিকথন, যা আমাদের বিপুলভাবে আলোড়িত করেছে। অথচ তেমনভাবে বিচার করে কখনো দেখা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের বিশাল অংশ জুড়ে আছে বহু মানুষের আত্মকথন, আপন জীবনের নিবিড়তর অভিজ্ঞতার বয়ান। এর সাহিত্যমূল্য ভিন্নভাবে বিচার করার রয়েছে। সেজন্য সাহিত্যের পাঠ ও নন্দনতত্ত্ব পাল্টে নেওয়া প্রয়োজন। যেটি আমরা করিনি তো বটেই, এমনকি তেমন চেষ্টাও নেইনি।

জাতির জীবনের চরম অভিজ্ঞতার রূপায়ণে কৃতী সাহিত্যিকরা বড় অবদান রাখবেন এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবে করা চলে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থের বিশাল সম্ভার বহু অজানা, অনামা ব্যক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছে, স্বল্পখ্যাত কিংবা সাহিত্যাঙ্গনে ভীরু পদচারণার মানুষদের দান করেছে আলাদা মহিমা। স্মৃতিচারণগুলোতে বাঙালির আরেক অবদান ‘যুদ্ধ-সাহিত্য’। যে-বাঙালিকে অপবাদ শুনতে হয়েছে ভীরু বাঙালির, যোদ্ধা জাতি তারা নয় এই অপবাদও হয়ে উঠেছিল ললাটলিখন; তারা যখন প্রয়োজনে অস্ত্র তুলে নিল হাতে, লড়াইয়ে পাল্টে দিল ইতিহাস, ফলে পাল্টে দিল নিজেদেরও। যুদ্ধশেষে আবার স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেলেও, পূর্বতন তাদের গ্রাস করলেও, নতুন সেখানে কতটুকু ঠাঁই করতে পেরেছিল; সেই পরিচয় পাওয়া যাবে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথনে। পাঞ্জাবিদের ব্রিটিশরা নন্দিত করেছে ‘যোদ্ধা জাতি’ হিসেবে তাদের কোনো যুদ্ধ-সাহিত্য নেই, কিন্তু বাঙালি অস্ত্রের গৌরব আহরণে ছিল পেছনের কাতারে; তারা সৃষ্টি করল যুদ্ধ-সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার।

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য বিচারে আমাদের তাই পৃথক পৃথক গ্রন্থের আলোচনার পাশাপাশি ধারা ও প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ করতে হয়। এই পটভূমিকা স্মরণে রেখে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য অধ্যয়ন বিশেষ জরুরি। আগামী বছর আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করব। তখন সেটি যদি বাংলা সাহিত্যের নবধারার উদযাপনও হয়ে ওঠে, তা লক্ষ রাখা খুব দরকার।

দুই.
মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের গভীরতা ও বিশালতা স্মরণে ও শরণে নিলে আমরা এর যে ধারা-উপধারা দেখতে পাই, তাতে মোটা দাগে কটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করা যায়। তবে সেসব পৃথক, পৃথক গ্রন্থ বিচারের চাইতে গুরুত্ব বহন করে সেগুলোর প্রবণতার বিশ্লেষণ। মুক্তিযুদ্ধের পর পর আশা করা গিয়েছিল সাহিত্যে এর রূপায়ণ নানাভাবে আমরা দেখতে পাব। তেমনটা ঘটেছিল, তবে সঙ্গে সঙ্গে ঘটেনি। এমন নিবিড় ও আলোড়নময় ঘটনা আত্মস্থ করে মেলে ধরা কোনো সহজ কাজ ছিল না। ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও সম্মিলিত অভিজ্ঞতা এখানে মিলেশিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। সবার হয়ে কথা বলাটি সাহিত্যের ধর্ম আর সেখানে যখন জড়িয়ে থাকে ব্যক্তির নিবিড়তম অভিজ্ঞতা, তার প্রকাশ সহজ কাজ নয়। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ কিংবদন্তির মর্যাদা অর্জন করেছিলেন, একের পর এক রচনায় মাতিয়ে তুলেছিলেন বিশাল পাঠকগোষ্ঠীকে, বিশেষভাবে নবীন পাঠকদের। মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তিনি লিখেছিলেন কতক উপন্যাসিকা, তার গল্পবলার নিজস্ব ঢঙে, ‘শ্যামল ছায়া’, কিংবা ‘আগুনের পরশমণি’ ও আরও কিছু লেখায়। একসময়ে বিশাল মাপের কাজ করবার বাসনা তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল, ঠিক কীভাবে তা করা যায় সেটা খুঁজে পাওয়া বুঝি তার হয়নি। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’তে তিনি তথ্যমূলক গবেষণার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের যে ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, সেটি কতটা সার্থক হয়েছে ভিন্ন বিচার, পক্ষান্তরে যা লক্ষ করবার তা হলো লেখকের নিবিড় বেদনাময় স্মৃতির উদ্ভাসন কীভাবে তিনি করেছেন।

দূর মফস্বলে এক পুলিশ কর্মকর্তার একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দময় স্মৃতি তিনি বারবার মেলে ধরলেও কখনো কোনো ইঙ্গিতেও প্রকাশ পায়নি কীভাবে এই পরিবার, বিশেষভাবে পরিবারের তরুণ শিক্ষার্থী পুত্র, পিতার অমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মোকাবিলা করল। এই অনুপস্থিতি জানান দেয় এমন শক্তিমান সাহিত্যিকের জন্যও কাজটি ছিল কত দুরূহ। পিরোজপুরে মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান খানকে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে। ভাসতে, ভাসতে মৃতদেহ আটকে পড়ল চরের বালুতে, সেখান পায়ের জুতো দেখে শনাক্ত করা হলো বেওয়ারিশ এই লাশের পরিচয়। নিদারুণ এই অভিজ্ঞতা কীভাবে ফুটে উঠতে পারে লেখক-পুত্রের কলমে সেটি ইতিহাসেরই বড় চ্যালেঞ্জ। লেখক হিসেবে যখন তিনি খ্যাতির মধ্যগগনে, বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে পরিভ্রমণ করলেও তার লেখায় এর কোনো প্রতিফলন ছিল না।

অনেকককাল পর, ১৯৮৯ সালে, কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দারের অনুরোধে তার সম্পাদিত ‘১৯৭১ : ভয়াবহ অভিজ্ঞতা’ গ্রন্থের জন্য লিখলেন তিনি তিন পৃষ্ঠার ছোট্ট লেখা, শিরোনাম ‘কিছু মনে পড়ে না’। স্বভাবসিদ্ধ সহজিয়া গল্পবলার ঢঙে তার এই বয়ানে কোথাও পিতার কথা নেই, আছে সদ্য-পিতৃহারা অসহায় পরিবারের সদস্যদের প্রাণ বাঁচাতে নৌকায় অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ।

পিতার হত্যার ছায়াতলের ঘটনা ধারায় পিতৃহত্যার সামান্যতম উল্লেখও নেই, মিলিটারিরা পিরোজপুর শহরে ঢোকার পর চারদিকে আতঙ্ক-জাগানিয়া হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার কিছু সংক্ষিপ্ত বয়ান দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ, আছে ভগীরথী হত্যার মর্মান্তিক বিবরণ, এক-দুই বাক্যে, কিন্তু কোথাও বলা হয়নি পিতার করুণ পরিণতি। আশ্রয়চ্যুত পরিবারটি যখন ফিরছিল নদীপথে সেই সময়ের বর্ণনা বরং দাখিল করেছেন হুমায়ূন। লিখেছেন : “খোলা নৌকার পাটাতনে বসে আছি। ভরা জোয়ার, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, হঠাৎ মাঝি বললো, ‘দেহেন দেহেন।’ তাকিয়ে দেখলাম, দুটি মৃতদেহ ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে। এমন কোনো দৃশ্য নয় যে অবাক বিস্ময়ে দেখতে হবে। খুবই সাধারণ দৃশ্য। রোজই অসংখ্য মৃতদেহ নদীতে ভাসতে ভাসতে যায়। শকুনের পাল দেহগুলোর ওপর বসে বসে ঝিমোয়। নরমাংসে তাদের এখন আর রুচি নেই, কিন্তু আজকের মৃতদেহ দুটির ওপর কোনো শকুন বসে নেই। আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। চোখ ফেরাতে পারছি না। সবুজ শার্ট গায়ে দেওয়া ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের একজন যুবকের মৃতদেহ। তার গলা জড়িয়ে ধরে আছে সাত-আট বছরের একটি বালিকা। বালিকার হাতভর্তি লাল চুড়ি। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে এই বালিকাটি তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। মেয়েটি তখন কী পরিমাণ ভয় পেয়েছিল জানি না। জানতেও চাই না। সবকিছু ভুলে যেতে চাই আমি।”
এই তার অভিজ্ঞতার নির্যাস। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা সহজ ছিল না, কোথায় এর শুরু কোথায় শেষ, কীভাবে বলা যেতে পারে সেই কাহিনী, তা আয়ত্তে আনতে প্রয়োজন ছিল অনেকটা সময়, স্থিতধী হওয়ার মতো অনেক প্রস্তুতি। হাসান আজিজুল হকের মতো শক্তিমান, সফল লেখকও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প লিখেছেন গুটিকয়, আপন স্মৃতিকথা লিখতে সময় নিয়েছেন অনেক, নব্বইয়ের দশকের আগে কিছুতেই লিখতে পারেননি আপনজন গুরু খালেদ রশীদের কথা আর সব অভিজ্ঞতার বয়ান। সেইসব লেখা ছিলও একান্ত সংক্ষিপ্ত, অভিজ্ঞতার মুক্তোদানা নির্যাস যেন। তার লেখাতেও পাই হুমায়ূনের মতো বর্ণনা, “আমার জানা ছিল না, পানিতে ভাসিয়ে দিলে পুরুষের লাশ চিৎ হয়ে ভাসে আর নারীর লাশ ভাসে উপুড় হয়ে। মৃত্যুর পরে পানিতে এদের মধ্যে এইটুকুই তফাৎ। এই জ্ঞান আমি পাই ’৭১ সালের মার্চ মাসের একেবারে শেষে ত্রিশ বা ঊনত্রিশ তারিখে।” বুঝতে অসুবিধা হয় না এমন কথা একটানে লিখে ফেলার নয়, চাই সেজন্য অপেক্ষা, অপেক্ষা আর প্রস্তুতি; নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া, যেখানে এসে ভিড় জমায় অসংখ্য মানুষ, মানুষের মুখ দলিত-মথিত-গলিত। একই কথা বলা চলে জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ প্রসঙ্গে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে এমন বিপুল প্রভাবসম্পন্ন রচনা আর মেলে না। জাহানারা ইমামেরও লেগেছিল দীর্ঘ সময়, চলেছিল নিভৃত অনেক প্রস্তুতি, তারপরে কলম হাতে নিলেন, ধারাবাহিকভাবে সেই স্মৃতিভাষ্য পত্রস্থ হলো ‘সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানী’তে, পরে পুস্তকাকারে প্রকাশ তৈরি করল ইতিহাস। জাহানারা ইমাম বিপুলভাবে বরিত হলেন নবীন প্রজন্মের দ্বারা এবং তার আহ্বানে সূচিত হলো বাংলাদেশের গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে অভূতপূর্ব জন-আন্দোলন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাষ্যের আরেক উল্লেখযোগ্য দিক নারীকণ্ঠের উপস্থিতি। লক্ষণীয় যে, বিপুলভাবে নন্দিত যেসব স্মৃতিভাষ্য, মনে রেখাপাত করেছে গভীরভাবে যেগুলো, তার বড় অংশের রচয়িতা নারী লেখক। অনেক নাম স্মরণ করা যেতে পারে, যেমন মুশতারী শফি, বাসন্তী গুহঠাকুরতা, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, পান্না কায়সার, বেগম নূরজাহান, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, সাহেদা বেগম এমনি আরও কতজন। বেশিরভাগ তারা লেখক ছিলেন না, মুক্তিযুদ্ধ করে তুলেছে তাদের লেখক এবং তাদের ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা নির্মাণ করেছে জাতীয় অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার।
যোদ্ধাদের যুদ্ধস্মৃতি মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের আরেক সমৃদ্ধ অধ্যায়। যুদ্ধের পর পর মেজর রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম লিখলেন ‘লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে’, যুদ্ধের ময়দানের কথকতা। সেই কবে প্রথম মহাযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে মাহবুব-উল আলম লিখেছিলেন ‘পল্টন জীবনের স্মৃতি’, তারপর পেলাম দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের স্মৃতিভাষ্য বরেন বসুর ‘রঙরুট’। এর বাইরে বাংলা সাহিত্যে যুদ্ধ প্রায় অনুপস্থিত, অথচ একাত্তরের অভিজ্ঞতা ক্রমে, ক্রমে বহু গ্রন্থের জন্ম দিল। গ্রন্থগুলোতে বড় আকারে প্রতিফলন ঘটেছে জনযুদ্ধের বাস্তবতা, যুদ্ধের পাশাপাশি যুদ্ধ-সম্পৃক্ত মানুষের উপাখ্যান।

মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমের পথ বেয়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর নায়কদের অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতার ভাষ্য দাখিল করেছেন, যেসব বইয়ের বড় অংশ ইংরেজিতে লেখা, পরে অনূদিত বাংলায়। মেজর সফিউল্লা, কর্নেল নুরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন ইমামুজ্জামান, এয়ার-ভাইস মার্শাল এ.কে. খন্দকার, কর্নেল নূরুন্নবী, কর্নেল শাফায়াত জামিল, মেজর কাইয়ুম চৌধুরী, মেজর সুবিদ আলী চৌধুরীসহ আরও অনেক সমরকর্তা লিখেছেন স্ব-স্ব যুদ্ধকথা। এর বাইরে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বহু তরুণ লিখেছেন যুদ্ধদিনের স্মৃতি, বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে মাহবুব আলমের দুই খণ্ডের এপিক ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সংখ্যা এত বেশি যে পৃথক ও বিশদ আলোচনা দাবি রাখে। বাইরে রয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটকের বিচার ও আলোচনা এবং পাঠ।

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য অনেকভাবে আমাদের সমৃদ্ধি জুগিয়েছে, আগামীতে আরও জোগাবার সক্ষমতা রাখে নিশ্চিতভাবে। তবে সেজন্য যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি বিশেষ জরুরি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত